দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছ রাজনীতির বিরুদ্ধে জনরোষ দানা বাঁধছে। অস্বাভাবিক বন্যা ও জনদুর্ভোগে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, যখন অভিযোগ ওঠে—বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের ৭০ শতাংশই দুর্নীতিতে আত্মসাৎ হয়েছে। এ ক্ষোভে এরই মধ্যে সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করেছেন, সিনেট নেতা পদচ্যুত হয়েছেন বেআইনি অনুদানের অভিযোগে। রাজনীতিক ও ঠিকাদারদের সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপন নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে তারা এখন ‘নেপো বেবি’ ট্যাগে চিহ্নিত হচ্ছেন। টিকটক, ফেসবুক ও এক্সে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফিলিপাইনজুড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া এ ক্ষোভ শুধু অনলাইনে নয়, অফলাইনেও ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন বিক্ষুব্ধরা। গোটা পৃথিবী যেন এক আন্দোলনের ময়দানে পরিণত হয়েছে কয়েক বছরে।
সীমানা পেরিয়ে
গত পাঁচ বছর বিশ্ব যেন এক অশান্ত রাস্তায় পরিণত হয়েছে—কণ্ঠস্বর উঠেছে, মুষ্টি উঁচু হয়েছে, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম দাবি জানিয়েছে যেন ক্ষমতাবানরা এবার সত্যিই শোনে। ঢাকা থেকে তেহরান, হাভানা থেকে মিনিয়াপোলিস—এমন সব প্রতিবাদ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে যা শাসনকর্তাদের কাঁপিয়ে দিয়েছে, নেতাদের পতন ঘটিয়েছে এবং লাখো মানুষের রাজনৈতিক চিন্তাশক্তিকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে।
এটি কোনো একক বিপ্লব ছিল না, বরং ছিল এক ‘বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধের ঢেউ’ যা এসেছে অর্থনৈতিক পতন, দুর্নীতি, স্বৈরাচারী দমন-পীড়ন এবং কর্তৃত্ববাদী আধিপত্যকে নীরবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানো তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের গল্প—সর্বোপরি, অপেক্ষা ও আক্ষেপ না করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
দক্ষিণ এশিয়া: শিক্ষার্থী, সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্ট্রিট পাওয়ার
বাংলাদেশ: ‘জুলাই বিপ্লব’ ও ক্ষমতার পালাবদল
দক্ষিণ এশিয়া পরিণত হয়েছিল তরুণদের বিদ্রোহের মঞ্চে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের হাত ধরে ‘জুলাই বিপ্লব’ শুরু হয়েছিল চাকরিতে কোটা বাতিল করে মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে। কিন্তু তা দ্রুত রূপ নেয় দুর্নীতি ও বংশানুক্রমিক রাজনীতির অবসানের জাতীয় আন্দোলনে। ফল ছিল অবিশ্বাস্য: এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশকে হস্তান্তর করেন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে।
নেপাল: সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধের চেষ্টায় জেনারেশন জেডের প্রতিরোধ
ঠিক এক বছর পর, ‘নেপাল’ তার নিজস্ব যুব নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহের সাক্ষী হলো। সরকার যখন সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল, তখন দুর্নীতি ও বেকারত্বের ফলে এরই মধ্যে ক্ষোভে ভরা প্রজন্ম গর্জে উঠেছে। জেন-জির হাতে ফোন, ঠোঁটে স্লোগান, কাঠমান্ডুর রাস্তাগুলোকে প্রতিরোধের ময়দানে পরিণত করেছিল, যার ফলে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
শ্রীলংকা: অর্থনৈতিক সংকটে ‘গোটা গো হোম’ আন্দোলন
অন্যদিকে শ্রীলংকায় সংকট ডিজিটাল নয়, বরং বাস্তব ছিল। ফাঁকা জ্বালানি পাম্প, অন্ধকার রাত, আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি। ২০২২ সালের মধ্যে রাজধানীতে শিবির স্থাপন করে বিক্ষোভকারীরা, স্লোগান তোলে—‘গোটা গো হোম’। শুধু স্লোগান নয়, আন্দোলনকারীরা বাড়ি ফিরেছিল বিজয়ীর বেশে। সেই গণ-আন্দোলনে রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন—এটি একটি বিরল মুহূর্ত যখন একটি গণ-আন্দোলন সরাসরি একজন শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: বৈষম্য, দুর্নীতি ও প্রজন্মের ক্ষোভ
ইন্দোনেশিয়া: জাকার্তার জাগরণ
চলতি বছর আগস্টে রাজধানী জাকার্তা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সূত্রপাত হয় সংসদ সদস্যদের মাসিক ৫০ মিলিয়ন ইন্দোনেশিয়ান রুপি (প্রায় ৩ হাজার ডলার) আবাসন ভাতা ঘোষণার জেরে। ন্যূনতম মজুরির তুলনায় এটি ১০-২০ গুণ বেশি। পাশাপাশি ছিল রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, আর্থিক অসমতার মতো বিষয়গুলোও। বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয় ২৮ আগস্ট, যখন পুলিশের গাড়ির ধাক্কায় ২১ বছর বয়সী ফুড ডেলিভারি কর্মী আফফান কুর্নিয়াওয়ান নিহত হন। জনরোষের ফলে সরকার ভাতা বাতিল, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
মধ্য এশিয়া: জ্বালানি, জালিয়াতি আর ক্ষোভ
কাজাখস্তান: জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে জাতীয় বিক্ষোভ
মধ্য এশিয়ায়ও গত কয়েক বছরে জেগে উঠেছে বিপ্লবী উদ্দীপনা। ২০২২ সালে কাজাখস্তানে জ্বালানির দামের হঠাৎ বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভে পরিণত হয়। সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ফলে আলমাতির মতো শহরগুলো পরিণত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। এ আন্দোলন উন্মোচন করে বৈষম্য ও দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে দাগ ফেলে।
কিরগিজস্তান: বিতর্কিত নির্বাচন ও জনতার আন্দোলন
এর দুই বছর আগে ২০২০ সালে কিরগিজস্তানও নড়ে ওঠে। বিতর্কিত সংসদীয় নির্বাচনের ফলে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, বিক্ষোভকারীরা বিশকেকে সরকারি ভবনে হামলা চালায়। কয়েক দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে এটি কিরগিজস্তানের তৃতীয় বিপ্লব, যা প্রমাণ করে যে কিরগিজস্তানের জনগণ চুরি করা ক্ষমতা মেনে নেবে না।
মধ্যপ্রাচ্য: প্রতিবাদের সাহস
ইরান: ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন
এই সময়ের সবচেয়ে যুগান্তকারী দৃশ্য এসেছিল ইরান থেকে। যেখানে ২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুর পর নারীরা তাদের চুল কেটে ফেলেন, হিজাব পোড়ান এবং স্লোগান দেন—‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’। এটি শুধু হিজাব আইন নয়—বরং দশকের পর দশক ধরে চলা দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধঘোষণা ছিল। যদিও শাসকগোষ্ঠী নৃশংস দমন চালায়, তবুও এ আন্দোলন ইরানের রাজনৈতিক সত্তায় অমোচনীয় দাগ কেটেছে, যা নারী-পুরুষ উভয়কেই একটি ভিন্ন ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
আফ্রিকা: অবরুদ্ধ গণতন্ত্র
মালি: সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন
২০২৫ সালে মালিতে নতুন করে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন শুরু হয় ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে, যখন তারা ক্ষমতায় থাকার সময়সীমা ২০৩০ পর্যন্ত বাড়াতে চেয়েছিল। যদিও ফলাফল অনিশ্চিত, তবু আন্দোলনটি প্রতিফলিত করে গোটা অঞ্চলে স্বৈরতন্ত্রের প্রতি নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতাকে।
সুদান: যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে শান্তি ও গণতন্ত্রের দাবি
অন্যদিকে সুদানে ২০২৩ সাল থেকে দুই জেনারেলের যুদ্ধের ফাঁদে বন্দি মানুষ—কিন্তু বোমা হামলা ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যেও বেসামরিক বিক্ষোভকারীরা শান্তি ও গণতন্ত্রের ডাক দিয়ে চলেছে।
আমেরিকা ও ইউরোপ: পুরনো ক্ষত, নতুন কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্র: বর্ণবাদের বিরুদ্ধে জর্জ ফ্লয়েড আন্দোলন
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সাল চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে। মিনিয়াপোলিসের এক রাস্তার কোণ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন রূপ নেয় দশকের সবচেয়ে বড় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে, সমুদ্র পেরিয়ে যা ছড়িয়ে পড়ে লন্ডন, প্যারিস থেকে লাগোস পর্যন্ত। কয়েক সপ্তাহ ধরে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ স্লোগানটি হয়ে ওঠে বিশ্বের স্পন্দন।
কিউবা: খাদ্য ও স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভ
এদিকে কিউবায় ২০২১ সালে খাদ্য, ওষুধ আর স্বাধীনতার সংকট ঘিরে দেশব্যাপী বিক্ষোভ দেখা দেয় যা মনে করিয়ে দেয়, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত সমাজগুলোও তাদের জনগণের অসন্তোষকে আটকে রাখতে পারে না।
বেলারুশ: নির্বাচন কারচুপি ও নারীদের প্রতিবাদ
আর বেলারুশে ২০২০ সালে কারচুপির নির্বাচনের পর আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে জনতা। বিদ্রোহ দমন করা হলেও মিনস্কে নারীদের হাত ধরাধরি করে দাঁড়ানোর দৃশ্য আজও নিঃশব্দ বীরত্বের প্রতীক।
ফ্রান্স: ‘ব্লোকঁ তু’ আন্দোলন
চলতি সেপ্টেম্বরে ‘ব্লোকঁ তু’ (সবকিছু বন্ধ) আন্দোলনের দিনে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহর উত্তাল হয়। রাস্তায় ব্যারিকেড, আগুন এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে; প্রায় ৩০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। আন্দোলন মূলত বাজেট সংকোচন নীতি এবং সামাজিক সেবার বৈষম্যের বিরুদ্ধে। নতুন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে ৮০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি তরুণ সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তুষ্টির প্রকাশ। আন্দোলন চলতে থাকায় জরুরি ক্ষেত্র ছাড়া সাধারণ মানুষকে রাস্তায় না বের হওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
বৈশ্বিক বিদ্রোহের ধারা
খণ্ডে খণ্ডে দেখা যায় একই চিত্র: তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যম কোটি মানুষকে একত্র করেছে, আর দুর্নীতি, বৈষম্য ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে। সরকারগুলোও পরিচিত অস্ত্র—সেন্সরশিপ, কারফিউ আর দমননীতি ব্যবহার করেছে। তবু বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে শাসকদের পতন ঘটেছে।
এসব আন্দোলন সমন্বিত ছিল না। তেমন প্রয়োজনও ছিল না। এগুলো এক গভীর সূত্রে বাধা ছিল: এমন এক যৌথ অস্বীকৃতি যে ভবিষ্যৎ কেবল ক’জনের হাতে বন্দি থাকতে পারে না, যখন অধিকাংশ মানুষ কণ্ঠহীন হয়ে থাকে।
এ বিদ্রোহগুলো সমন্বিত ছিল না। তাদের হওয়ার দরকার ছিল না। তারা আরো গভীর কিছুর দ্বারা সংযুক্ত ছিল: যা এ কথা মেনে নিতে এক যৌথ অস্বীকৃতি যে ভবিষ্যৎ অল্প কিছু মানুষের, আর বাকিরা শব্দহীন।
আগামী দিনের প্রতিধ্বনি
ইতিহাস হয়তো একদিন ২০২০-২৫ সময়কালকে স্মরণ করবে ‘বিদ্রোহের যুগ’ হিসেবে। মাত্র পাঁচ বছরে শিক্ষার্থীরা নেতাদের পতন ঘটিয়েছে, নারীরা স্বাধীনতার ভাষা নতুনভাবে লিখেছে, আর সাধারণ মানুষ বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে গণতন্ত্র দেয়া হয় না—তা অর্জন করতে হয়, রক্ষা করতে হয়, বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
কিছু বিপ্লব দমন-পীড়নে শেষ হয়েছিল। আর কিছু পুরো রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টে দিয়েছে। কিন্তু একসঙ্গে তারা প্রমাণ করেছে এক চিরন্তন সত্য: যখন অবিচার অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন মানুষ জেগে ওঠে। আর তারা যখন ওঠে, তখন বিশ্ব তাকিয়ে থাকে।





