বিশ্বজুড়ে প্রত্যেক দেশের মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও অক্ষরজ্ঞান ছড়িয়ে দেয়া এবং নিরক্ষরতা দূর করার অঙ্গীকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যক্ত করতে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করা হয়। প্রতি বছর আজকের দিনে দিবসটি একটি সময়োপযোগী প্রতিপাদ্যের নিরিখে নানা আয়োজনের মধ্যে পালিত হয়। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো—মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা রয়েছে এবং তারই নিরিখে বলা যায়, দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় দেশে সাক্ষরতার হার ছিল প্রায় ১৬ দশমিক ৮ এবং ১৯৭৪ সালের প্রথম আদমশুমারিতে তা দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বর্তমানে ভারতের সাক্ষরতার হার ৮০ দশমিক ৯ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৯৩, সিঙ্গাপুরে ৯৭ দশমিক ৬, মালয়েশিয়ায় ৯৫, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯৮ দশমিক ৮, অস্ট্রেলিয়ায় ৯৯, যুক্তরাষ্ট্রে ৯৯ ও বাংলাদেশে সামগ্রিক সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত একক সমন্বিত শিক্ষা আইন নেই। তবে শিক্ষা পরিচালনার জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন ২০১৪, বাধ্যতামুলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন ১৯৯০ রয়েছে।
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব পূর্ণবয়স্ক নারী-পুরুষ এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সাক্ষরতা ও হিসাবনিকাশে দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনেও বাংলাদেশ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ ও অবৈতনিক ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ড. কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে দেশে সাক্ষরতা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে দেশের সামগ্রিক সাক্ষরতার হার বাড়তে থাকে।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস শুধু তার প্রতিপাদ্য বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। এর সঙ্গে জড়িত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্বরূপ বিশ্লেষণ এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর এগিয়ে যাওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ১৯৭৬ সালে পৃথিবীতে সাক্ষরতার হার ছিল ৬৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক সাক্ষরতার হার প্রায় ৮৭ দশমিক ৭ শতাংশ। যে দেশে সাক্ষরতার হার বেশি, সে দেশ তত উন্নত। ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গের মতো ইউরোপের দেশগুলো আয়তনে ছোট হলেও সাক্ষরতার হার শতভাগ হওয়ায় তাদের জনগণ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। অন্যদিকে মালি, নাইজার, সোমালিয়ার মতো তুলনামূলক বৃহদায়তনের আফ্রিকান দেশগুলোয় সাক্ষরতার হার অনেক কম হওয়ায় তারা ক্ষুধা, দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত। অর্থনীতি ও জনসংখ্যায় বৃহৎ দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের সাক্ষরতার হার বাড়াতে নানামুখী কর্মসূচি নিয়েছে। বাংলাদেশেও সামগ্রিক সাক্ষরতার হার বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এখনো প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ সাক্ষরজ্ঞানহীন।
১৯৭৫ সালে ‘বাংলাদেশ সাক্ষরতা সমিতি’ গঠনের মাধ্যমে ১৮টি জেলার ৬৮টি থানার ৩২৫টি গ্রামে গণশিক্ষা কেন্দ্র চালু করে এবং এর মাধ্যমে প্রায় ১৮ হাজার নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষর জ্ঞান দেয়া হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাক্ষরতা বাড়াতে ‘ইন্টিগ্রেটেড নন-ফরমাল এডুকেশন প্রোগ্রাম’ (আইএনএফইপি) চালু করে। এ প্রোগ্রামের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে কয়েক কোটি মানুষকে সাক্ষর জ্ঞান দান করতে সাহায্য করে। নারী শিক্ষার প্রসার ও ঝরে পড়া রোধের মাধ্যমে সাক্ষরতা বাড়াতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকার মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত উপবৃত্তি ও অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। এ ঐতিহাসিক পদক্ষেপটি গ্রামীণ অঞ্চলে মেয়েদের স্কুলমুখী করতে এবং নারী সাক্ষরতার হার দ্রুত বাড়াতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। প্রাথমিক শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিতে এবং গণসাক্ষরতা অভিযানকে গতিশীল করতে ১৯৯২ সালে পৃথক ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ’, যা পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়া ১৯৯২ সালে দেশব্যাপী ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন’ কার্যকর করা হয়। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে এবং অপুষ্টি দূর করার লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকার ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ কর্মসূচি চালু করে। এ কর্মসূচির ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছানো সহজ হয়। বয়স্ক শিক্ষা ও স্কুল-বহির্ভূত ঝরে পড়া শিশুদের সাক্ষরতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৫ সালে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে পুনর্গঠন করে ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো’ (বিএনএফই) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া বা কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি এমন শিশু এবং বয়স্কদের অক্ষরজ্ঞান দিতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে কিশোর-কিশোরীদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতা ও প্রি-ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে ঝরে পড়া রোধ কর্মসূচি চালু রয়েছে, যা পরোক্ষভাবে সাক্ষরতার হার ধরে রাখতে সাহায্য করে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বয়স্ক শিক্ষা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য সহজপাঠ্য বিশেষ বই ও সিলেবাস তৈরি করে এ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন এনজিও, তৃণমূল পর্যায়ে সাক্ষর জ্ঞান বিস্তারে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ‘গণসাক্ষরতা অভিযান’ বিভিন্ন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট এনজিওর একটি জাতীয় কোয়ালিশন। তারা বাংলাদেশে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং সাক্ষরতা কার্যক্রমের গুণগত মান বাড়াতে গবেষণা, অ্যাডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। ব্র্যাক, আ্ছানিয়া মিশন এবং গণসাক্ষরতা অভিযানের মতো সংস্থাগুলো উপানুষ্ঠানিক স্কুল ও উপজাতীয়-গ্রামাঞ্চলে মৌলিক শিক্ষা বিস্তার করছে। জাগো ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠান মাল্টিমিডিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিচ্ছে।
তবে সাক্ষরতার হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনো আছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশের টেকসই সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কার্যকর ও বাস্তবমুখী শিক্ষা। কেবল নাম সাক্ষর করতে পারা মানুষের উৎপাদনশীলতা অনেক কম থাকে। আধুনিক যুগের জন্য প্রয়োজন কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা। শুধু সাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষ অনেক সময় স্বাস্থ্য, অধিকার, আইনি বিষয় বা ব্যাংকিং লেনদেন সঠিকভাবে বুঝতে পারে না। কাজেই বিশ্ব সাক্ষরতা দিবসে আমাদের এ সব চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভাবতে হবে। এছাড়া ২০১৪ সালের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইনের ব্যাপক ব্যাপ্তি ছিল ‘শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরদান, জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জ়ীবিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদে পরিণতকরণ, আত্মকর্মসংস্থানের যোগ্যতা সৃষ্টিকরণ এবং বিদ্যালয়-বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষার বিকল্প সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্য বিধান।’ কিন্তু উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আইনি ব্যাপ্তির তুলনায় এ প্রতিষ্ঠানের আউটকাম কম।
শিক্ষা মৌলিক অধিকার, তাই এ মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য একটি একক ও সমন্বিত শিক্ষা আইন দরকার, যা আমাদের প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশসহ উন্নত দেশে রয়েছে। সাক্ষরতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগে দাতা সংস্থারা সাহায্য করতেন, এখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সেই সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্র কমে গেছে। ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী কভিডকালীন বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশুর পড়াশোনা সরাসরি বিঘ্নিত হয়েছে, যা বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ১৭ মাস স্কুল বন্ধ ছিল। দারিদ্র্য, জলবায়ুর প্রভাব, নারীর নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ, বন্যা, মহামারী এবং হাওর-বাঁওড় এলাকায় ব্যাপকভাবে এ সাক্ষরতার হার বিঘ্নিত হচ্ছে। এজন্য সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ দরকার। বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিগতভাবে অনেক এগিয়ে গেছে। এ সময় শুধু অক্ষর বা বাক্য লিখতে, পড়তে পাড়া ও গণিতের জ্ঞানসম্পন্ন প্রচলিত সাক্ষরতার গুরুত্ব কমে এসেছে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের অবশ্য করণীয় বেশকিছু কাজ রয়েছে। একজন ব্যক্তি যেন প্রকৃতপক্ষেই পড়তে, লিখতে ও দৈনন্দিন হিসাবনিকাশ করতে পারে, এরূপ কার্যকর সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে, যাতে তারা উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত হতে পারে। সংবিধানে শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি নিরক্ষরতা দূরীকরণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন-২০১৪ অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রমকে আরো বিস্তৃত করতে হবে এবং শিক্ষা আইন করতে হবে। সাক্ষরতা একটি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত। পৃথিবীতে এমন একটি দেশ নেই যে শতভাগ সাক্ষর হয়েও গরিব। প্রতিটি দেশই আগে শতভাগ বা তার কাছাকাছি সাক্ষর হয়েছে, তারপর উন্নতি করেছে। আমাদের দেশের ২৬ শতাংশ মানুষকে নিরক্ষর রেখে সামনে এগোনো অসম্ভব। শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে মেধানির্ভর ও প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য সাধারণ সাক্ষর জ্ঞানের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের মানসম্মত শিক্ষার দিকে এগোতে হবে।
মোছা. নূরজাহান খাতুন: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব










