চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আয়কর ব্যবস্থায় নানা ধরনের পরিবর্তন এসেছে, কারণ বাংলাদেশের কর-জিডিপি রেশিও বাড়াতে হবে। এটি কোনো নতুন বিষয় নয়, তবে কর নেটওয়ার্ক বাড়ানোর প্রচেষ্টা সেভাবে সফল হয়নি। এবারের বাজেটেও তার ব্যতিক্রম নয়। কর বৃদ্ধির পূর্বশর্ত আয় বৃদ্ধি, সেটি প্রথমে পরিপালন দরকার কিন্তু সরকারের প্রথম লক্ষ্য—যিনি কর দেন এবং করের আওতায় রয়েছেন, তাদের অধিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা।
আয়করের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি ছিল ন্যূনতম করের বিলোপ এবং এতে করদাতারা প্রাথমিকভাবে বেশ খুশি হয়েছিলেন, কারণ ন্যূনতম কর ব্যবসায় লাভ বা লোকসান নির্বিশেষ প্রদেয় ছিল। সাধারণ ভাষায়, ব্যক্তি করদাতা যে আয় করবেন (মুনাফা) তার ওপর কর দেবেন, কিন্তু ন্যূনতম কর বা মিনিমাম ট্যাক্স হলো এমন একটি নির্দিষ্ট হারে কর যা আপনি লাভ করলেও দেবেন আবার না করলেও দিতে থাকবেন। যা-ই হোক, চলতি অর্থবছর এ ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, অর্থাৎ ন্যূনতম কর আর প্রযোজ্য নয়। তবে এর বিপরীতে একটু নতুনভাবে প্রযোজ্য হয়েছে টার্নওভার কর। এটি আগেও ছিল, তবে এ বছর কয়েক ধরনের পরিবর্তন হয়েছে এবং সর্বশেষ যে পরিবর্তন তা উদ্যোক্তাদের জন্য ভালো হয়েছে বলা যাবে না, তবে ফাইন্যান্স অ্যাক্টে যে ধরনের বিধান দেয়া হয়েছিল নতুন এসআরওতে তার কিছুটা হলেও পরিবর্তন এসেছে।
টার্নওভার কর আয়কর নয়, তবে আয়করদাতাই এটি দেবেন একটু ভিন্নভাবে। গত ৩১ আগস্ট এসআরও ৩২৪ জারির মাধ্যমে এক্ষেত্রে সর্বশেষ নির্দেশনা এসেছে। একটি সাধারণ হিসাবে দেখা যায় যে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যার টার্নওভার ৪ কোটি টাকা তার করহার বাড়বে, অন্যদিকে একজন বৃহৎ উদ্যোক্তা (১০ কোটি টাকা টার্নওভার) তার করহার প্রায় একই থাকছে। বাংলাদেশে ১১ দশমিক ৮ মিলিয়ন উদ্যোক্তার মাঝে প্রায় ১১ মিলিয়ন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং তারাই সর্বাধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন। এ খাতের জন্য অতিরিক্ত কর অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না এবং নতুন উদ্যোগ তৈরিকেও আকর্ষণীয় করবে না।
করনীতি প্রণেতারা হয়তো মনে করতে পারেন, যেহেতু ক্ষুদ্র উদ্যোগের সংখ্যা বেশি, তাই এক্ষেত্রে কর কিছুটা বৃদ্ধি পেলে কর আয় বৃদ্ধি পেতে পারে বা সামান্য বৃদ্ধি সবার জন্য সমান প্রভাব নাও ফেলতে পারে। তবে এসএমই উদ্যোগের মধ্যে যারা কুটির, ছোট ও মাঝারি, তাদের ক্ষেত্রে সামান্য করহার বৃদ্ধি বেশ কার্যকর প্রভাব ফেলে। এছাড়া এ কারণে অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগ আরো বাড়তে পারে, যা সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে বরং বিলম্বিত করতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, এটি আয়কর নামক করের সম্পূর্ণ ব্যত্যয়, কারণ এটি টার্নওভার কর। তাহলে ব্যক্তি করদাতা দুই ধরনের কর দেবেন—একটি আয়কর অর্থাৎ মুনাফার ওপর কর, অন্যটি বিক্রির ওপর কর। এ বিষয়গুলো উৎপাদন ব্যবস্থাকে করভারে নিমজ্জিত করবে এবং প্রকৃতপক্ষে মূল্যস্ফীতিকেই আকর্ষণ করবে।
দেখা যাচ্ছে, ন্যূনতম করের বিলোপ হলেও টার্নওভার কর বা বিক্রয় করের ক্ষেত্রে নানা ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর করভার বরং বাড়াবে। এসআরওটিতে প্রাথমিকভাবে এসএমইদের জন্য কিছুটা হলেও প্রাপ্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা হয়েছিল। গত জুনের ফাইন্যান্স অ্যাক্ট অনুযায়ী এটি বিলোপ করা হয়, তবে ৩১ আগস্টের এসআরও অনুযায়ী গ্রস প্রাপ্তির ২ কোটি টাকা পর্যন্ত শূন্য শতাংশ কর নির্ধারিত থাকবে বলা হয়। তবে এসআরওটিতে বলা হয়, গ্রস প্রাপ্তির ২ কোটি টাকার অধিক কিন্তু ৪ কোটি টাকার অধিক নয়—এ ধরনের গ্রস প্রাপ্তির জন্য শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে। অন্যদিকে গ্রস প্রাপ্তি ৪ কোটি টাকার অধিক হলে তার ওপর ১ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে। তবে তিনটি পণ্য, যেমন সিগারেট, বিড়ি—এ জাতীয় পণ্যে ৩ শতাংশ, বেভারেজ পণ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মোবাইল ফোনে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বিক্রয় কর আগের ন্যায় প্রযোজ্য থাকবে। তার মানে, বিক্রির ওপর যে ন্যূনতম কর সবার জন্য প্রযোজ্য ছিল সেক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এবং এটিও বলা হয়েছে যে কোনো বছর বেশি কর দিলে তা পরবর্তী বছর সমন্বয় করা যাবে। এ নিয়ম আগে ছিল না যা একটি ভালো উদ্যোগ বলে অনুমান করা যায়। তবে ক্ষুদ্র উদোক্তার এ ব্যাপারে সংশয় রয়েছে, সরকারি কোষাগারে যে অর্থ একবার ঢুকে যায় তার সমন্বয় বেশ দুরূহ এবং এর অনেকটাই নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তার ওপর।
বাংলাদেশে বার্ষিক টার্নওভারভিত্তিক ন্যূনতম কর ব্যবস্থা আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ধারা ৮২ গ-এর অধীন চালু ছিল যা পরবর্তী সময়ে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩-এর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যবস্থার আওতা এবং কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে, করহারের পরিমাণ এবং সীমা সংশোধন হয়েছে। ২০২৫ সালে অতিরিক্ত ন্যূনতম কর পরবর্তী সমন্বয়ের সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং ২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে এটিকে অগ্রিম কর ও চূড়ান্ত করের পাশাপাশি একটি পৃথক টার্নওভার কর ব্যবস্থা হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়েছে।
টার্নওভারভিত্তিক ন্যূনতম করের মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো করদাতার ঘোষিত করযোগ্য মুনাফা কম, শূন্য অথবা ঝুঁকি হলেও সরকারের জন্য ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চিত করা যায়। আগের ব্যবস্থায় কোনো যোগ্য করদাতা ব্যবসায়িকভাবে লোকসানে থাকলেও ন্যূনতম কর প্রদানে বাধ্য হতো। এর ফলে একটি নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একদিকে এ ব্যবস্থা কিছুটা রাজস্ব সুরক্ষা দেয় এবং মুনাফা কম দেখানোর মাধ্যমে কর ফাঁকি বা কর এড়ানোর প্রবণতা সীমিত করতে সহায়তা করে। তবে এটি প্রকৃত মুনাফার পরিবর্তে ব্যবসার নগদপ্রবাহ বা মোট প্রাপ্তির ওপর বোঝা সৃষ্টি করে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ক্যাশ ফ্লো এমনিতেই কম, নগদপ্রবাহ কমে গেলে তার ওপর টার্নওভার এমনিতেই কমবে।
এ বোঝা বিশেষভাবে বেশি হতে পারে সেসব উদ্যোক্তার জন্য, যার মুনাফা অপেক্ষাকৃত কম, সাময়িক লোকসানে রয়েছে অথবা যে ব্যবসা উচ্চ ইনপুট ব্যয়সম্পন্ন। যা-ই হোক, অর্থ আইন, ২০২৬ এর মাধ্যমে ধারা ১৬৩ এর পূর্ববর্তী ন্যূনতম কর কাঠামো প্রতিস্থাপিত হয়েছে। সংশোধিত কাঠামোতে অগ্রিম কর, চূড়ান্ত কর এবং টার্নওভার কর পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণভাবে টার্নওভার করের বিধান প্রযোজ্য, সেখানে মুনাফার পরিবর্তে মোট প্রাপ্তির ওপর নির্ধারিত হারে কর হিসাব হবে। বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এসএমই হওয়ায় তাদের ওপর মুনাফা বা লোকসান নির্বিশেষে ১ শতাংশ টার্নওভার কর আরোপের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ কর ব্যবসার মোট বিক্রয় বা প্রাপ্তির ওপর আরোপিত হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এর একটি অংশ পণ্যের মূল্য বা সেবার মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে ভোক্তার ওপর স্থানান্তর করতে পারেন বা করে থাকেন। এর ফলে সামগ্রিক মূল্যস্তরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার এবং পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতিতে অবদান রাখার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন দেখা যাক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য এ কর কেন বেশি হতে যাচ্ছে। ২০২৩ এর আয়কর আইনে কয়েকটি বিশেষ খাত ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে ৪ কোটি টাকার অধিক টার্নওভারের ক্ষেত্রে করহার ছিল শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। আগেই বলেছি ফাইন্যান্স অ্যাক্ট ২০২৬-এ ৪ কোটি টাকার থ্রেশহোল্ড তুলে দেয়া হয় এবং কয়েকটি খাত ব্যতীত অন্য সবার জন্য এ হার ১ শতাংশ নির্দিষ্ট করা হয়। পরবর্তী সময়ে এটি পরিবর্তন করে (৩১ আগস্ট, ২০২৬) ৪ লাখ টাকা টার্নওভার পর্যন্ত তা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নির্ধারণ হয়। টোব্যাকো, কার্বনেটেড বেভারেজ ও মোবাইল ফোনের জন্য আগের হার বহাল থাকে। তবে ২০২৩ সালের আয়কর আইনে কোনো সমন্বয়ের সুযোগ ছিল না, ২০২৬ সালের ফাইন্যান্স আইন এবং পরবর্তী সময়ের এসআরওর মাধ্যমে এটি সমন্বয়যোগ্য করা হয়।
একজন ক্ষুদ্র করদাতা তার টার্নওভার ৪ লাখ টাকা হলে বর্তমানে তাকে ২ লাখ টাকার ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হবে। তার মুনাফা ২০ শতাংশ হারে ধরা হলে ৮০ লাখ টাকা মুনাফার ওপর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর প্রদেয় হলে তার মোট করের পরিমাণ হবে প্রায় ২২ লাখ, টার্নওভার যোগ করে এখন তার মোট কর হলো ২৪ লাখ টাকা। আগের তুলনায় তার করহারের বৃদ্ধি প্রায় ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অন্যদিকে যিনি ১০ কোটি টাকার টার্নওভারের বিজনেস করছেন তার ক্ষেত্রে ১ শতাংশ হারে টার্নওভার কর অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা, তার ২০ শতাংশ হারে মুনাফা হলে ২ কোটি টাকা মুনাফার ওপর করপোরেট কর ৫৫ লাখ টাকা। ১০ লাখ টাকা টার্নওভার কর যোগ করে তার মোট করভার দাঁড়ায় ৬৫ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের আয়কর আইন অনুযায়ীও তার করভার একই ছিল, অর্থাৎ তার মোট করভার মোটামুটি একই থাকছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য করহার বেড়েছে। কারণ আগে তার জন্য যে অব্যাহতি ছিল তা যথাক্রমে হ্রাস পেয়েছে।
প্রাথমিকভাবে একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে একই উদ্যোগের জন্য ক্ষুদ্র-বৃহৎ নির্বিশেষে দুই ধরনের কর কেন দিতে হবে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য এ হার তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার কারণে বা অব্যাহতির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় ভবিষ্যতে রাজস্ব আয়ে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। কর সমন্বয়ের কার্যকরী প্রয়োগ কতখানি নিশ্চিত করা যাচ্ছে—এ ব্যাপারে কর কাঠামোতে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম অগ্রাধিকার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আর একটি দিক। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে করনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে তা কতখানি যৌক্তিক এ ব্যাপারে করদাতা এবং নীতিপ্রণেতাদের মধ্য আন্তরিক সহযোগিতা জোরদার করা দরকার।
ফেরদাউস আরা বেগম: সিইও, বিল্ড-একটি পাবলিক প্রাইভেট ডায়ালগ প্রতিষ্ঠান










