আঠারো শতকের মার্কিন শিক্ষাবিদ হরেস ম্যান বলেছিলেন, সত্যিকার জ্ঞানে যোগ হওয়া প্রতিটি সংযোজনই মানবশক্তির নবতর সংযোজন। তার এ উক্তি আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা এক জরুরি প্রশ্ন। কিছু তথ্য তুলে ধরছি। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশ হয়েছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশনের বৈশ্বিক জ্ঞান সূচক। সর্বশেষ প্রকাশিত এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে। তথ্য বলছে, ১৫৪টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১২০তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে পাকিস্তান (১২৩), নেপাল (১২৮) ও আফগানিস্তান (১৫১)। এ অঞ্চলে শীর্ষে রয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট জর্জরিত শ্রীলংকা (৮৬)। ভারত ও ভুটান যথাক্রমে ৯৭ ও ১০৮তম স্থানে।
২০১৭ সাল থেকে বৈশ্বিক জ্ঞান সূচক নিয়মিত প্রকাশ হয়ে আসছে। এতে প্রধান সাতটি ক্ষেত্র বিবেচনায় নেয়া হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সহায়ক পরিবেশ। বলতে গেলে জ্ঞান সূচকে বিবেচ্য সব চলকেই আমাদের নৈপুণ্য খারাপ। শুধু তা-ই নয়, বৈশ্বিক প্রতিভা সূচক ও বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকেও আমাদের অবস্থা খারাপ। ফ্রান্সভিত্তিক বিজনেস স্কুল ইনসিয়েড ও ওয়াশিংটনভিত্তিক পোর্টুল্যান্স ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিভা সূচকে ১৩৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩ নম্বরে। একইভাবে জাতিসংঘের সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন প্রকাশিত সর্বশেষ বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে ১৩২ দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১১৬ নম্বরে। সবচেয়ে হতাশাজনক হলো এ দুটো সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে বাংলাদেশ। এসব তথ্য স্পষ্টত বৈশ্বিক জ্ঞান পরিমণ্ডলে দেশের দৈন্যদশাই তুলে ধরে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পূর্ণ করেছে এখন বাংলাদেশ। সময়ের ব্যবধানে দেশে শিক্ষায় অবকাঠামোগত ও সংখ্যাগত বড় উল্লম্ফন হয়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে এখনো একটা জ্ঞানবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে পারিনি আমরা। এ পিছিয়ে থাকার ক্ষেত্রে বেশকিছু ফ্যাক্টর কাজ করছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নতুন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ৫২। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৮টি। কিন্তু সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র, গ্রন্থাগার ও ল্যাব সুবিধার স্বল্পতায় ভুগছে। ধুঁকছে উচ্চমানের শিক্ষক ও উন্নত ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেখানে জ্ঞানচর্চা হওয়ার কথা, সেখানেও আমরা জ্ঞানের মূল্য দিতে পারছি না। প্রতিষ্ঠানের যিনি প্রধান হচ্ছেন তিনি জ্ঞানানুশীলনের জন্য সেই জায়গায় যাচ্ছেন না, যাচ্ছেন নিজের আখের গোছাতে। তার যোগ্যতাটা হচ্ছে তিনি দলের সঙ্গে আছেন, রাজনৈতিক আনুকূল্য পাচ্ছেন, তদবির করছেন। কাজেই তিনি কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারছেন না। আবার যারা শিক্ষকতায় নিযুক্ত হচ্ছেন, তাদের উন্নতি নির্ভর করছে ওই দলীয় আনুগত্যের ওপর। সেজন্য গবেষণাও হচ্ছে না, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনাও তেমন প্রকাশ হচ্ছে না। তদুপরি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানান্বেষণায় অনুপ্রাণিত করতে পারছেন না তারা। শিক্ষাক্রমও তেমন যুগোপযোগী নয়। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলায় যা পড়ানো হচ্ছে, তার ব্যবহারিক মূল্য খুবই কম। অন্যদিকে যার ব্যবহারিক মূল্য আছে, সে জ্ঞান আমরা শিক্ষার্থীদের দিতে পারছি না। প্রতিষ্ঠানগুলো নানা অনিয়মে জীর্ণ। কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নেই। জবাবদিহিতা না থাকলে স্বভাবত বিকাশ হয় না। জ্ঞান বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ প্রশ্ন-উত্তরের একটা সুস্থ চর্চা গড়ে তোলা। সেটা আমরা নিশ্চিত করতে পারছি না। মোটাদাগে বলতে গেলে জ্ঞানচর্চার এক মুক্ত ও সহায়ক পরিবেশের অভাবই জ্ঞান সূচকে আজকের নিম্নগামিতার বড় কারণ।
বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে বরাবরই ভালো করছে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলো। এবারো শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে সুইজারল্যান্ড। দ্বিতীয় অবস্থানে সুইডেন। তৃতীয় অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম পাঁচে আছে স্ক্যান্ডিনেভীয় আরো দুটি দেশ: ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস। এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো করেছে সিঙ্গাপুর। দেশটির বৈশ্বিক অবস্থান ষষ্ঠ। ভালো অবস্থানে আছে ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চীন। মূলত প্রশিক্ষণ ও গবেষণার পর্যাপ্ত সুবিধা, মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান, অত্যাধুনিক উত্পাদন প্রক্রিয়া, যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা আর সুশাসিত ও জবাবদিহিতামূলক শাসন ব্যবস্থা দেশগুলোকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে, যা আমাদের মতো তলানিতে থাকা দেশের জন্য শিক্ষাপ্রদ।
গত অর্ধশতকে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চমকপ্রদ অগ্রগতি হয়েছে। এর পেছনে অন্যতম বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে স্বল্পদক্ষ সস্তা শ্রম। বৈশ্বিক দৃশ্যপটে সবকিছু দ্রুত বদলে যাচ্ছে। দেশগুলো প্রবেশ করছে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে। সামনে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরো বাড়বে। দুর্বল মানবসম্পদ দিয়ে আমরা ওই প্রতিযোগিতায় পেরে উঠব না। কাজেই মানবসম্পদের উত্পাদনশীলতা ও দক্ষতা অনেক বাড়াতে হবে। জনশক্তির কর্মনৈপুণ্য বাড়ানোর পূর্বশর্ত একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ-রাষ্ট্র বিনির্মাণ। এটা ভুলে গেলে চলবে না।
প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বায়িত দুনিয়ায় এগিয়ে যেতে দেশের জ্ঞানগত ভিত্তি আরো মজুবত ও টেকসই করার বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে দ্রুত দৃষ্টি দেয়া জরুরি। সর্বাগ্রে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থা। আবর্তনশীল বৈশ্বিক ইকোসিস্টেমের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হালনাগাদ পাঠক্রম প্রণয়ন করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সেগুলো আরো বেগবান করতে হবে। আগে মানসম্পন্ন প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা জোগানোর ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে ঐতিহ্যবাহী জিলা স্কুলগুলো এবং শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী ১৬ কলেজ। রাজনৈতক দুর্বৃাত্তয়ন, ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতা, মানসম্পন্ন নিবেদিত শিক্ষক ঘাটতিসহ নানা সীমাবদ্ধতায় সেগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ঔজ্জ্বল্য অনেকটা ম্লান হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সার্বিকভাবে আরো সুসজ্জিত করতে হবে। তৈরি করতে হবে আরো অনেক মডেল স্কুল ও কলেজ। একইভাবে পাঠদানের চিরায়ত গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণামুখী করাও দরকার। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বের কীর্তিময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে জ্ঞানগত বিনিময়, যৌথ সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এটা দেশে আন্তর্জাতিক গবেষক ও স্নাতক তৈরিতে অনেকটা সহায়ক হবে বৈকি।
শিক্ষা ব্যবস্থার দৈন্য কাটাতে অর্থায়ন একটা বড় ইস্যু। ইউনেস্কোর মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা খাতে ন্যূনতম জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। গবেষণা বলছে, বেশির ভাগ দেশে শিক্ষা খাতে গড় ব্যয় জিডিপির সাড়ে ৪ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশ ব্যয় করে ২ শতাংশেরও কম। এমনকি তা আফ্রিকার দক্ষিণ সুদান, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ার মতো দারিদ্র্য ও সংকটপীড়িত দেশের চেয়েও কম। সদ্য পাস হওয়া বাজেটের তথ্যানুযায়ী, জিডিপির তুলনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মাত্র ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ! এ স্বল্প বরাদ্দ দিয়ে বেশি দূর এগোনো যাবে না। কাজেই যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিতে সরকারি বরাদ্দ লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়াতে হবে।
শুধু রাষ্ট্র নয়, এখানে ব্যক্তি খাতেরও একটা বড় ভূমিকা আছে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ-রাষ্ট্র নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, জাপান প্রভৃতি উন্নত দেশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো খ্যাতিজোড়া উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। বেশি দূর যেতে হবে না। প্রতিবেশী ভারতেও টাটা, আদানি, আম্বানি প্রভৃতি শিল্প গ্রুপে আন্তর্জাতিক মানের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষণা কেন্দ্রের দেখা মেলে। এদিক থেকে আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা এখনো পিছিয়ে। সামনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের ব্যক্তি খাতকেও উচ্চমানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান তৈরিতে অর্থায়ন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি প্রয়োজন জ্ঞান পরিচর্যাকারী এক সহায়ক পরিবেশ।
উন্নয়নের নতুন ধাপের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। ২০২৬ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী ২০৩১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। অনেক অত্যাবশ্যক প্রযুক্তি আমাদের আয়ত্তের বাইরে আছে। তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ বেশ ভালো করছে; কিন্তু এ খাতে টেকসই উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। এ কারণে উন্নত দেশ দূরে থাক, মধ্যম মানের ২৪টি দেশের মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচের দিকে। এ নাজুক অবস্থান নিয়ে সামনে কতটা এগোতে পারব, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
হুমায়ুন কবির: সাংবাদিক










