রাতের তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা মানুষেরা বিস্মিত হই আর অস্ট্রেলিয়ার এক ক্ষুদ্র পতঙ্গ— বোগং মথ, সেই আকাশই ব্যবহার করে তাদের দীর্ঘ যাত্রার দিক নির্ধারণে। অদ্ভুত হলেও সত্যি, প্রতি বছর বসন্তে এই বাদামি রঙের পতঙ্গ প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল থেকে ঠান্ডা পাহাড়ি গুহার খোঁজে।
এই যাত্রা শুধু নিছক পরিব্রাজন নয়। বরং জীবন নিঃশেষের প্রস্তুতি। অস্ট্রেলিয়ান আল্পসের গুহায় পৌঁছে তারা দল বেঁধে নিশ্চল থাকে পুরো গ্রীষ্মে। শরতের শুরুতে ফেরার পথে প্রজনন সম্পন্ন করেই জীবনচক্র শেষ করে এরা। কিন্তু তার আগেই পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে রয়ে যায় সেই দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি— যা তাদের কোনো শিক্ষক শেখায় না কিংবা লেখা থাকে না কোনো মানচিত্রে।
সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এরিক ওয়ারান্টের নেতৃত্বে এক গবেষণায় উঠে এসেছে, এই মথরা শুধু আকাশের তারা দেখেই তাদের গন্তব্য ঠিক করে। দিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র ব্যবহার করে না। তারা একইসঙ্গে দুই ধরনের সংকেত— চৌম্বকক্ষেত্র ও তারাভিত্তিক মানদণ্ড ব্যবহার করে। একটি ব্যর্থ হলে অন্যটি তারা বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়।
এ উদ্দেশ্যে গবেষক ওয়ারান্ট নিজের বাসায় একটি পরীক্ষাগার তৈরি করেন। অস্ট্রেলিয়ান আল্পস থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে, ছড়ি লাগানো মথগুলোকে এক বিশেষ যন্ত্রে উড়তে দেন, যেখানে তারা আকাশে তারার প্রক্ষেপণ দেখতে পায়। দেখা যায়, জন্ম থেকেই তারা সঠিক দিকে উড়ে যেতে পারে। গবেষণায় অংশ নেয় ৪০০টির বেশি মথ, যাদের অধিকাংশকেই পরে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়া হয়। ৫০টি মথের চোখে ইলেকট্রোড বসিয়ে তাদের আলো-সংবেদনশীলতা যাচাই করা হয়।
ফলে দেখা যায়, মানুষের চেয়ে প্রায় ১৫ গুণ বেশি আলো দেখতে পায় এই পতঙ্গ, যা মিল্কিওয়ে পর্যন্ত দেখতে সক্ষম করে। সেই আকাশই যেন তাদের জন্য এক জীবন্ত দিকনির্দেশক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবেই প্রকৃতি নিজের অসাধারণ শৈলীতে তৈরি করে চলেছে এমন সব জীব, যাদের আচরণ আজো মানুষের কাছে রহস্যময়। জীবনে তারা মাত্র একবারই যাত্রা করে, অথচ কী নির্ভুলভাবে গন্তব্যে পৌঁছে যায়!










