ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে তার ভৌগোলিক অবস্থান। আবার এমন সময়ও আসে, যখন বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তন একটি দেশকে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কারের সুযোগ এনে দেয়। বাংলাদেশ আজ ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একবিংশ শতাব্দীকে অনেক বিশ্লেষক এরই মধ্যে ‘এশিয়ার শতাব্দী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু এশিয়ার উত্থানের মধ্যেও আরেকটি নীরব পরিবর্তন ঘটছে। অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে আটলান্টিক অঞ্চল থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল, প্রযুক্তি এবং সামুদ্রিক যোগাযোগের নতুন মানচিত্র তৈরি হচ্ছে। এ পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বঙ্গোপসাগর।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মার্কিন নৌ-কৌশলবিদ আলফ্রেড থেয়ার মাহান দেখিয়েছিলেন, সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ শুধু সামরিক শক্তির বিষয় নয়; এটি বাণিজ্য, শিল্প ও জাতীয় সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। তার মতে, যেসব দেশ সমুদ্রকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। আজকের বাংলাদেশ সেই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। বঙ্গোপসাগরকে যদি আমরা শুধু উপকূল নয়, বরং অর্থনীতি, জ্বালানি, লজিস্টিকস এবং শিল্পায়নের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে শিখি, তাহলে সমুদ্র আমাদের উন্নয়নের নতুন ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ ভূরাজনীতিবিদ হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডার যুক্তি দিয়েছিলেন যে বিশ্ব রাজনীতি মূলত ভৌগোলিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে। একবিংশ শতাব্দীতে সেই ধারণা নতুন রূপে ফিরে এসেছে। আজ প্রতিযোগিতা শুধু স্থলভাগে নয়; সমুদ্রপথ, বন্দর, বাণিজ্য করিডোর এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে কেন্দ্র করেও। বাংলাদেশ সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে আমাদের অবস্থান কোনো সাধারণ ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি একটি কৌশলগত সম্পদ।
অন্যদিকে হেনরি কিসিঞ্জার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে সবসময় ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপের প্রতিযোগিতার মাঝখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনো এক পক্ষের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে যুক্ত করা নয়; বরং এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যেখানে প্রত্যেক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হবে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ।
বাংলাদেশের সামনে আজ যে সুযোগ এসেছে, তা এ দর্শনগুলোর এক অনন্য সমন্বয়। আমাদের ভূগোল সম্ভাবনা দিয়েছে, সমুদ্র নতুন অর্থনীতির দ্বার খুলেছে, বিশ্ব রাজনীতি আমাদের গুরুত্ব বাড়িয়েছে এবং মানবসম্পদ আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। বিশ্বের প্রায় সব বড় শক্তিই আজ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করতে আগ্রহী। চীন অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায়। ভারত আঞ্চলিক সংযোগকে আরো কার্যকর করতে আগ্রহী। জাপান গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং মানসম্পন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্য, টেকসই বিনিয়োগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে নতুন গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ আর কেবল একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়, এটি ক্রমেই একটি কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-চীন উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক এ বাস্তবতাকেই আরো স্পষ্ট করেছে। আলোচনায় শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো বা নতুন বিনিয়োগ নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ প্রযুক্তি, শিল্প আধুনিকায়ন, বন্দর উন্নয়ন এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংযোগের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এখন আর শুধু রাস্তা, সেতু কিংবা বন্দর নির্মাণের প্রকল্প নয়। এটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, উৎপাদন কেন্দ্র, লজিস্টিকস এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিকে সংযুক্ত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। সেই কৌশলে বাংলাদেশের অবস্থান দিন দিন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল হয়ে যদি ভবিষ্যতে স্থল ও অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশ বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে, আর চট্টগ্রাম বন্দর একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাবে পরিণত হতে পারে।
তবে বাস্তবতা বোঝাও জরুরি। মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাখাইন অঞ্চলের সংঘাত এবং রোহিঙ্গা সংকট এখনো এ সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। তাই অর্থনৈতিক করিডোরের যেকোনো পরিকল্পনা অবশ্যই আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের আরেকটি বড় কৌশলগত সুযোগ রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। আসিয়ান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সফল অর্থনৈতিক জোট। ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া দেখিয়েছে—দক্ষ মানবসম্পদ, রফতানিমুখী শিল্প, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক সংযোগ কীভাবে একটি দেশের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের উচিত নিজেকে কেবল দক্ষিণ এশিয়ার অংশ হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি অর্থনৈতিক সেতুবন্ধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিমসটেক, বিবিআইএন বঙ্গোপসাগরভিত্তিক সহযোগিতা এবং আসিয়ানের সঙ্গে আরো গভীর অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা আগামী দুই দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
তবে ভূরাজনীতি কখনো একমুখী নয়। চীনের বিআরআই যেমন একটি অর্থনৈতিক সংযোগের উদ্যোগ, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি, ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি এবং জাপানের ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণাও একই অঞ্চলে ভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে, সবার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত ভারসাম্য, বাস্তববাদ এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থ।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আমরা কি আমাদের মানবসম্পদকে প্রস্তুত করছি? আগামী বিশ্বের প্রতিযোগিতা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, সামুদ্রিক প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ এবং গবেষণাকে কেন্দ্র করে। যদি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে না পারে, তাহলে ভূরাজনৈতিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা অর্থনৈতিক নেতৃত্ব অর্জন করতে পারব না।
একই সঙ্গে ব্লু ইকোনমিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। বঙ্গোপসাগর কেবল মৎস্য সম্পদের উৎস নয়; এটি অফশোর জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক সেবা, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের এক বিশাল সম্ভাবনার ভাণ্ডার।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই আগামী শতাব্দীর রাষ্ট্র হতে চায়, তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও হতে হবে শতাব্দীব্যাপী। এজন্য পাঁচ বছরের রাজনৈতিক পরিকল্পনা নয়, ২৫ বছরের জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। অবকাঠামোর বদলে অবকাঠামোভিত্তিক শিল্পায়ন জরুরি। বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি বাড়ানো। আবার শুধু সংযোগ না গড়ে তা থেকে মূল্য সংযোজনের বিষয়টিকেও প্রাধান্য দিতে হবে।
বিশ্ব আজ বাংলাদেশের দিকে নতুন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। প্রশ্ন হলো আমরা কি নিজেদেরও নতুনভাবে দেখতে প্রস্তুত? ইতিহাসের প্রতিটি বড় উত্থানের আগে একটি জাতি তার শক্তিকে চিনতে শিখেছিল। সিঙ্গাপুর তার ভূগোলকে বন্দরশক্তিতে রূপান্তর করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে জাতীয় শক্তিতে পরিণত করেছে। ভিয়েতনাম বৈশ্বিক উৎপাদনের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের হাতেও এমন চারটি শক্তি রয়েছে, যা খুব কম দেশের ভাগ্যে একসঙ্গে জোটে—ভূগোল, জনসংখ্যা, সমুদ্র ও সময়। এ চার শক্তিকেই আমাদের একত্র করে ব্যবহারের চেষ্টা করতে হবে। তবেই এ শতাব্দী হবে বাংলাদেশের।
কাজী মো. আবু সাইদ: ম্যানেজার, সলেন্ট মেরিটাইম অ্যান্ড রিসার্চ টেকনোলজি সেন্টার, ওয়ারসাশ মেরিটাইম স্কুল, যুক্তরাজ্য










