বর্তমানে বাংলাদেশে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে যে পরিবর্তন ও উন্নয়নের ধারা শুরু হয়েছে তা নিঃসন্দেহে নতুন যুগের সূচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, সরকারের নীতিনির্ধারকসহ সবার দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতায় দেশের এভিয়েশন খাতকে আধুনিক, নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব করার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে বেবিচক সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিশ্বের ৫৬টি দেশের সঙ্গে এয়ার সার্ভিসেস এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করেছে। বর্তমানে দেশে ৩৪টি বিদেশী যাত্রীবাহী এয়ারলাইনস, সাতটি কার্গো এয়ারলাইনস এবং চারটি দেশীয় এয়ারলাইনস নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে। দেশীয় এয়ারলাইনসগুলো বর্তমানে ১৭টি দেশের ২৫টি গন্তব্যে সরাসরি যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
বিমান চলাচলের পরিসংখ্যানও আমাদের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৬৬ হাজার ৬৭৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা কিছুটা কমে ৬৫ হাজার ৫৭৯টি হলেও আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিল ১ কোটি ২০ লাখ ৫ হাজার ৬৯০ জন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ২৬ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ জনে।
দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগেও যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালিত হয় ৯৭ হাজার ৮৮৭টি, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়ায় ৯৬ হাজার ৮৮৯টিতে। তবে একই সময়ে অভ্যন্তরীণ যাত্রীর সংখ্যা ৪৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৬ থেকে বেড়ে ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ২৭৮-এ উন্নীত হয়।
এয়ার কার্গো পরিবহনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। ২০২৩ সালে মোট কার্গো পরিবহন ছিল প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার ৫৩৫ দশমিক ৪৬ টন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯ টনে দাঁড়ায় এবং ২০২৫ সালেও প্রায় ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৪ দশমিক ৪৬ টন কার্গো পরিবহন করা হয়েছে।
দেশের এভিয়েশন অবকাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। বর্তমানে টার্মিনাল ১ ও ২-এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেয়ার সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে ১ কোটি ২৬ লাখেরও বেশি যাত্রীকে সেবা দেয়া হচ্ছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরি হবে। ফলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা দুই কোটি ছাড়াবে।
তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বর্তমান টার্মিনালগুলোর প্রায় এক লাখ বর্গমিটার আয়তনের সঙ্গে তৃতীয় টার্মিনালের ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার যুক্ত হয়ে মোট আয়তন দাঁড়াবে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার। আমদানি কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ৮৪ হাজার থেকে বেড়ে ৩ লাখ ৫৭ হাজার টনে এবং রফতানি কার্গো সক্ষমতা ৭ লাখ ৪৭ হাজার টনে উন্নীত হবে। যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। চেকইন কাউন্টার ৬২ থেকে বেড়ে ১৮৯টি এবং পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ বা ইমিগ্রেশন কাউন্টার ১০৭ থেকে ২৩৬টিতে উন্নীত হবে। ভবিষ্যতে বোর্ডিং গেটের সংখ্যা ৩৪টিতে উন্নীত করার সুযোগ থাকবে। কার পার্কিং সুবিধাও ৮০০টি গাড়ি থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৩০টি গাড়িতে উন্নীত করা হবে। আমি দৃঢভাবে বিশ্বাস করি, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে এটি শুধু বাংলাদেশে মাইলফলক সৃষ্টি করবে না, বরং সম্মানিত যাত্রীদের জন্য আরো আধুনিক, নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও বিশ্বমানের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আকাশপথে ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নতুন এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার চালু হয়েছে। এতে একই এয়ার স্পেসে অধিকসংখ্যক ফ্লাইট ধারণ ও পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে রাজস্ব বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ চলছে। বর্তমানে কক্সবাজার দেশের অন্যতম ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর, যেখানে প্রতিদিন ২৮-৩০টি যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা হচ্ছে। সেখানে ৪৫০ জন আন্তর্জাতিক যাত্রী ধারণক্ষমতার প্রস্থান লাউঞ্জ, চেকইন কাউন্টার ও ইমিগ্রেশন সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। বিমানবন্দরের রানওয়ে নয় হাজার ফুট থেকে সমুদ্রের দিকে আরো ১ হাজার ৭০০ ফুট সম্প্রসারণ করে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে বড় আকারের উড়োজাহাজ কক্সবাজারে অবতরণ করতে পারবে। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণসহ দেশের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও ভবিষ্যৎ বিমান যোগযোগের প্রয়োজন বিবেচনায় অব্যবহৃত ও সীমিত ব্যবহারে থাকা দেশের অন্যান্য বিমানবন্দর পর্যায়ক্রমে সচল করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বগুড়া, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, ঈশ্বরদী, শমসেরনগর, খান জাহান আলী, কুমিল্লা ও পটুয়াখালী বিমানবন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক গুরুত্ব ও যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ফিজিবিলিটি স্টাডি চলমান রয়েছে। সরকারের বাজেট বরাদ্দ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব বিমানবন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে। বিশেষ করে বগুড়া বিমানবন্দরের ফিজিবিলিটি স্টাডি থেকে অন্যান্য কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। বিমানবন্দর পরিচালনায় বেশকিছু বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাবও পাওয়া গেছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানো হবে।
শেষ করার আগে বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক) হিসেবে আরো কয়েকটি কথা বলতে চাই। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনেকে দ্বিতীয় আরেকটি রানওয়ের কথা বলছেন। বর্তমানে যে রানওয়েটি আছে সেখানে তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে দ্রুতগতির ট্যাক্সিওয়ে কানেক্ট করার ফলে রানওয়ে অকুপেন্সি টাইম অনেক কমেছে। প্রতি ঘণ্টায় এখন ২০-২২টি ফ্লাইট হ্যান্ডেল করার সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। ভবিষ্যতে তা আমরা প্রতি ঘণ্টায় ২৬টিতে নিয়ে যেতে পারব। তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে একটি ডিপেন্ডেন্ট রানওয়ে থাকছে। জায়গা সংকুলান না হওয়া ও বিমানবন্দেরের চতুর্দিকে আবাসন গ্রাস করায় হয়তো আরেকটি রানওয়ে করা কঠিন হবে। কারণ রানওয়ের সঙ্গে ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেমসহ সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করতে অনেক জায়গার প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে আবাসন নীতিমালার সঙ্গে হয়তো সমন্বয় করতে হবে। সামনের দিনগুলোয় হয়তো তা নিয়ে কাজ করার সুযোগ হবে। ভবিষ্যতের প্রয়োজন মাথায় রেখে নতুন আরেকটি বিমানবন্দরের কথা হয়তো ভবিষ্যতে ভাবা যাবে।
এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম: সদস্য (এটিএম), বেবিচক
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভের বক্তব্যে]










