দক্ষিণাঞ্চলের স্যালিশ সাগর। সুনসান নীল জলরাশির নিচে আচমকা ভেসে উঠছে এক দল অর্কা—যাদের আমরা চিনি ‘কিলার হোয়েল’ নামে। কিন্তু এবার ভয়ের সঙ্গে নয়, দেখা গেল কোমল এক দৃশ্য। একজন কেল্প গাছ ছিঁড়ে এনে অন্য আরেকজনের গায়ে আলতো করে ঘষে দিচ্ছে। যেন এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে স্নান করিয়ে দিচ্ছে। এই পুরো ঘটনা ধরা পড়েছে ড্রোনের চোখে।
প্রাণীবিদ মাইকেল ওয়েইস যখন ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করছিলেন, তখন তিনি থমকে যান। দক্ষিণাঞ্চলের অর্কাগুলো সমুদ্রের তলদেশ থেকে কেল্প গাছ ছিঁড়ে এনে নিজের গা আর অন্যদের গায়েও ঘষছে— এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি। তিনি ও তার দল এই আচরণের নাম দিয়েছেন ‘অ্যালোকেল্পিং’।
মাত্র দুই সপ্তাহে ৩০টির বেশি এমন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়েছে। কখনো কখনো এই ঘষাঘষি চলেছে টানা ১৫ মিনিট। গবেষকেরা বলছেন, এ আচরণ দুই উদ্দেশ্যে হতে পারে— ত্বক পরিচর্যা ও সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করা।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ঘষাঘষিতে সাধারণত একে অপরের আত্মীয় বা একই বয়সী তিমিরাই অংশ নিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি মানুষের গোসলের সময় পিঠ ঘষে দেয়ার মতোই এক সামাজিক ও শারীরিক পরিচর্যার কাজ।
গবেষক জ্যানেট ম্যান বলেন, তাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, যেন একে অপরের যত্ন নিচ্ছে। ঠিক যেমন আমরা সন্তান বা বন্ধুর মাথায় বিলি কাটি, তেমনি অর্কারাও একে অপরের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ করছে।
ড্রোন প্রযুক্তি না থাকলে এমন আচরণ হয়তো কখনোই চোখে পড়ত না। আগে শুধু উপকূল কিংবা নৌকা থেকে দেখা যেত অর্কাদের সাঁতার কাটা। কিন্তু আকাশ থেকে এই দৃশ্য দেখলে বোঝা যায়, সমুদ্রের নিচে চলছে এক নিজস্ব ভাষা— যেখানে স্পর্শই বন্ধুত্বের বার্তা।
তিমিদের মধ্যে বিভিন্ন টুল ব্যবহারের ঘটনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। কিন্তু অ্যালোকেল্পিংয়ের মতো পারস্পরিক সহযোগিতা এটাই প্রথম। তবে দুঃখজনকভাবে, এই দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্কাগুলোর সংখ্যা এখন মাত্র ৭৪। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের হস্তক্ষেপে সাগরের কেল্প গাছও হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে এই পরিবেশ ও এর বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে।
গবেষক ওয়েইস বলেন, অ্যালোকেল্পিং হয়তো বহুদিন ধরেই চলছে। আমরা শুধু এখন দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এখন যদি আমরা এই সুন্দর আচরণগুলো সংরক্ষণ করতে না পারি, তাহলে একদিন হয়তো কেবল ভিডিওতেই আটকে থাকবে তিমিদের বন্ধুত্বের গল্প।
তিমিদের আচরণ এবার যেন মানুষকেই শেখাল— বন্ধুত্ব আর স্পর্শের শক্তি ঠিক কতটা গভীর হতে পারে!
—সিএনএন










