ঢাকায়
আছি ১৫
বছরেরও বেশি
সময়, কিন্তু
শহরটা ঠিক
আপন হয়ে
উঠল না।
প্রয়োজনের এ
শহরে মনে
হয় শুধু
পেটের ক্ষুধা
মেটানোই সম্ভব
হবে, মনের
প্রয়োজনটা মিটবে
না। খোলা
আকাশ, নির্মল
বাতাস, নীরবতা
আর স্বাস্থ্যকর
খাবার যেখানে
প্রায় দুষ্প্রাপ্য
হয়ে উঠছে,
সেখানে সন্তানের
জন্য খেলার
মাঠের ইচ্ছাটাও
বিলাসিতাই মনে
হবে। সেজন্যই
হয়তো কাজের
মধ্যে ডুবে
থাকার এ
শহরে মানসিক
শান্তির খোঁজ
মেলে না।
সাড়ে তিন
বছর ধরে
সন্তানকে বড়
করতে গিয়ে
তাই বেশির
ভাগ সময়ই
মনে হয়
শহরটা ছেড়ে
যেতে পারলে
ভালো হতো।
ভালো হতো
জীবনযুদ্ধে সন্তানকে
নামানোর আগ
পর্যন্ত একটু
স্বস্তিতে, নির্মল
বাতাসে নিশ্বাস
নেয়ার সুযোগ
নিতে দিতে
পারলে। কিন্তু
পালিয়ে যাওয়াই
কি সমাধান?
শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ
আর ভেজাল
খাবারের এ
শহরে আরো
একটি সংকটের
নাম শিশুর
খেলার মাঠ।
পশ্চিম রামপুরার
মহানগর প্রজেক্টে
আমাদের বসবাস।
আবাসিক এ
এলাকাটি খুব
সম্প্রতি পরিকল্পনা
করে গড়ে
তোলা হলেও
পুরো এলাকায়
নেই কোনো
খেলার মাঠ।
সন্তানের সাইকেল
চালানোর জন্য
তাই বাড়ির
সামনের গলির
রাস্তাটাই একমাত্র
অবলম্বন। কিন্তু
দিনে-রাতে
সেখানে এত
বেশি ব্যক্তিগত
গাড়ি, রিকশা
আর মোটরসাইকেলের
চাপ থাকে
যে নিশ্চিন্তে
একটি সাড়ে
তিন বছরের
ছেলের হাত
ছেড়ে দেয়া
যায় না।
শুধু মহানগর
প্রজেক্টের ভেতরেই
নয়। এর
বাইরেও শিশুদের
তেমন কোনো
খেলার জায়গা
খুঁজে পেতে
হয়রান হতে
হয়। হাতিরঝিলের
মতো দৃষ্টিনন্দন
জায়গা থাকলেও
সেখানে গাড়ির
চাপ থাকায়
সন্তানকে নিয়ে
যাওয়া কঠিন।
আবার যাওয়া
গেলেও সেখানে
সন্তানকে খেলাধুলার
সুযোগ দেয়া
যায় না।
ফলে একটু
সবুজের ছোঁয়া
দিতে চাইলে
সেই সোহরাওয়ার্দী
উদ্যানই ভরসা।
যেখানে যাতায়াত
বেশ সময়সাপেক্ষ
হওয়ায় তাই
ছুটির দিনে
ছাড়া সেখানে
নিয়ে যাওয়াও
কঠিন হয়ে
পড়ে।
আর বেশি
দিন বাকি
নেই। এসে
পড়বে সন্তানকে
স্কুলে দেয়ার
মৌসুম। সেখানেও
আমার মতো
বাবা-মায়েদের
চাওয়া থাকবে
দুটি বিষয়।
যেন সন্তানকে
মানসিক কোনো
চাপ না
দিয়ে খেলার
ছলে পড়ানো
হয় আর
যেন স্কুল
প্রাঙ্গণে এক
টুকরো মাঠ
থাকে। তাহলে
অন্তত স্কুল
শেষে কিছুটা
সময় বন্ধুদের
সঙ্গে ছোটাছুটি
করার সুযোগ
পাবে সন্তান।
কিন্তু বাসার
আশপাশের স্কুলগুলোর
বেশির ভাগই
হচ্ছে কোনো
একটি ভবনের
একতলা বা
দোতলায়। আর
যেখানে মাঠ
আছে বা
যেখানে চাপ
দিয়ে পড়ানো
হবে না,
তা বর্তমানের
বাসা থেকে
বেশ দূরে।
যানজটের এই
শহরে দূরের
কোনো স্কুলে
সন্তানকে পড়তে
দেয়ার মানে,
একসঙ্গে কয়েকজনকে
চাপে ফেলা।
সেক্ষেত্রে অনেকেই
সমাধান দেবেন
বাসা বদলের।
কর্মক্ষেত্র আর
যাতায়াত মিলে
তার প্রভাবও
কি কম
পড়বে? ফলে
সন্তানকে মুক্ত
শৈশব দেয়ার
ইচ্ছাটা অপূর্ণই
থেকে যাবে
কিনা কপালে
সে দুশ্চিন্তার
ভাঁজ ক্রমাগতই
বাড়তে থাকে।
উনিশ শতকে
উন্নয়ন মনস্তত্ত্ববিদ
ফ্রেডরিক ফ্রোবেল
শিশুদের মনঃসামাজিক
বিকাশ ও
সুস্বাস্থ্যের জন্য
‘খেলার
মাঠের’ গুরুত্ব
তুলে ধরেন।
২০২২ সালের
১১ মে
জাতীয় ক্রীড়া
পুরস্কার বিতরণ
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনাও
তার বক্তব্যে
শিশুদের মানসিক
ও শারীরিক
বিকাশের জন্য
প্রতিটি এলাকায়
খেলার মাঠের
প্রয়োজনীয়তা তুলে
ধরেন। প্রধানমন্ত্রী
উল্লেখ করেন,
সরকার যেখানেই
খালি জায়গা
পাচ্ছে সেখানেই
খেলার মাঠ
করে দিচ্ছে।
খেলার মাঠ
ও উন্মুক্ত
স্থান সুরক্ষায়
দেশে আইনও
আছে। আইনটির
নাম ‘মহানগরী,
বিভাগীয় শহর
ও জেলা
শহরের পৌর
এলাকাসহ দেশের
সব পৌর
এলাকার খেলার
মাঠ, উন্মুক্ত
স্থান, উদ্যান
এবং প্রাকৃতিক
জলাধার সংরক্ষণ
আইন ২০০০’। আইনটিতে
বলা হয়েছে,
‘খেলার
মাঠ, উন্মুক্ত
স্থান, উদ্যান
এবং প্রাকৃতিক
জলাধার হিসেবে
চিহ্নিত জায়গার
শ্রেণী পরিবর্তন
করা যাইবে
না বা
উক্তরূপ জায়গা
অন্য কোনোভাবে
ব্যবহার করা
যাইবে না
বা অনুরূপ
ব্যবহারের জন্য
ভাড়া, ইজারা
বা অন্য
কোনোভাবে হস্তান্তর
করা যাইবে
না।’ কিন্তু
এর পরও
কি কোনো
পরিবর্তন দেখা
গেছে। নির্বিচারে
দখল করা
হচ্ছে মাঠ,
একটু খোলা
জায়গাও ফাঁকা
নেই দাঁড়ানোর
মতো।
ডয়েচে ভেলে
পত্রিকায় প্রকাশিত
খবরের তথ্য
বলছে, ঢাকার
দুই সিটি
করপোরেশনের ১২৯টি
ওয়ার্ডের মধ্যে
৪১টিতে কোনো
খেলার মাঠ
নেই। আধুনিক
শহরে প্রতি
আধা বর্গকিলোমিটার
এলাকার জন্য
একটি করে
খেলার মাঠ
দরকার। সে
অনুযায়ী ঢাকায়
মাঠ থাকার
কথা অন্তত
৬১০টি। আর
জনসংখ্যার হিসাবে
ঢাকায় মাঠ
দরকার ১
হাজার ৪৬৬টি।
কিন্তু সব
মিলিয়ে ঢাকায়
মাঠ আছে
সাকল্যে ২৫৬টি,
যা আবার
সবার জন্য
উন্মুক্ত নয়।
শিশুদের শারীরিক
ও মানসিক
বিকাশের অন্যতম
মাধ্যম খেলাধুলা।
এ কারণে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবিচ্ছেদ্য
অংশের মতোই
থাকে খেলার
মাঠ। খেলাধুলা
ছাড়াও সমাবেশ
আয়োজন ও
শ্রেণীকক্ষের বাইরে
পাঠদানের জন্য
প্রয়োজন হয়
একটি সুন্দর
মাঠের। বণিক বার্তায় গত
২ ডিসেম্বর
প্রকাশিত এক
রিপোর্টের তথ্য
বলছে, দেশে
সরকারি ব্যবস্থাপনায়
পরিচালিত সাড়ে
১০ হাজারের
বেশি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে কোনো
খেলার মাঠ
নেই।
দেশের প্রাথমিক
শিক্ষার নানা
দিক নিয়ে
প্রতি বছর
‘অ্যানুয়াল
প্রাইমারি স্কুল
সেন্সাস’ শীর্ষক
একটি প্রতিবেদন
প্রকাশ করে
প্রাথমিক শিক্ষা
অধিদপ্তর। সেখানে
শিক্ষক-শিক্ষার্থী
সংখ্যা, শ্রেণীকক্ষ,
স্যানিটেশন, খেলার
মাঠসহ বিভিন্ন
সেবা ও
সুযোগ-সুবিধার
তথ্য তুলে
ধরা হয়।
২০২১ শিক্ষাবর্ষের
তথ্যের ভিত্তিতে
প্রণীত অধিদপ্তরের
সর্বশেষ প্রতিবেদন
অনুযায়ী, বর্তমানে
দেশে সরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়
রয়েছে ৬৫
হাজার ৫৬৬টি।
এর মধ্যে
খেলার মাঠ
রয়েছে ৫৪
হাজার ৮২৬টিতে।
সে হিসাবে
দেশের ১০
হাজার ৭৪০টি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
খেলার মাঠ
নেই।
শিক্ষাবিদরাও বলছেন, খেলার মাঠ ছাড়া একটি বিদ্যালয় কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। কিন্তু এভাবে মাঠ ছাড়া আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী ও স্কুলপড়ুয়া শিশুরা মানসিকভাবে কতটা পরিণত হয়ে গড়ে উঠবে, সেটা ভাবনার বিষয়। তাদের শারীরিক ও মানসিক গঠনটা কেমন হবে তার ওপরই তো নির্ভর করবে আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ। তাই এদিকে ভালোভাবে দৃষ্টি দেয়া খুবই জরুরি।
শর্মিলা সিনড্রেলা: সাংবাদিক










