ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখানোর আগে বিশ্ব যখন তাকে চিনতো না, সে সময় খালেদা খানম ছিলেন কেবল একজন লাজুক, মৃদুভাষী, অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে, যার পৃথিবী ছিল তার পরিবারের ঘরের সীমাবদ্ধতায়। ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে যখন বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত একেবারে শুকোয়নি, জলপাইগুড়ির নয়াবাজারের মজুমদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করা খালেদা খানম বড় হচ্ছিল পাঁচ ভাইবোনের বিশাল পরিবারে। সেখানে দিন শুরু হতো সকালের চায়ের সুবাস দিয়ে এবং শেষ হতো বাবার মুখে রূপকথার গল্প শুনে। ইস্কান্দার মজুমদার ও বেগম তায়েবা মজুমদারের তৃতীয় সন্তানটি ছিল নরম, কোমল ও স্বল্পভাষী। জীবন কতটা অপ্রত্যাশিতভাবে তাকে সে সুরক্ষিত বৃত্ত থেকে বের করে নিয়ে যাবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি।

১৯৬০ সালের আগস্ট মাসটি খালেদা খানমের জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা দেয়। ১৫ বছরের এ কন্যা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। খালেদা খানম থেকে বেগম খালেদা জিয়ার পথে রূপান্তরটি এক রূপকথার গল্পের মতোই সুন্দর। খালেদা জিয়া ছিলেন জিয়াউর রহমানের দূর সম্পর্কের খালাতো বোন। তার সৌন্দর্যের কথা নানাজনের মুখে শুনেই জিয়াউর রহমান তাকে দেখেন, মুগ্ধ হন এবং তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান ছিলেন সুশৃঙ্খল, দৃঢ়নিশ্চয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর খালেদা জিয়া ছিলেন কোমল, সংযত, মৃদুভাষী ও ঘরকুনো।

যখন জিয়াউর রহমান ঢাকায়, চট্টগ্রামে ও অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন বেগম জিয়া শিখেছিলেন সামরিক পরিবারের ছন্দ, আকস্মিক বদলি, স্বামীর জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, গভীর রাতের উদ্বেগ এবং সেই ভয়, যা প্রতিটি সামরিক অফিসারের স্ত্রীর হৃদয়ে নিঃশব্দে প্রবাহিত হয়।

তারপর যখন তাদের সন্তানরা—তারেক রহমান পিনো (১৯৬৬-বর্তমান) এবং আরাফাত রহমান কোকো (১৯৬৯-২০১৫) এল, বেগম জিয়া আরো গভীরভাবে সংসারের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন। তিনি নিজের হাতে তাদের শীতকালীন সোয়েটার সেলাই করতেন। জ্বরের সময় তাদের বিছানার পাশে বসে রাত কাটাতেন, স্কুলের হোমওয়ার্ক দেখতেন এবং স্বামীর অপেক্ষায় নির্ঘুম রাত পার করতেন। তার পৃথিবী ছিল ছোট, কিন্তু দায়িত্বের বোঝা ছিল বিশাল।

১৯৬০-এর দশকের শেষার্ধ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভীতির মাত্রা আরো বাড়ে। যুদ্ধের সময় তিনি বন্দি হন। বন্দি অবস্থায় কয়েক মাস কাটান ভীষণ যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার মাঝে। প্রতিটি গুজব ও ফিসফিসে কান পেতে একটাই খবর পেতে চাইতেন কোথায় আছেন জিয়াউর রহমান? সে মাসগুলো তার জীবনের দুর্বিষহ দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবু তিনি নিঃশব্দে তা সহ্য করেছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের শেষ দিকে জিয়াউর রহমান ফিরে এলে উদযাপনের মাধ্যমে নয়, বরং স্বস্তির দীর্ঘ নিশ্বাসের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন বেগম জিয়া। তার বোন খুরশিদ জাহান বলেছিলেন, ‌জিয়া যেদিন ফিরে এল, বাড়িতে ঢুকেই পুতুলকে (খালেদা জিয়া) জড়িয়ে ধরে ছিল অনেকক্ষণ। কেউ কোনো কথা বলছিল না। পরে অবশ্য আমাকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়েছিল।’

এরপর ৩০ মে ১৯৮১ সালের ভোরের প্রথম ঘণ্টায় খবরটি এল, চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে বেগম জিয়া নানা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছিলেন, কিন্তু কখনো এমন চূড়ান্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হননি। ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হলেন। এত কম বয়সে তিনি সে মানুষটিকে হারালেন, যাকে ঘিরেই তার জীবন ভরে ছিল। তিনি ভেঙে পড়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ছোট সন্তানদের দেখাশোনা করতে করতে কখন যেন ভীষণ দৃঢ় হয়ে উঠলেন।

বেগম জিয়ার পরবর্তী দিনগুলো ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। তিনি কম কথা বলতেন, বেশি পর্যবেক্ষণ করতেন এবং দৃঢ়তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে গড়ে তুলতে থাকলেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অবশেষে ১৯৮৪ সালে তিনি নির্বাচিত হন বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে।

১৯৮০-এর দশকের শেষের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তার নেতৃত্ব আরো পরিপক্ব হয়। গ্রেফতার, গৃহবন্দি ও পুলিশি দমন সন্ত্রাসের মধ্যেও তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। চাপের মধ্যে তার স্থিরতা তাকে জাতীয় মর্যাদা এনে দেয় এবং তাকে সত্যিকারের রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

১৯৯১ সালে যখন বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে, ইতিহাস খালেদা জিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয় এবং সেই সাধারণ গৃহবধূ ২০ মার্চ ১৯৯১-এ শপথ নেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তিনি হয়ে ওঠেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বের নির্বাচিত প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একজন।

তার সরকার প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং ১৯৯১ সালের ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের পর পুনর্গঠনে কাজ করে। তার নেতৃত্বে দেশের চলমান ক্ষমতা ও দক্ষতা অনেককে অভিভূত করেছিল। খালেদা জিয়া দুই পূর্ণ মেয়াদ (১৯৯১-১৯৯৬, ২০০১-২০০৬) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, জটিল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জাতীয় সংকট ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের সময় দেশকে নেতৃত্ব দেন।

কিন্তু জনসমক্ষে তার রাজনৈতিক শক্তির পেছনে একজন নারী ছিলেন, যিনি শোকের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে লড়ছিলেন। কথা বলা, দাঁড়ানো, নেতৃত্ব নেয়া সবই জীবন থেকেই শিখেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি সে নারীই ছিলেন, যিনি একসময় তার সন্তানদের স্কুলের ইউনিফর্ম সাবধানে ভাঁজ করতেন। তার স্বভাব মৃদুভাষী, নিয়ন্ত্রিত, পর্যবেক্ষণশীল ছিল।

তার স্থিরতা রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের ফলে নয়, বরং জীবনের কঠিন আঘাত সহ্য করার বহু দশকের অভিজ্ঞতার ফল। দেশের সর্বোচ্চ পদেও তিনি অতীতকে সঙ্গে নিয়ে চলেছিলেন। মানুষ প্রায়ই তার নীরবতাকে দেখে বিস্মিত হতো। তবে এটি ছিল কেবল সে ঢাল, যা তিনি অজস্র শোকের মধ্য দিয়ে বাঁচার জন্য তৈরি করেছিলেন।

আনিকা চৌধুরী প্রিয়ন্তি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা