ছুটির দিনের অলস দুপুরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাদুঘরে জড়ো হয়েছেন কয়েক ডজন মানুষ। তারা অধিকাংশই পরস্পরকে চেনেন না। উপস্থিত প্রায় সবারই উদ্দেশ্য এক—ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং বন্ধুত্ব গড়ে তোলা। আগত অতিথিদের কেউ হালকা পানীয়তে চুমুক দিচ্ছেন, কেউবা মেতেছেন পারস্পরিক আলাপচারিতায়।

কিন্তু অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার ঠিক আধঘণ্টা পর মুখরিত আড্ডাস্থলে নেমে এল পিনপতন নীরবতা। কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ মুহূর্তেই রূপান্তরিত হলো শান্ত, নিভৃত পাঠাগারে। বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না সেখানে। এক ঘণ্টার এ নীরব যাপন শেষ হওয়ার পর ফের শুরু হলো গল্পগুজব ও চেনা আড্ডা। মূলত, এটি ছিল বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘সাইলেন্ট বুক ক্লাব’র একটি স্থানীয় আয়োজন।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘সাইলেন্ট বুক ক্লাব’ কিংবা এ ধরনের অনলাইন ও অফলাইন রিডিং পার্টি এবং ‘বুকটক’র জনপ্রিয়তা দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ কোটিরও বেশি মানুষের ওপর করা ‘আমেরিকান টাইম ইউজ সার্ভে’র তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বিগত ২০ বছরে মানুষের আনন্দের জন্য বই পড়ার অভ্যাস বা প্রবণতা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মানুষকে পুনরায় বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে এবং যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে এ আয়োজনগুলো এখন বিশ্বজুড়ে একটি অনানুষ্ঠানিক ও শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন হিসেবে কাজ করছে।

silent_book_club12

ছবি: সিএনএন

স্মার্টফোনের স্ক্রিনে অন্তহীন স্ক্রলিং বা সোশ্যাল মিডিয়ার রিল ও শর্টস দেখার অস্থির যুগে জীবনের গতিকে কিছুটা স্থির করতে এ ধরনের আয়োজন চমৎকার দাওয়াই হিসেবে কাজ করছে। আমেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট স্যাম হেলমিক বলেন, অবসর সময়ে বা আনন্দের জন্য বই পড়া মানুষের মস্তিষ্কের ক্লান্তি দূর করতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। কারণ এ ধরনের পড়ার পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য, পরীক্ষা বা বাধ্যবাধকতা থাকে না, যা মনকে চাপমুক্ত রাখে।

বিশ্বজুড়ে যখন মানুষের মাঝে মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং নিদ্রাহীনতার মতো সমস্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, তখন গবেষকরা মনে করছেন, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘রিডিং হ্যাবিট’ বা পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বই পড়া কেন মস্তিষ্কের জন্য উপকারী?

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড এপিডেমিওলজি বিষয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জেসিকা বোন বলেন, এ ধরনের সামাজিক আয়োজনগুলোর কারণে রাতারাতি প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে আনন্দের জন্য পড়ার হার ব্যাপক বেড়ে যাবে—এমনটা হয়তো নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে পড়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ও পরিবেশ বেঁধে দেয়ার ফলে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ও মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পড়ার অভ্যাস মানুষের শব্দভাণ্ডার বাড়ায়, সাধারণ জ্ঞান বৃদ্ধি করে এবং কল্পনাশক্তিকে তীব্রভাবে উদ্দীপিত করে। কেবল তা-ই নয়, প্রবীণদের ক্ষেত্রেও এটি দারুণ কার্যকর। সপ্তাহে অন্তত একবার বা তার বেশি সময় বই পড়লে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্মৃতিভ্রমের (ডিমেনশিয়া) ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যর ক্ষেত্রেও বই পড়ার উপকারিতা অপরিসীম। এ অভ্যাস মানুষের কর্টিসল হরমোনের (মানসিক চাপের হরমোন) মাত্রা কমায়, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার লক্ষণগুলো দূর করে এবং রাতে ভালো ঘুমে সহায়তা করে। এমনকি দীর্ঘায়ু হওয়ার সঙ্গেও বই পড়ার ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে; নিয়মিত বই পড়লে তা মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

silent_book_club13

ছবি: সিএনএন

রিডিং পার্টি: পড়ার উন্মুক্ত আমন্ত্রণ

‘সাইলেন্ট বুক ক্লাব’র মতো ‘রিডিং রিদমস’ নামের আরেকটি সংস্থাও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বড় বড় শহরে এ ধরনের রিডিং পার্টির আয়োজন করে থাকে, যেখানে আগ্রহীরা অনলাইনে টিকিট কেটে অংশ নেন। এখানে কোনো নির্দিষ্ট বই পড়ে আসার তাগিদ থাকে না; যে কেউ যেকোনো ধরনের পড়ার সামগ্রী নিয়ে এ আড্ডায় যোগ দিতে পারেন।

তবে ডিজিটাল ডিভাইসে পড়ার ক্ষেত্রে গবেষকদের অভিমত, অনলাইন বা বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইসে পড়াটাও অবশ্যই পড়ার মধ্যে গণ্য হয়, কিন্তু স্ক্রিনে পড়ার সময় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নোটিফিকেশন বা অন্যান্য কনটেন্টের কারণে মানুষের মনোযোগ সহজে বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে মানুষ বইয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারে না এবং পড়ার পেছনে সামগ্রিক সময় কমে যায়।

silent_book_club11

ছবি: সিএনএন

নতুন করে বই পড়ার অভ্যাস শুরু করবেন যেভাবে

প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে সময় বের করা অত্যন্ত কঠিন। তবে প্রবল ইচ্ছা থাকলে যান্ত্রিক জীবনের রুটিন থেকে সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা নিজের জন্য এবং বইয়ের জন্য আলাদা করে রাখা সম্ভব। গবেষকদের মতে, স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের তুলনায় একজন কর্মব্যস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য নতুন করে বা নতুন উপায়ে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা বেশ কঠিন, তবে এটি একেবারেই অসম্ভব নয়।

পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন। লাইব্রেরি বা বইয়ের দোকানে গিয়ে নিজের আদি ও অকৃত্রিম কৌতূহলকে সঙ্গী করে বই বেছে নেয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি অটোমোবাইল বা মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষিত হন, তবে সেই বিষয়ক কোনো হালকা গল্পের বই বা ম্যাগাজিন পড়ার মাধ্যমেই তার নতুন অভ্যাস শুরু হতে পারে। আনন্দের জন্য পড়ার ক্ষেত্রে কোনো কৃত্রিম বাধ্যবাধকতা আরোপ করা উচিত নয়।

সিএনএন অবলম্বনে