একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল বিস্তারের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশই আজ বিচ্ছিন্নভাবে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। তাই সফল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কৌশল প্রণয়নে বিশ্ববাজারের গতিপ্রকৃতি, অন্য দেশের শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা অপরিহার্য। এ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকেও তার বৈদেশিক বাণিজ্য কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার এবং ভারত ও চীন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু এখানে আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য শুধু বড় বাণিজ্য অংশীদারদের তালিকা করা নয়; বরং শিল্প রূপান্তর, রফতানি বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে সংযুক্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন কোন দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নীতিগত শিক্ষা দিতে পারে, সেটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই জাপান ও উদীয়মান এশিয়ার অর্থনীতিগুলো—দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া—বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, ধারাবাহিক শিল্পনীতি, দক্ষ মানবসম্পদ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনীতির সফল রূপান্তর সম্ভব।

বাংলাদেশের জন্য এ বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত তিন দশকে দেশটি মূলত কম খরচের শ্রমনির্ভর তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশের মোট পণ্য রফতানির ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এ খাত থেকে, যা প্রায় ৪৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। ২০২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ খাত নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

এ সাফল্যের মধ্যেই ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ নিহিত। বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধি মডেল এখনো প্রধানত কম মজুরি ও স্বল্পদক্ষ শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দ্রুত বিস্তারের ফলে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার চরিত্র আমূল বদলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান এশীয় অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ফলে কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত উচ্চ মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে আরো গভীরভাবে সংযুক্ত হওয়া।

এলডিসি উত্তরণ ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বৈত চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর হোক কিংবা সম্ভাব্য ২০২৯ সাল—যে সময়েই কার্যকর হোক না কেন, তা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও শিল্পনীতির জন্য একটি নতুন বাস্তবতার সূচনা করবে। শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে। তখন প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি হবে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবন, মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা।

একই সময়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), অটোমেশন ও ডেটা অ্যানালিটিকস উৎপাদন ও সেবা খাতকে নতুন রূপ দিচ্ছে। কৃষিতেও তৈরি হচ্ছে প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনা। রুটিনভিত্তিক কাজের চাহিদা কমছে, বাড়ছে প্রযুক্তিসক্ষম মানবসম্পদের প্রয়োজন।

ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি নতুন প্রবৃদ্ধি মডেল, যার ভিত্তি হবে আধুনিক কৃষি, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও উদ্ভাবন। এর জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে জ্ঞান প্রয়োগ, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা ও আজীবন শিক্ষার দিকে এগিয়ে নিতে হবে। কেননা ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে প্রয়োজন হবে প্রযুক্তিসক্ষম, সৃজনশীল, অভিযোজনক্ষম এবং আজীবন শিক্ষাগ্রহণে সক্ষম এক নতুন প্রজন্মের কর্মশক্তি।

এ রূপান্তরের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন স্বল্পদক্ষ শ্রমিকরা। তাই তাদের পুনঃদক্ষতা (রি-স্কিলিং) ও দক্ষতা উন্নয়নের (আপ-স্কিলিং) জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে। যারা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবেন না, তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করতে হবে। প্রযুক্তিগত রূপান্তর যেন কর্মসংস্থানের সংকট বা সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি না করে, সে দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি শিল্প খাতেরও।

জাপান ও ‘চায়না প্লাস ওয়ান’-এর সুযোগ: এ রূপান্তরকালে জাপান ও উদীয়মান এশীয় দেশগুলোর অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। গত কয়েক দশকে তারা শিল্পায়ন, রফতানি সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ বিনিয়োগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষায় তারা কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে তা জানা দরকার। তাদের অভিজ্ঞতা ও নীতি থেকে শিক্ষাগ্রহণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জাপান দীর্ঘকাল ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেল এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বড় প্রকল্পে জাপানি বিনিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ বদলে দিচ্ছে। বর্তমানে জাপানে বাংলাদেশের রফতানি প্রায় ১ দশমিক ৪০ থেকে ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে আমদানি প্রায় ১ দশমিক ৮৫ থেকে ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। তৈরি পোশাকের বাইরেও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, আইটি সেবা ও হালকা প্রকৌশল রফতানির বড় সুযোগ রয়েছে সেখানে। বিশেষ করে জাপানের দ্রুত বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা, শ্রম সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ফলে দেশটির শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে জাপানি কোম্পানিগুলোর ‘‌চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল অনুসরণ করছে। অর্থাৎ চীনের পাশাপাশি অন্য একটি দেশে উৎপাদন বা বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেয়া।

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমশক্তি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম গন্তব্য হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের সাফল্যের পাঠ: দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশটি শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তর হয়েছে। ষাটের দশকে কৃষিপ্রধান ও নিম্ন আয়ের দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা শিক্ষা, গবেষণা ও রফতানিমুখী নীতির সমন্বয়ে আজ বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে দেশটির জিডিপির প্রায় ৪৪ শতাংশ আসে রফতানি থেকে। সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস ও অটোমোবাইল শিল্পে তারা শীর্ষস্থানে। কোরিয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হলো মানবসম্পদ। তারা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তুলেছে।

কোরিয়া বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) দেশ, যার বড় প্রমাণ চট্টগ্রামের কেইপিজেড। স্যামসাং ও হুন্দাইয়ের মতো বড় ব্র্যান্ডগুলো এখন বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে মোবাইল ও গাড়ি অ্যাসেম্বল করছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শুল্ক সুবিধা বজায় রাখতে এখন কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি সম্পন্ন হলে রফতানি বহুগুণ বাড়বে।

বাংলাদেশ কোরিয়া থেকে প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে রয়েছে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিক কাঁচামাল, উচ্চ মানের টেক্সটাইল ফ্যাব্রিকস ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। অন্যদিকে বাংলাদেশের রফতানি প্রায় ৬০০-৭০০ মিলিয়ন ডলার। যার প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ও জুতো। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির নতুন ঢেউয়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশটি প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম দক্ষ বাণিজ্য কূটনীতি ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) কার্যকর ব্যবহারে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ যেখানে ভিয়েতনাম থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য (সিমেন্ট ক্লিংকার, তুলা, ইলেকট্রনিকস) আমদানি করে, সেখানে আমাদের রফতানি মাত্র ১৩০-১৫০ মিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনামে বাংলাদেশের রফতানি বেশ সীমিত, যার মধ্যে প্রধান পণ্য হলো ওষুধ, কাঁচা চামড়া এবং কিছু বিশেষায়িত ওভেন ফ্যাব্রিক ও তুলা।

ভিয়েতনাম দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি ও প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে নিজেদের যুক্ত করেছে। ২০২৫ সালে তাদের মোট রফতানি ৪৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, যার তিন-চতুর্থাংশই এসেছে প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস খাতের বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান থেকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভিয়েতনামের রফতানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিদেশী বিনিয়োগভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে আসে।

একই অঞ্চলের দুটি দেশ হয়েও ভিয়েতনাম রফতানি বৈচিত্র্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে সংযুক্তির ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির কার্যকর ব্যবহার।

থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা: থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক এবং গ্লোবাল ভ্যালু চেইনের সঙ্গে নিজেদের সফলভাবে সংযুক্ত করেছে। থাইল্যান্ড অটোমোবাইল উৎপাদনের আঞ্চলিক হাব, মালয়েশিয়া ইলেকট্রনিকস ও পেট্রোকেমিক্যালে অগ্রগামী। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া তার বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক শিল্পায়নের মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রেও এসব দেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। থাইল্যান্ড কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায়, মালয়েশিয়া প্রযুক্তি ও উচ্চ শিক্ষায় আর ইন্দোনেশিয়া ডিজিটাল শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায় যে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির জন্য শিক্ষা ও শিল্পনীতিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হয়।

গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশের অবস্থান: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু এখন গ্লোবাল ও রিজিওনাল ভ্যালু চেইন। যেমন একটি স্মার্টফোনের ডিজাইন যুক্তরাষ্ট্রে হলে চিপ তৈরি হয় তাইওয়ানে, যন্ত্রাংশ আসে মালয়েশিয়া থেকে এবং চূড়ান্ত সংযোজন হয় ভিয়েতনামে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু তৈরি পোশাক রফতানি নয়, বরং ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, মেডিকেল ডিভাইস, হালকা প্রকৌশল এবং ডিজিটাল সেবায় এ উৎপাদন নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে ওঠা।

বাংলাদেশকে এ নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে হলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা, উন্নত লজিস্টিকস এবং দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিসক্ষম মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।

নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর সন্ধানে: বাংলাদেশের সামনে এখন মৌলিক প্রশ্ন—আমরা কি কেবল কম খরচের শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর নির্ভর করেই এগোব, নাকি প্রযুক্তি ও উচ্চ মূল্য সংযোজনভিত্তিক নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলব?

রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর উপাদান, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সফটওয়্যার খাতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি জাপানের সঙ্গে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং অন্যান্য এশীয় দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করা জরুরি। তবে শুধু অবকাঠামো তৈরি ও চুক্তি সম্পাদনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন। এটিকে দ্রুত ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে যৌথ অংশীদারত্ব ছাড়া এ রূপান্তর অসম্ভব।

আগামী দশকে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সাফল্য শুধু নতুন বাজার খোঁজার ওপর নির্ভর করবে না; বরং আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে সংযুক্তি, জাপান ও উদীয়মান এশিয়ার সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করবে। এশিয়ার সফল অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, সঠিক নীতি, ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্বল্প সময়েই অর্থনৈতিক রূপান্তর সম্ভব। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই সুযোগই উন্মুক্ত।

এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও প্রাক্তন উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ