মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের বড় অংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত থাকছেন। বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা, সেবার অসম বণ্টন, চিকিৎসার ব্যয় এবং সামাজিক কুসংস্কার এ সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে। নারী, শিশু, প্রবীণ কিংবা নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত— সর্বস্তরের মানুষই নানাবিধ মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। বিভিন্ন স্তরের, বর্ণের ও লিঙ্গের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা জরুরি এবং শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মানসিক স্বাস্থ্যকেও অগ্রাধিকারে নিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যকে অবজ্ঞা করে দক্ষ ও সবল জনসম্পদ তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে তাই কেবল সচেতনতার বার্তা প্রচার নয়, বরং বিদ্যমান সেবা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টিই গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
প্রতিবছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘অর্জিত অভিজ্ঞতা শোনা: প্রকৃত কণ্ঠস্বর, প্রকৃত পরিবর্তন’। অর্থাৎ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা লড়ছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিপাদ্যটি মনে করিয়ে দেয়, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৯ সালের জরিপে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ৭-১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিল। জরিপে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো ধরনের চিকিৎসা বা সেবা পায়নি। তথ্যগুলো কয়েক বছর আগের। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবজ্ঞার চিত্র এখানে ফুটে ওঠে যে ওই জরিপের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও আর কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় অসংখ্য শিশু-কিশোর হত্যার শিকার হয়, অঙ্গহানি হয়। এর শারীরিক ও মানসিক ট্রমার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে উল্লেখযোগ্য তরুণদের মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে হামলা, নির্যাতন ও গ্রেফতার শিক্ষার্থীদের মনের ওপর চাপ তৈরি করেছে। শিশুরা সরাসরি ঘটনাস্থলে থেকে সহিংসতা দেখেছে, কারো কাছ থেকে ভীতিকর অভিজ্ঞতা শুনেছে, গণমাধ্যম থেকে খবর জেনে সেসব চিত্র কল্পনা করেছে, গুরুতর আঘাত ও মৃত্যুর কথা ভেবেছে। ফলে তাদের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক, দুঃখবোধ, অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা, চমকে ওঠা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, অসহায়ত্ববোধ করার মতো আচরণিক প্রকাশ দেখা গেছে। তাদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে ওঠার জন্য লক্ষণীয় কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এর নানা প্রভাব এরই মধ্যে আমরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজে দেখতে পাচ্ছি।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা দক্ষ জনবলের স্বল্পতা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রায় ৩৮০ এবং মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যা প্রায় ৬০০। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি লাখে মধ্যম মানের ১ দশমিক ৫ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন; উচ্চ আয়ের দেশগুলোয় এ হার সাতজন, আর নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় মাত্র শূন্য দশমিক একজন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আমাদের যে অগ্রাধিকার নেই তার চিত্র ফুটে উঠেছে মনোরোগ ও মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যায়, সর্বসাকল্যে যা এক হাজারের নিচে। জনসংখ্যার তুলনায় এ সক্ষমতা কতটা সীমিত, তা সহজেই অনুমেয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অন্য একটি জরিপে বলা হয়, তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। তাদের মধ্যে ৯২ শতাংশের বেশি চিকিৎসা পায় না। তার ওপর বিশেষায়িত সেবা বড় শহর ও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত থাকায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ের মানুষের জন্য চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেবা নিতে দূরে যাতায়াত, চিকিৎসার ব্যয় এবং নিয়মিত পরামর্শ গ্রহণের অসুবিধাও অনেকের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কেবল বিশেষায়িত হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন সেবার বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কার্যকর সংযোগ।
একই সঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, কাউন্সেলর, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষিত নার্স ও অন্যান্য কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। শুধু জনবল তৈরি নয়, তাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেবা দেয়ার উপযোগী পরিবেশও নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ এবং সেবার মান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর পরামর্শসেবা দূরবর্তী এলাকার মানুষের জন্য সহায়ক হতে পারে। চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। মানসিক সমস্যাকে ব্যক্তির দুর্বলতা, অক্ষমতা কিংবা চরিত্রের ত্রুটি হিসেবে দেখার প্রবণতা আক্রান্ত ব্যক্তিকে আরো বিচ্ছিন্ন করে। পরিবার ও সমাজের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় অনেকে নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করেন না; প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা নিতেও দেরি করেন। এক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের ভূমিকা রয়েছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়ক পরিবেশ, প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং এবং হয়রানি প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও চাকরির অনিশ্চয়তা মোকাবেলায় দায়িত্বশীল নীতি গ্রহণ করা দরকার।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল তাৎপর্যও মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়ার মধ্যে নিহিত। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা কোথায় সেবার বাধার মুখে পড়ছেন, কেন চিকিৎসা নিতে পারছেন না এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন—এসব বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে কাজে লাগানো উচিত। এজন্য নিয়মিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ পরিচালনাও জরুরি। হালনাগাদ তথ্য ছাড়া সমস্যার ব্যাপ্তি, কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কোথায় সেবার ঘাটতি বেশি এবং সরকারি বিনিয়োগ কতটা কার্যকর হচ্ছে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। জরিপের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার হার, সেবার মান, জনবল ও অবকাঠামোর আঞ্চলিক বণ্টন এবং চিকিৎসার ফলাফল পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত তথ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে নীতি প্রণয়ন ও বাজেট বরাদ্দে অগ্রাধিকার নির্ধারণ সহজ হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের জন্য তাই বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যকে যুক্ত করা, দক্ষ জনবল বাড়ানো, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ, সরকারি চিকিৎসার সুযোগ ও অর্থায়ন বৃদ্ধি, সামাজিক কুসংস্কার দূর করা এবং নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে গৃহীত উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও ফলাফল নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।









