গভীর রাত, ধানের ধারালো পাতার কিনারে জমা হচ্ছে শিশিরবিন্দু। সমতল থেকে সামান্য উঁচু মাটির চারকোনা মঞ্চ, তার সামনে হাজারো মানুষ বসে আছে মুগ্ধ চোখে। ঢোলের তালে তালে আঞ্চলিক ভাষায় গেয়ে উঠছেন শিল্পী। সুরের ছন্দে নাচের ঢঙে এভাবেই শুরু হয় ঠাকুরগাঁওয়ের লোকনাট্যধর্মী গীতিনাট্য—'ধামের গান'
বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তের এ জনপদের মানুষের জীবনে ধামের গান শুধু বিনোদন নয়, এটি তাদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও পরিচয়ের প্রতীক। নামের ভেতর গান থাকলেও, এটি আসলে লোকনাট্য—গানের সুরে বলা হয় সংলাপ, নাচে এগোয় গল্প। মারাঘোরা গান, পালাটিয়া গান, হুলিগান, লক্ষ্মীর ধামের গান ছাড়াও এর আরো কয়েকটি নাম রয়েছে। গানের সংলাপ হয় সংক্ষিপ্ত আর ভাষা সম্পূর্ণ আঞ্চলিক।

এ লোকগানের উৎপত্তি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। জনশ্রুতি অনুযায়ী, 'ধাম’ শব্দের অর্থ নিবাস বা আশ্রয়স্থল। এ আশ্রয়স্থল দেব–দেবীর। আরাধ্য দেবতাকে তুষ্ট করা ও মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি জাগানোর উদ্দেশ্যে ধামের গানের উৎপত্তি। তবে ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা থেকে সরে এসে ধামের গান এখন মানুষের কথা বলে। গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষের হাসি তামাশা, ভালোবাসা, দুঃখ বেদনা, সামাজিক সমস্যা, জন্ম-মৃত্যুর কথা বলে। তবে প্রাচীন রীতি অনুযায়ী গান শুরুর পূর্বে দেবদেবীর বন্দনা করা হয়ে থাকে। অনেক সময় পূজারও আয়োজন করা হয়।
এ লোকগানের স্বাতন্ত্রতা—পুরুষ শিল্পীরাই নারী চরিত্রে অভিনয় করেন। নারীরা মঞ্চে উঠতেন না যখন, তখন থেকেই চলে আসছে এই প্রথা। আজও তা রয়ে গেছে ঐতিহ্য হয়ে। পুরুষরা নারীর সাজে অভিনয় করেন, সস্তা মেকাপে গলায় সুর তোলেন, চোখে-মুখে ফুটিয়ে তোলেন নারীর আবেগ।
প্রতি বছর শরৎ–হেমন্তকালে, মূলত লক্ষ্মীপূজার পর শুরু হয়ে কালীপূজা পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামে গ্রামে বসে ধামের আসর। মাটি দিয়ে তৈরি সামান্য উঁচু মঞ্চের চারপাশে পোঁতা হয় কলা বা জিগাগাছ। আয়োজক কমিটির অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হলে মঞ্চের চারপাশে দেয়া হয় বাঁশের বেড়া। সারারাত চলে নাচ ও গান, একের পর এক পালাকারের দল করে পরিবেশনা। অনেকসময় দিনেও আসে পালার দল। এ উপলক্ষে ধামের আশপাশের বাড়ির আত্মীয়রা বেড়াতে আসে, মেয়ে বাপের বাড়ি নাইওর যায়। ধামকে ঘিরে মেলা বসে, আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে গ্রামীণ রাত।

স্থানীয় সূত্র বলছে, জেলায় এখনো ১২০০ থেকে ১৫০০টি ধামের গানের দল সক্রিয় রয়েছে। শুধু সদর উপজেলাতেই ৬০০টির বেশি ‘ধাম’ বা আয়োজনস্থল আছে। ধামের গানের আয়োজকরা গানের মান যাচাই করে শিল্পী কলাকুশলী ও তাদের দলকে সম্মানী দেয়। প্রত্যেক অভিনেতার সম্মানী ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দেয়া হয়। বিভিন্ন ধামে পরিবেশনা করা পালাদলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়েঅজন করা হয়।প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলকে পুরস্কার দেয়া হয় টেলিভিশন, বাইসাইকেল, গরু-মহিষ ও হারমোনিয়াম।
তবে আকাশ সংস্কৃতির যুগে ক্রমেই জৌলুশ হারাচ্ছে ধামের গান। অর্থের অভাব ও পৃষ্ঠপোষকতা সংকটে ধামের গানের পরিধি কমে আসছে। নতুন প্রজন্মও ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
তবু যারা এখনো গান গেয়ে, অভিনয় করে, রাতভর ঢোলে তাল তোলেন—তাদের জন্যই ঠাকুরগাঁও আজও সুরে বাঁচে, গানে বাঁচে। গবেষকদের মতে, ‘ধামের গান’ শুধু লোকজ বিনোদন নয়; এটি এই অঞ্চলের মানুষের আত্মপরিচয়ের জীবন্ত প্রতীক।










