আমি যে জলসাঘরে বেলোয়াড়ী ঝাড়, নিশি ফুরালে কেহ চায় না আমায় জানি গো আর…
নিশ্চয়ই আপনার কানে বেজে উঠলো কালজয়ী এ গানের ক্ল্যাসিকাল সেই সুর?
আসুন একটা অন্য গানের কথা বলি- আমি আগন্তুক, আমি বার্তা দিলাম, কঠিন অঙ্ক এক কষতে দিলাম…
হয়তো অনেকেই মনে করতে পারছেন না এ গান। গানটি ১৯৬৬ সালের উত্তম কুমারের 'শঙ্খবেলা' সিনেমার। কোনো রাগ বা নির্দিষ্ট ঘরানার বাঁধন নেই, নেই গাম্ভীর্য। আছে এক স্বাধীন ভাবনা, মজা আর দুষ্টুমির আমেজ।
দুটি গানই বাংলা তথা ভারতীয় সঙ্গীত জগতের প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে’র। তিনি এমন একজন শিল্পী যাকে নির্দিষ্ট কোনো ঘরানায় ফেলা যায় না। বারবার তিনি নিজেকে ভেঙ্গেছেন, আবার গড়েছেন নতুন রূপে। এ ভাঙা-গড়ার খেলায় তিনি মেতেছিলেন পশ ক্ল্যাসিকালের যুগে। হার্ডকোর ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের ছাত্র হয়েও নিজেকে ক্ল্যাসিকাল মিউজিকে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি। গড়েছেন আধুনিক বাংলা গানের সাম্রাজ্য।
ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে মান্না দে নামটি যেন এক চলমান সেতু—যা ক্ল্যাসিকাল সুরের মাটির গভীরতা থেকে শুরু করে আধুনিক গানের শহুরে ব্যস্ততাকে ছুঁয়ে গেছে অনায়াসে। তিনি ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন, গানকে জীবন্ত করে তুলেছেন। ওপরের দুটি গানই তার প্রমাণ, এ যেন এক শিল্পীর আত্ম-পরিবর্তনের দুই অধ্যায়। প্রথমটিতে ঐতিহ্যের গাম্ভীর্য, দ্বিতীয়টিতে আধুনিকতার ছোঁয়া।
মান্না দে’র সঙ্গীতজীবনের শিকড় গভীরে প্রোথিত ক্লাসিকাল সংগীতে। উস্তাদ আমান আলি খানের শিষ্যত্বে তিনি রাগ-রাগিণীর কঠিন পাঠ নিয়েছিলেন। সেই শিক্ষার প্রমাণ মেলে তার গানে- লাগা চুনরি মে দাগ, সুর না সজে, কি গাও মে কিংবা ফুল গেন্দা ফুল, যেখানে শুদ্ধ সংগীতের ভেতরে এক গভীর আবেগ ও সংযম খুঁজে পাওয়া যায়।
কিন্তু মান্না দে শুধু রাগের শিল্পী নন, তিনি ছিলেন সময়ের সুরকার। ষাট-সত্তরের দশকে যখন সিনেমার সঙ্গীত জনপ্রিয়তার মোড় নিচ্ছিল, তখন তিনি নিজের গলার পরিধি বাড়িয়ে আধুনিক গানের জগতে প্রবেশ করেন। এহ ভাই, জারা দেখ কে চলো বা জিন্দেগি কা সফর, এসব গানে তিনি এক নতুন মান্না দে; প্রাণবন্ত, কৌতুকময়, কখনো দার্শনিক।
যদি কাগজে লিখ নাম, কতদিন দেখিনি তোমায়, খুব জানতে ইচ্ছে করে, সবাই তো সুখী হতে চায়, আবার হবে তো দেখা, শাওন রাতে যদি, সে আমার ছোট বোন, জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই, ক ফোঁটা চোখের জল, কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেইসহ বহু কালজয়ী ও শ্রোতাপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়ে গেছেন বাংলা গানের রাজ্যে।
মান্না দে’র গান কেবল সুরের বৈচিত্র্য নয়, এটি আত্ম-আবিষ্কারের প্রতিফলনও বটে। তিনি কখনো রবীন্দ্রসংগীতে শান্ত, কখনও কিশোরকণ্ঠে জীবন্ত, আবার কখনও গজলে গম্ভীর। প্রতিবারই নিজের পুরনো সত্তাকে ভেঙে নতুন এক মান্না দে হয়ে উঠেছেন, যেন এক সংগীতশিল্পীর বিবর্তনের জীবন্ত উদাহরণ।
৯০ এর দশক, বাংলা গানে এক নতুন ধারার উত্থান ঘটে। করীর সুমন, নচিকেতা ভিন্নধারার গান যা পরিচিতি পেয়েছে জীবন্মুখী গান হিসেবে, সেই গান দিয়ে জয় করে নিচ্ছেন বাঙালী শ্রোতার মন। ঠিক সেই সময়ে মান্না দে নিয়ে এলেন এক শ্যামা সঙ্গীতের অ্যালবাম ‘মা আমার মা’। এবং এখানেও রেখে গেলেন শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। বাংলা ভক্তিমূলক সেই গান শ্রোতারা এতোটাই গ্রহণ করেছিল যে, সে বছর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছিল অ্যালবামটি। এভাবেই একের পর এক সফল ভাঙা-গড়ার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন এ প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতশিল্পী।
মান্না দে এমন এক সময়ে সঙ্গগীত জগতে প্রবেশ করেন, যখন সঙ্গীতভূবন রাজ করছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সেই সময়ে মান্না দে মোহাম্মদ রাফি, কিশোর কুমারের সাথে এক কাতারে জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন নিজ গুণে।
তিনি শুধু নিজেকেই ভাঙেননি, হাত ধরেছিলেন ভিন্নধারার সংগীতকারদের। সেই দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই শচীনপুত্রের দিকে তাকালেই। শচীন দেববর্মণ যখন পুত্রের ভিন্নধারার সংগীতের প্রতি বিরাগভাজন, পুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত, তখন রাহুল দেববর্মণের সঙ্গে জুটি বাঁধলেন মান্না দে। সৃষ্টি হলো নতুন এক ইতিহাস।
শচীন দেব বর্মণ এবং অন্যন্য সঙ্গীত পরিচালকদের সুরে ১৯৪০, ৫০ ও ৬০-এর দশকে প্রচুর কালজয়ী সিনেমার গান উপহার দিয়েছেন তিনি। ১৯৫৩ সালে 'কতদূরে আর নিয়ে যাবে বলো' গানটি তার রেকর্ড করা প্রথম বাংলা গান। ১৯৬০-এর দশক থেকে বাংলা সিনেমায় প্লে-ব্যাকেও তিনি ছিলেন অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠশিল্পী। 'তামান্না' ছবিতে সুরাইয়ার সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে 'জাগো এয় ঊষা' গানটি প্লে-ব্যাকে তার প্রথম গান। তবে হিন্দি সিনেমায় তার প্রথম একক হিট গান ১৯৪৩ সালে 'উপর গগন বিশাল'।
বাংলা ও হিন্দি ছাড়াও পাঞ্জাবি, গুজরাতি, মারাঠি, কন্নড়, মালায়ালম ইত্যাদি ভাষাতেও তিনি গান গেয়ে গানের জগতে তৈরি করেছিলেন এক নতুন অধ্যায়।
প্রেম, বিরহ, আধ্যাতিকতা, দুষ্টুমি সবই ছিল তার গানে। মান্না দের বিভিন্ন ধরণের, নানা আঙ্গিকের গান গাওয়ার সহজাত প্রতিভার কারণেই জনপ্রিয়তম সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে তিনি অন্যতম হয়ে উঠেছিলেন।
মান্না দে শুধু কালজয়ী সঙ্গীতশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন গুণী সুরকারও। ‘সুরকার হিসেবেই তো মান্না দে’র আবির্ভাব’ এক স্মৃতিচারণে এমনটিই বলেছিলেন তার বহু গানের গীতিকার দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী । সুরকার মান্না দে কে নিয়ে সে গল্প আরেকদিন হবে।
আজ বাঙালির প্রাণের এ শিল্পীর চলে যাবার দিন। ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর ৯৪ বছর বয়সে বেঙ্গালুরুর হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মান্না দে।
বাঙালির হৃদয় জগতে জায়গা করে নেয়া এ শিল্পী ১৯১৯ সালের পয়লা মে বাবা পূর্ণচন্দ্র দে আর মা মহামায়া দের ঘরে জন্মেছিলেন। শিশু মান্না তার প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু করেন ‘ইন্দু বাবুর পাঠশালা’ নামে একটি প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে। এরপর ‘স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুল’ ও ‘স্কটিশ চার্চ কলেজ’ এবং বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
মান্না দে'র গান শেখা শুরু ১৯২০ ও ৩০-এর দশকের বিখ্যাত গায়ক কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে'র কাছে। ভ্রাতুষ্পুত্র মান্না দে ছিলেন অন্ধ কৃষ্ণচন্দ্র দে’র শিষ্য ও সহকারী। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিয়েছেন উস্তাদ দবির খানের কাছে। এ ছাড়াও তিনি উস্তাদ আমান আলি খান ও উস্তাদ আব্দুল রহমান খানের কাছে উর্দু সঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন। সব ভাষাভাষী মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র ক্ষেত্রের জন্য ভারত সরকার তাকে সম্মানিত করেছে সর্বোচ্চ পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে। এর আগে পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ সম্মাননাসহ পেয়েছেন দেশ-বিদেশের অজস্র পুরস্কার।
মান্না দে ছিলেন এমন এক সংগীতভ্রমণকারী, যিনি কখনো থামেননি। তিনি সময়কে শুনেছেন, সময়কে গেয়েছেন, আর সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছেন—বারবার, অবিরাম। আজ সেই গান মনে পড়ছে,
যদি কাগজে লেখো নাম, কাগজ ছিড়ে যাবে
পাথরে লেখ নাম, পাথর ক্ষয়ে যাবে
হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে…
মান্না দে’র নাম লেখা আছে আমাদের হৃদয়ে, তিনি বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে তার সুরে, সঙ্গীতে।










