দুই দশক আগে দেশকে ডিজিটালাইজেশনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তা আরো বেগবান হয়েছে। দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ডিজিটাল কেন্দ্র, গড়ে তোলা হয়েছে অনলাইন পরিকাঠামো। বেড়েছে মানুষের অনলাইন পরিভ্রমণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার। করোনাকালে মিলেছে এর ইতিবাচক সুফল। অতিমারীতে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখেও স্বাভাবিক জীবনযাপনে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে প্রযুক্তি, ইন্টারনেট। তবে একই সঙ্গে একটা উদ্বেগের দিক হলো, ইন্টারনেটনির্ভর ভার্চুয়াল জগতের প্রভাবে জনজীবন প্রভাবিত হওয়ার পরিমাণও বেড়েছে ঢের। বেড়েছে সাইবার অপরাধ, হামলা। মানুষ যত বেশি সময় কাটাচ্ছে, ততই অপরাধীরাও তাদের নিশানা করতে বেছে নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগেক।
সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে সাইবার অপরাধ বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ, ২০১৯ সালে যা ছিল ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। বয়সভিত্তিক সাইবার অপরাধের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের অপরাধে অভিযুক্তদের বেশির ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছর। আক্রান্তদের বড় অংশও কম বয়সী। কাজেই সাইবার পরিসরে তরুণ প্রজন্ম কতটা নিরাপত্তাহীন, তা তথ্যেই স্পষ্ট। কেবল তরুণরাই নন, সাইবার পরিসরে বয়োজ্যেষ্ঠরাও নিরাপদ নন। নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা দিন দিন হুমকিতে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি হচ্ছে ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সাধারণ মানুষ তো বটেই, ফিশিংয়ের মাধ্যমে হ্যাক করা ওইসব তথ্য ব্যবহার করে নানা প্রতারণার জালে, মানহানিকর পরিস্থিতিতে ফেলা হচ্ছে এমনকি সমাজ-রাষ্ট্রের গণ্যমান্যদেরও।
আজকের সাইবার যুগে তথ্য চুরির অভিযোগ অবশ্য উঠেছে বিশ্বজুড়েই। সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত দেশগুলোয় অন্যান্য অপরাধ কমে গেলেও সাইবার অপরাধের হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গেল ডিসেম্বরে নেদারল্যান্ডসের ভিপিএন সংস্থা সার্ফশার্ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইবার হামলা চালিয়ে তথ্য চুরির তালিকায় ২০২১ সালে শীর্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়েছে ২১ কোটিরও বেশি নাগরিকের। যুক্তরাজ্যেও সাইবার অপরাধ, ইন্টারনেটে প্রতারণার হার ঊর্ধ্বমুখী। দেশটির ব্যাংকগুলোর ট্রেড সংস্থা ইউকে ফাইন্যান্সের তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে কর সংগ্রহকারীর নাম উল্লেখপূর্বক ফোন করে প্রতারণার হার যুক্তরাজ্যে কয়েক গুণ বেড়েছে। অন্য দেশেও এ ধরনের প্রতারণা ও অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার হামলা বা অপরাধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে র্যানসমওয়্যার। এটি মূলত এক ধরনের হ্যাকিং আক্রমণ। এতে ভুক্তভোগীর কম্পিউটারে ফাইল আটকে দেয়া হয় এবং এর বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়। আগে এ ধরনের আক্রমণ ছিল বড় ধরনের নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে। কিন্তু এখন র্যানসমওয়্যার স্প্যাম ই-মেইলের মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীর কম্পিউটারেও চলে আসছে। হ্যাকাররা সাধারণ ব্যবহারকারীর পাশাপাশি এখন বড় বড় প্রতিষ্ঠানেও হামলা চালিয়ে বিপদে ফেলছে, দাবি করা হচ্ছে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ। এক্ষেত্রে ক্ষতিকর সফটওয়্যার নির্দিষ্ট কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশ করানো হচ্ছে। ফাইল আটকে দেয়া বা লক করার আগে তা কপি করে রাখছে হ্যাকাররা। এরপর ওই ফাইল খোলার জন্য অর্থ দাবি করা হচ্ছে। এতে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বাদ যাচ্ছে না পুলিশের মতো নিরাপত্তা বাহিনীও। গত বছর ওয়াশিংটন ডিসির পুলিশ হ্যাকারদের হামলার শিকার হয়েছিল। হ্যাকাররা তাদের স্পর্শকাতর তথ্য সন্ত্রাসীদের কাছে শেয়ার করার হুমকি দিয়েছিল। করোনা অতিমারীর সময় হাসপাতালগুলোতেও সাইবার দুর্বৃত্তরা হামলা চালাচ্ছে বলে খবর মিলছে। হাসপাতালে র্যানসমওয়্যার আক্রমণের হার বেড়েছে বহুগুণ, এক পরিসংখ্যানে তা প্রায় ২০০ শতাংশের বেশি বলে উঠে এসেছে। এ ধরনের আক্রমণে ফ্রান্স জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে চিকিত্সা দেরিতে শুরু হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আর এ ধরনের ঘটনা-হামলায় মুক্তিপণের অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে। চেইন্যালাইসিসের একটি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, র্যানসমওয়্যারসহ অবৈধ কার্যক্রমে যুক্ত ক্রিপ্টোর লেনদেন এক বছর আগের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে। এর মাধ্যমে সাইবার অপরাধ কিংবা হামলার ব্যাপকতা সহজেই অনুমেয়।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ইকোসিস্টেমে সাইবার অপরাধকে বড় ধরনের অপরাধ বিবেচনা করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এ ধরনের অপরাধকে মনে করা হচ্ছে অন্যতম প্রধান হুমকি হিসেবে। এটি প্রতিরোধে দেশে দেশে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। অনেক দেশে এরই মধ্যে এ ধরনের আইন তৈরি করা হয়েছে। বাকিরাও এ প্রক্রিয়ায় রয়েছে। শুধু আইন প্রণয়ন করে ক্ষান্তি নয়, সেটি যথাযথভাবে প্রয়োগ করে দুর্বৃত্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধী প্রযুক্তি উদ্ভাবন কীভাবে আরো বেগবান করা যায়, সেগুলো কীভাবে সাইবার নিরাপত্তায় কাজে লাগানো যায়, সেদিকে মনোযোগ দিয়েছে উন্নত দেশগুলো। এরই মধ্যে কিছু প্রতিরোধী প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়েছে, সেগুলো যথাসম্ভব সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে ওইসব দেশে। একই সঙ্গে অনেক দেশে নিরাপত্তা বাহিনীকে সাইবার সুরক্ষায় সুপ্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। কিংবা সংশ্লিষ্ট বাহিনীতে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের জন্য বিশেষ দল গঠন করা হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় দেয়া হচ্ছে বাড়তি নজর। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সাইবার অপরাধ ঠেকাতে একটি বিশেষ দলকে নিয়োগ দিয়েছে। এছাড়া ‘ফাইভ আইজ’ নামের একটি জোট গঠন করেছে কয়েকটি দেশকে নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও এ জোটে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড। তারা সাইবার অপরাধ ঠেকাতে পারস্পরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করছে। প্রতিবেশী ভারতও এক্ষেত্রে খুব একটা পিছিয়ে নেই। প্রতিটি রাজ্যে সাইবার সেল এবং সাইবার ফরেনসিক ল্যাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে দেশটিতে। নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সাইবার সুরক্ষার জন্য বিস্তৃত প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা হচ্ছে, প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। আগে-পরে আমাদেরও সেদিকেই যেতে হবে বৈকি।
বর্তমানে আমরা একটা আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বাস করছি। ইন্টারনেটের বদৌলতে আমরা মুহূর্তে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ করতে পারছি। এ প্রেক্ষাপটে সামনের দিনে আমাদের ইন্টারনেটনির্ভরতা আরো বাড়বে। এটা মাথায় রেখে এর সুষ্ঠু ব্যবহার যেমন আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি এর অপব্যবহার ও এ-সংক্রান্ত অপরাধ রোধেও আরো সুসজ্জিত হতে হবে। অস্থায়ী কোনো চিন্তা বা পদক্ষেপ নয়, দীর্ঘমেয়াদি কিছু ভাবনা-চিন্তা ও পরিকল্পনা এক্ষেত্রে এখন প্রয়োজন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যদের ভাষ্য, সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের হার হতাশাজনক। সাধারণ মানুষ সাইবার হামলার শিকার হলে খুব কম ক্ষেত্রেই পুলিশের কাছে আসছে। এর পেছনে সচেতনতার অভাবই মূলত দায়ী। কাজেই এ ধরনের অপরাধের প্রতিকার নিশ্চিতে সাইবার সচেতনতার পাশাপাশি সাইবার সাক্ষরতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো অধ্যায় মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করা যায় কিনা তা ভেবে দেখতে পারে সরকার। তৃণমূল পর্যায় থেকে অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়গুলো নিয়েও সচেতনতা বাড়িয়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রচুর প্রচারণামূলক কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
করোনাকালে তো বটেই, তার আগেও আমরা বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তাব্যূহ ভেঙে জালিয়াতির অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি। ভবিষ্যতে এ নিরাপত্তা ঘাটতি আরো বাড়বে বলে শঙ্কা করছি। তার জন্য সাবধান হওয়ার এখনই সময়। নিয়মিত তথ্য বা ইনফরমেশন সিকিউরিটি রিভিউ করা, ইনফরমেশন সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, ইনফরমেশন সিকিউরিটি নিশ্চিতে ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট ও পেনিট্রেশন টেস্ট, ই-মেইল ব্যবহারে আরো সতর্ক হওয়া, নিয়মিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর-স্থাপনাগুলোর প্রযুক্তি নিরাপত্তা নজরদারি এবং প্রযুক্তি নিরীক্ষা আমাদের এক্ষেত্রে সাইবার হামলা-অপরাধ ঠেকাতে অনেক বড় রক্ষাকবচ হতে পারে।
শুধু তা-ই নয়, ফাইভ আইজের মতো আঞ্চলিক জোট গঠনের বিষয়টিও ভাবা যেতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে একটা আঞ্চলিক জোট গঠন এক্ষেত্রে ভীষণ ফলপ্রসূ হবে। এতে পারস্পরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করতে যেমন সহজ হবে, অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনাটাও অনেকটা আয়াসসাধ্য হবে।
দেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। দুঃখজনকভাবে প্রযুক্তি নিরাপত্তায় বিনিয়োগের ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক ধরনের অনীহা কাজ করে। যেভাবে হামলা বাড়ছে, তাতে এক্ষেত্রে আরো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে সুসজ্জিত হতে হবে। একই সঙ্গে দেশে একটি সময়োপযোগী সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জীবনধারার পরিবর্তনের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইয়ে সাইবার নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটি কেবল আইন প্রয়োগ কিংবা কঠোর পদক্ষেপে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তার জন্য সর্বোপরি দেশে একটা সুস্থ সাইবার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এটি করতে সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এজন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীজনসহ সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আরো একটি বছর বিদাল নিল, এল নতুন এক বছর। এ বছরটা হোক আমাদের সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে সুসজ্জিত হওয়ার বছর।
হুমায়ুন কবির: সাংবাদিক










