সকালের শুরু হোক বা সন্ধ্যার আড্ডা, এক কাপ চা ছাড়া দিন যেন অসম্পূর্ণ। কিন্তু এ পরিচিত পানীয়টির পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, উপনিবেশের রাজনীতি আর স্বাদের এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা।
চায়ের ইতিহাসের সূচনা চীনে, প্রায় ছয় হাজার বছর আগে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে মিশরের ফারাওরা যখন গিজার পিরামিড তৈরি করেন, তারও দেড় হাজার বছর আগে থেকে চীনে চায়ের চাষ হয়। প্রাচীনকালের চা গাছ ও এখনকার চা গাছের মধ্যে কোনো তফাৎ না থাকলেও বর্তমানের চা খাওয়ার রীতি একদমই ভিন্ন। চা তখন ব্যবহার হত এক ধরনের শাক হিসেবে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, চা খাদ্য থেকে পানীয়ের রূপ পায় মাত্র পনেরশ বছর পূর্বে।
কিংবদন্তি আছে, ২৭৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীনা সম্রাট শেন নুং-এর সৈন্যরা একটি গাছের নিচে বসে পানি ফুটাচ্ছিল। তখন কিছু বুনো পাতা দুর্ঘটনাক্রমে সেই ফুটন্ত পানিতে পড়ে যায় এবং পানির রঙ বদলে যায়। সম্রাট সেই পানীয় পান করে সতেজ বোধ করেন। এভাবেই চা বা রং চার জন্ম হয়।
শুরুতে সব চা-ই ছিল গ্রিন টি। কিন্তু পাতা দূরে পাঠাতে গেলে বা বেশিদিন সংরক্ষণ করতে গেলে তা নষ্ট হয়ে যেত। চীনারা লক্ষ্য করল যে, চা পাতাকে রোদে শুকিয়ে অক্সিডেশন হতে দিলে তা কালচে রঙ ধারণ করে এবং এর স্বাদ ও ঘ্রাণ দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই বিশেষ প্রক্রিয়াজাত চা-ই হলো ব্ল্যাক টি বা আমাদের পরিচিত রং চা।
পরবর্তীতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হাত ধরে চা পৌঁছে যায় জাপানে। ইউরোপে চায়ের প্রবেশ ঘটে ১৬শ শতকে পর্তুগিজ ও ডাচ বণিকদের মাধ্যমে। ১৬৬২ সালে ব্রিটেনের রাজা দ্বিতীয় চার্লস যখন পর্তুগিজ রাজকন্যা ক্যাথরিন অব ব্রাগানজাকে বিয়ে করেন, তখন ক্যাথরিন তার সঙ্গে এক বাক্স চা নিয়েছিলেন। তার মাধ্যমেই ব্রিটিশ রাজপরিবার ও অভিজাত সমাজে চা পানের প্রথা শুরু হয়। চায়ের বিশ্ব অর্থনীতির অংশ হয়ে ওঠার পেছনেও ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিকল্পনা।

ভারতীয় উপমহাদেশেও ব্রিটিশদের হাত ধরে চায়ের প্রবেশ। ১৮শ’ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ভারতের আসাম ও পরে দার্জিলিং অঞ্চলে চা চাষ শুরু করে। ১৮৩০-এর দশকে আসামে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়।
তবে তখন চা ছিল মূলত ইউরোপীয় সাহেবদের পানীয়। সাধারণ মানুষ চা পান করতেন না। ব্রিটিশরা পরে শ্রমিকদের মধ্যে কর্মোদ্দীপনা বাড়াতে রেলস্টেশন, কারখানা ও শ্রমিক এলাকায় চা প্রচারের উদ্যোগ নেয়। এখান থেকেই ধীরে ধীরে চা সাধারণ মানুষের জীবনে ঢুকে পড়ে।
পানীয় হিসেবে চায়ের প্রস্তুতপ্রণালীর ওপরেও চলেছে দীর্ঘদিনের গবেষণা। যখন যে অঞ্চলে প্রবেশ করেছে সেখানকার সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে এর প্রস্তুতপ্রণালীতেও এসেছে পরিবর্তন।
দুধ চা পানের আদি রীতি মূলত শুরু হয়েছিল তিব্বতিদের মাধ্যমে। তিব্বতিরা বিশ্বাস করত যে, চায়ের সঙ্গে ভেড়া বা গরুর দুধ এবং মাখন মিশিয়ে পান করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং শরীরে শক্তি যোগায়। এ প্রাচীন পদ্ধতিই আধুনিক দুধ চায়ের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

সিল্ক রোড ধরে চায়ে দুধ মেশানোর এ সংস্কৃতি ভারতে পৌঁছে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এটি একটি ভিন্ন রূপ পায়। ব্রিটিশরা যখন এ দেশীয়দের বিনামূল্যে চা পান করাতে শুরু করল তখন দুধ ও চা পাতার সঙ্গে যোগ হতে থাকল বিভিন্ন সুগন্ধী মসলা।
বিংশ শতাব্দীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ব্রিটিশরা ভারত থেকে দুধ চায়ের সংস্কৃতি গ্রহণ করে। ভারতীয় মসলার বদলে ব্রিটিশ অভিজাতরা চায়ে চিনি ও মধু যোগ করতে শুরু করে। নেদারল্যান্ডসের উন্নতমানের গরুর দুধ যোগ হওয়ায় চা হয়ে ওঠে আরো ঘন ও সুস্বাদু। ইউরোপীয় ঘরানার এ দুধ চা-ই বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ইংলিশ মিল্ক টি নামে এক ধ্রুপদী পানীয় হিসেবে পরিচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপীয় ধাঁচের দুধ চা তাইওয়ানে পরিচিতি পায়। সেখানে একজন সৃজনশীল চা বিক্রেতা চায়ের সঙ্গে ট্যাপিওকা পার্ল বা কাসাবা স্টার্চের তৈরি দানা যোগ করেন। এভাবেই জন্ম হয় বিখ্যাত বাবল টি-র। আর ৯০-এর দশকে এশীয় অভিবাসীদের হাত ধরে আমেরিকায় বাবল টি বা বোবা টি-র যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে এটি কেবল এশীয় পাড়াগুলোয় সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে এটি গ্লোবাল সেনসেশন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চিজ টি (চায়ের উপরে ক্রিমি চিজের স্তর) চীনে এক নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে।










