গত ১২ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন দেশের ১৪তম ও বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও হবে এ দিন। বর্তমান নাসির কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন একাধিকবার বলেছেন, ‘নির্বাচন সিস্টেমের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষের আস্থা ফিরিয়ে কেন্দ্রে নিয়ে আসা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে—এই বিশ্বাস স্থাপন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’ (১০ আগস্ট, ২০২৫, বণিক বার্তা)

তিনি আরো বলেন, ‘মানুষ তো ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার অভ্যাসটাই ভুলে গেছে। ভোটের দিন ছুটি থাকে, আমি ঘুমাই—কারণ আমি না গেলেও তো ভোটটা কেউ না কেউ দিয়ে দেবে—এই রকম একটা মনমানসিকতা ছিল। মানুষকে ভোট কেন্দ্রমুখী করা এবং সবাইকে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ (৯ আগস্ট, ২০২৫, টিবিএস রিপোর্ট)

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাস আসলে স্বাধীনতা সংগ্রাম, রাষ্ট্রগঠন, সামরিক শাসন, গণ-আন্দোলন এবং গণতন্ত্রের টালমাটাল যাত্রার এক সংকুচিত প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের ধারণা এসেছে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রশাসনিকভাবে দক্ষ সংস্থা গঠনের প্রয়োজন থেকে, যার কাজ হবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন। ১৯ শতকের শেষভাগে ও ২০ শতকের শুরুতে পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলোতে এ ধারণা বিকশিত হয়। অস্ট্রেলিয়া ছিল প্রথম দেশগুলোর একটি, যারা ১৯০২ সালে কমনওয়েলথ ইলেক্টোরাল অ্যাক্টের মাধ্যমে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করে।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে ১৯৫০ সালে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন গঠন হয়। এটি কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন পরিচালনা করে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও স্বাধীন ও দক্ষ কমিশন হিসেবে পরিচিত। ভারত ছাড়াও কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, ঘানা, ফিলিপাইনস ও ইন্দোনেশিয়াসহ বহু গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রে যদিও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন নেই, তবে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে নিজস্ব নির্বাচন বোর্ড রয়েছে। এসব কমিশনের অধীনে নির্বাচন পরিচালনা করা হয় বিকেন্দ্রীভূতভাবে। যুক্তরাজ্যে ২০০১ সালে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন হয়, যা পার্লামেন্টের অধীনে থেকে কাজ করে।

তেমনি বিশ্বের অনেক দেশে নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আস্থার সংকট রয়েছে। যেমন নাইজেরিয়া, কেনিয়া, শ্রীলংকা, পাকিস্তান—এ দেশগুলোতে কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, সহিংসতা ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে। বাংলাদেশের বাস্তবতা এ দেশগুলোর সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায়।

বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সর্বোপরি ব্রিটিশ ভারত ও অবিভক্ত পাকিস্তানের উত্তরসূরি। ব্রিটিশ ভারতে প্রথম নির্বাচনী ব্যবস্থার সূচনা হয় ১৯০৯ সালের মার্লে-মিন্টো সংস্কার আইনের মাধ্যমে, যেখানে প্রথমবারের মতো ভারতীয়দের সীমিত ভোটাধিকার চালু হয়। এরপর ১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরো সম্প্রসারিত করে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রথমবারের মতো উপমহাদেশে একটি কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ধারণা দেয়, যদিও তা পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না।

এরপর ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে নির্বাচন কমিশনের কথা বলা হয়, যার কাজ ছিল সাধারণ নির্বাচন আয়োজন। তবে বারবার সামরিক হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় সে কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেও কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা সরকার বরখাস্ত হয় মাত্র ৫৬ দিনের মাথায়। এরপর দীর্ঘদিনের সামরিক শাসন শেষে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেও ক্ষমতা হস্তান্তর পায়নি। এ গণরায় অস্বীকারই পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক পন্থায় সঠিক ও কার্যকর নির্বাচনের প্রতি এক ঐতিহাসিক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

সেদিক থেকে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা কেবল সমসাময়িক বাস্তবতা নয়—এটি ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়া এক রাজনৈতিক চেতনা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৭ জুলাই সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠন হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস, যিনি ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সিইসির দায়িত্ব পালন করেন। এই কমিশনের অধীনেই ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

সারা দেশে ৩০০টি সাধারণ আসনে একক সদস্যবিশিষ্ট আসনভিত্তিক ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থার ব্যবহারসহ সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ও সংসদীয় গণতন্ত্র—এ তিন স্তম্ভের ভিত্তিতে যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটে এই কমিশনের মাধ্যমে।

পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন ও একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন স্থগিত হয়। এটি দেশের গণতাত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার প্রথম বড় রাজনৈতিক পশ্চাৎপদতা। এরপর সামরিক শাসন ও নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্যে দায়িত্ব পালন করে তিনটি নির্বাচন কমিশন—নুরুল ইসলাম কমিশন, মাসুদ কমিশন, সুলতান কমিশন।

এরপর ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং ১৯৯১ সালে দেশের ইতিহাসে অন্যতম অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় রউফ কমিশনের অধীনে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এ নির্বাচনের মাধ্যমেই দীর্ঘ সামরিক শাসন পেরিয়ে ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারো সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে।

১৯৯৬ সালের ৯ এপ্রিল গঠিত হেনা কমিশনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো আমলাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এর পরের অষ্টম জাতীয় সংসদ অনুষ্ঠিত হয় বিচারপতি এমএ সায়ীদের নেতৃত্বাধীন সায়ীদ কমিশনের অধীনে।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত নির্বাচন কমিশন ধরা হয় আজিজ কমিশনকে। বিচারপতি এমএ আজিজের নেতৃত্বে ২০০৫ সালের ২২ মে গঠিত এই কমিশনের বিরুদ্ধে রয়েছে এক কোটি ভুয়া ভোটারের তালিকা তৈরির অভিযোগ। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি এ কমিশন নবম জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলেও পরবর্তীকালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ সে তফসিল বাতিল করেন।

দুই বছরের সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় শামসুল হুদা কমিশনের অধীনে। এ নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৭ শতাংশ।

সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকে সংসদ নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় আস্থাহীনতার জায়গা তৈরি হয়। রকিবুদ্দিন কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিরোধী দলগুলো বর্জন করে, এছাড়া এর বৈধতা নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন ওঠে।

এরপর ২০১৮ সালের একাদশ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যথাক্রমে নুরুল হুদা কমিশন ও আওয়াল কমিশনের অধীনে। প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন, ভোটার উপস্থিতি, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি, ভোটার ও পর্যবেক্ষকদের নিয়ে অনিয়ম, ইভিএম বিতর্ক, রাতের ভোট, ব্যালট স্টাফিং, ভয়ভীতিসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে এ দুই নির্বাচনের বিপরীতে।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেবল প্রশাসনিক নয়—এটি একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব। গত বছরের ৫ আগস্ট আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনগণের ভোটাধিকার, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, যার সার্বিক দায়িত্বে রয়েছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন।

সুস্মিতা হোসেন: প্রতিবেদক, বণিক বার্তা