জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের জমিতে ও ভূর্গভস্থ পানিতে লবণের মাত্রাও বাড়ছে। তুলনামূলক নিম্নভূমির দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এসব প্রভাব এরই মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। এতে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ মানসিক চাপ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক ব্যাধিতে ভুগছেন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। তবে সাধারণভাবে যেকোনো দুর্যোগে শিশু, নারী ও বয়োজ্যেষ্ঠরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। উপকূলীয় নারীদের ক্ষেত্রেও এমনটিই দেখা যাচ্ছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের ৪ হাজার ৬৯৩ নারীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় ৭৫ শতাংশের বেশি নারী মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার মানসিক চাপে রয়েছেন বলে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হয়েছে। ‘উপকূলীয় বাংলাদেশের প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের মধ্যে পানীয় জলের লবণাক্ততা ও মানসিক-সামাজিক চাপের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্মিলিত সম্পর্ক: জনসংখ্যাভিত্তিক একটি ক্রস সেকশনাল গবেষণা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, গবেষণায় খাবার পানিতে উচ্চমাত্রার সোডিয়াম ও তীব্র মানসিক চাপ একসঙ্গে থাকলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

এর আগে গত আগস্টেও উপকূলীয় অঞ্চলের পানিতে অতিরিক্ত লবণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন একটি যৌথ গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করেছিল। তাতে উল্লেখ করা হয়, গবেষণায় অংশ নেয়া ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যে ২১ দশমিক ৬ শতাংশে আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (সিভিডি) বা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ এ জনগোষ্ঠীর প্রতি পাঁচজনে প্রায় একজন এমন ঝুঁকিতে রয়েছেন।

এর বাইরেও রয়েছে অন্যান্য প্রভাব। যেমন ভিন্ন এক গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ততার প্রভাব নারীদের প্রজনন ক্ষমতায়ও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এছাড়া নিরাপদ পানির সন্ধানে কক্সবাজার, খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলে বসবাসকারী নারীদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়, যা তাদের কায়িকশ্রম বাড়িয়েছে।

এসব তথ্য এটিই স্পষ্ট করছে যে উপকূলীয় অঞ্চলের সংকট কেবল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নেই। এ ‘ধীরগতির জলবায়ু পরিবর্তন’ উপকূলের জনগণের স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন—সব ক্ষেত্রেই প্রভাবক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ অঞ্চলের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুতরাং বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে দিতে গেলে উদ্যোগও বহুমুখী হওয়া চাই। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো যত দ্রুত সম্ভব ‘সুপেয় পানির সংকটের’ মতো একটি সংকটকে স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠা।

উপকূলে নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে সাধারণত ব্যবহার হতে পারে মিঠা পানির পুকুর, সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি, গভীর নলকূপ, পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানি, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) এবং রিভার্স ওসমোসিস (আরও) প্লান্ট ইত্যাদি। কিন্তু এর কোনোটাই যে বর্তমানে উপকূলে প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর নয় সেটি গবেষণার তথ্যগুলো থেকে অনুমান করা যাচ্ছে। তাছাড়া উপকূলে লবণাক্ত পানির প্রবেশ বৃদ্ধির কারণে পুকুর, ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক নলকূপে এখন আর পানি ওঠে না। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বা ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে সরবরাহ করা হলেও সেই পানি সবসময় নিরাপদ ও মানসম্মত হয় না। ফলে নিরাপদ পানির সংকটের সমাধান না হয়ে বরং তা তীব্র হচ্ছে। এক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারত। কিন্তু সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার কারণে সেটিও কাজে লাগছে না, বরং দেশের অনেক অঞ্চলে বিগত সময়ে সংরক্ষিত পানি ডেঙ্গু মশার প্রজননস্থল হতে দেখা গেছে। সুতরাং সামগ্রিকভাবে উপকূলের সুপেয় পানির সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন এবং সে মোতাবেক সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নে যেতে হবে। নয়তো বিপন্ন জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতির আরো অবনমন ঘটবে।

পাশাপাশি যারা এরই মধ্যে শারীরিক ও মানসিকভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে উপকূলীয় অঞ্চলে বিদ্যমান প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তকরণ ও নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রেফারাল ব্যবস্থার সংযোগ করা যেতে পারে। নারীদের জন্য প্রজনন স্বাস্থ্য ভালো রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থাও অপরিহার্য। স্বাস্থ্যকর্মীদেরও জলবায়ু-সম্পর্কিত মানসিক চাপ ও উচ্চ রক্তচাপের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন।

এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমন ও অভিযোজন পরিকল্পনায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে বিশেষ বিবেচনায় রাখা। তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, জীবিকা ও মানসিক সুস্থতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আর এগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সুপেয় পানির সংকট দূর করার কোনো বিকল্প নেই। যে পানি জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজন, সেটি উপকূলের মানুষের রোগের উৎস না হোক এটাই প্রত্যাশা।