এমআই৬ শব্দটা মাথায় আসলে জেমস বন্ডের দাপুটে ভাব চোখের সামনে ভাসে। আর ফ্রান্সের ডিজিএসই-কে মনে হয় টেলিভিশন সিরিজ ‘লে ব্যুরো’র মতো রহস্য ও নানা কৌশলে ঘেরা এক গোয়েন্দা সংস্থা। চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজের এসব গল্প কাল্পনিক হলেও, বাস্তবে এক ফরাসি সাময়িকীর জরিপে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-কে ইউরোপের সেরা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।খবর দ্য গার্ডিয়ান।

ফরাসি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ল’এক্সপ্রেস জরিপটি পরিচালনা করে। এতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বর্তমান ও সাবেক ৬০ জন গোয়েন্দা কর্মকর্তা অংশ নেন। ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ও ইসরায়েলের মোসাদের কর্মকর্তারাও। প্রত্যেককে গোপনে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তাদের পছন্দের সেরা পাঁচটি সংস্থা বেছে নিতে বলা হয়। ২৫১ পয়েন্ট নিয়ে প্রথম হয় এমআই৬। দ্বিতীয় ফ্রান্সের ডিজিএসই পেয়েছে ১৬৯ পয়েন্ট নিয়ে। বাকি সংস্থাগুলোর পয়েন্ট ছিল অনেক কম।

প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা বিষয়ক প্রতিবেদনের দায়িত্বে থাকা ল’এক্সপ্রেসের উপসম্পাদক আলেক্সান্দ্রা সাভিয়ানা এ ফলাফলে অবাক হননি। তবে পয়েন্টে ব্যবধান তাকে বিস্মিত করেছে। তিনি বলেন, ‘পয়েন্টের ব্যবধান বিশাল।’ তার মতে, এই ফলাফল গোয়েন্দা জগতের ভেতরের লোকজন ও মিত্রদের মতামতও প্রতিফলিত করে। জরিপে অংশ নেয়া ৬০ জনের মধ্যে ১৭ জনই বর্তমান বা সাবেক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান।

লন্ডনের ভক্সহলে এমআই৬-এর সদর দপ্তরে সংস্থাটির প্রধান ব্লেইজ মেত্রেওয়েলির পক্ষ থেকে এই ফলাফল নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে অপ্রত্যাশিত রায়ে সংস্থাটির ভেতরে নীরব সন্তুষ্টি রয়েছে। কারণ মিত্র ও প্রতিপক্ষ—দুই পক্ষের কাছেই নিজেদের ভাবমূর্তিকে এমআই৬ গুরুত্ব দেয়। হোয়াইটহলের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘গুপ্তচরবৃত্তির খেলায় সুনাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

ল’এক্সপ্রেস প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘ব্রিটিশ গুপ্তচররা ইউরোপ এবং এর বাইরেও মানুষকে মুগ্ধ করে।’ সাভিয়ানা বলেন, জরিপে এমআই৬-এর সাফল্যের প্রধান কারণ হলো বহু প্রজন্ম ধরে উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা-সূত্র নিয়োগ ও পরিচালনায় তাদের সাফল্য। প্রযুক্তি, যোগাযোগে আড়িপাতা এবং স্যাটেলাইট নজরদারি-নির্ভর বর্তমান সময়ে এমআই৬ বরং মানব গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ওপর জোর দিয়ে এসেছে।

james_bond

ফ্রান্সের ডিজিএসইর এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সাময়িকীটিকে বলেন, ‘ব্রিটিশদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার ক্ষমতা আছে। অনেকটা রুশদের মতো ১০ বছর ধরে কোনো সূত্রের ওপর বাজি ধরতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘তাদের গোপন ও কৌশলী পথের প্রতিও ঝোঁক আছে।’ তবে এর মাধ্যমে তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা ব্যাখ্যা করেননি।

এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এ জরিপ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তার মতে, এমআই৬-এর মতো মানব গোয়েন্দা-নির্ভর কোনো সংস্থা আসলে ততটাই ভালো, যতটা ভালো তার হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ এজেন্টরা। এমআই৬-এর সাবেক প্রধান রিচার্ড মুরের সময়ে সংস্থাটির হাতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ট আছে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। অন্যদিকে সাভিয়ানাসহ অনেকে মনে করেন, এমআই৬-এর বদলে এর সহযোগী সংস্থা জিসিএইচকিউ-কে বেশি কৃতিত্ব দেয়া যেত। জিসিএইচকিউ মূলত যোগাযোগ ও সংকেতভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে বিশেষজ্ঞ। তবে জরিপে জিসিএইচকিউকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

ফরাসি সাময়িকীটির মতে, এমআই৬-এর সমগ্রোত্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে যে সুনাম, তা গড়ে উঠেছে এর ‘দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের’ ওপর। এর মধ্যে রয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ গুপ্তচর নিয়োগের ইতিহাস। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ওলেগ গর্দিয়েভস্কি। তিনি কেজিবির কর্মকর্তা ছিলেন, কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে এমআই৬-এর হয়ে ডাবল এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। পরে তার পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে ১৯৮৫ সালে নাটকীয়ভাবে তাকে ফিনল্যান্ডে পাচার করে নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে এমআই৬-এর সব গুপ্তচরই ধরা পড়া এড়াতে পারেননি। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাওয়া ইরানের সাবেক উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী আলিরেজা আকবারি ২০১৯ সালে দেশে ফেরার পর গ্রেফতার হন। ২০২৩ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। মৃত্যুর আগে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে তিনি এমআই৬-এর এজেন্ট ছিলেন। যদিও তার এই স্বীকারোক্তি জোর করে আদায় করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০০৮ সালে ইরানের ফোরদো পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের অস্তিত্বের তথ্য তিনিই সরবরাহ করেছিলেন।

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগে এমআই৬-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে অতিরিক্ত সরলীকৃত তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। সংস্থাটি এমন কিছু সূত্রের তথ্য সামনে এনেছিল, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। বলা হয়েছিল, ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেন ৪৫ মিনিটের মধ্যে যুক্তরাজ্যের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম। রাসায়নিক অস্ত্র বহনের কথিত যন্ত্রপাতি নিয়ে এমআই৬ যে এক সূত্রের ওপর নির্ভর করেছিল, তার বর্ণনা আবার হলিউডের সিনেমা ‘দ্য রক’-এ দেখানো একটি যন্ত্রের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে গিয়েছিল। এটি ছিল সংস্থাটির জন্য একটি বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকট।

তবে ল’এক্সপ্রেসের মতে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার আগে এমআই৬ আবার নিজেদের সুনাম ফিরিয়ে আনে। সিআইএর সঙ্গে মিলে তারা সঠিকভাবে সতর্ক করেছিল যে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালাতে যাচ্ছে। বিপরীতে ফ্রান্স ও জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বিষয়ে সংশয়ী ছিল এবং পরিস্থিতি সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি। এমনকি জার্মান গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডির প্রধান হামলার আগের দিন কিয়েভে গিয়েছিলেন—যা দেখে মনে হয়েছিল, তিনি আসন্ন হামলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।

এর পেছনে রয়েছে এমআই৬ ও সিআইএর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বৃহত্তর ফাইভ আইজ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে। মহাদেশীয় ইউরোপের দেশগুলো এই সহযোগিতাকে ঈর্ষার চোখে দেখে। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশৃঙ্খল শাসনামলেও এ ব্যবস্থার জটিলতা সত্ত্বেও তা কার্যকর রয়েছে। সাভিয়ানা বলেন, ‘প্রতিটি দেশই বলতে চায়, তারাই যেন ষষ্ঠ চোখ।’

কল্পকাহিনিও এমআই৬-এর সুনাম বাড়াতে সাহায্য করেছে। ‘দ্য রেস্ট ইজ ক্লাসিফায়েড’ পডকাস্টের সহ-উপস্থাপক গর্ডন কোরেরা জানান, এমআই৬-এর এক সাবেক প্রধান একবার তাকে এক তরুণ কর্মকর্তার গল্প বলেছিলেন। ওই কর্মকর্তা এক জায়গায় গিয়েছিলেন, সেখানে যার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন, তিনি ইংরেজি জানেন কিনা—তাও তিনি জানতেন না।

কর্মকর্তাটি ঘরে ঢোকার পরই ওই ব্যক্তি হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘হ্যালো, মিস্টার বন্ড।’

সাবেক এমআই৬ প্রধান তখন মন্তব্য করেছিলেন, ‘ওই কর্মকর্তা যদি বেলজিয়ামের গোপন গোয়েন্দা সংস্থার হতেন, তাহলে বোধহয় এত উষ্ণ অভ্যর্থনা পেতেন না।’