বাংলাদেশে জ্বালানি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ দীর্ঘদিন ধরেই কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, এটি একই সঙ্গে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্ন হয়ে আছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, এলপিজিসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ওপর থাকলেও ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা এখনো সরকারের হাতেই রয়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রবিধানমালা তৈরির উদ্যোগ ২০১২ সাল থেকে ঝুলে আছে। বিইআরসি একাধিকবার মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েও তা পায়নি। ১৪ বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক কাঠামো এভাবে ঝুলে থাকা নিছক প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতেই ক্ষমতা দেয়া হয়নি বিইআরসিকে।

জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক স্বার্থ, ভোক্তার স্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। কিন্তু সে ভারসাম্য রক্ষার প্রথম শর্ত হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা। বর্তমানে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের মূল্য নির্ধারণে সরকার স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি অনুসরণ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ও বীমা ব্যয়, বিনিময় হার, কর ও অন্যান্য ব্যয়ের পরিবর্তন বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। এ ধরনের বাজারভিত্তিক মূল্য সমন্বয়ের যৌক্তিকতা আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশেও তার প্রভাব পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক বলেই মূল্য নির্ধারণের প্রতিটি হিসাব জনসাধারণের কাছে অস্পষ্ট থাকবে, এমনটি গ্রহণযোগ্য নয়।

সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিই বিষয়টির গুরুত্ব আবার সামনে এনেছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চার ধরনের জ্বালানি পণ্যের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের প্রভাব পাম্পে জ্বালানি কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ডিজেল পরিবহন, সেচ, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব পড়বে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। এরই মধ্যে পরিবহন ও ব্যবসার ব্যয় বাড়ার প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

অতএব, প্রশ্নটি শুধু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো কিনা, তা নয়। প্রশ্ন হলো—এ দাম কীভাবে নির্ধারিত হলো এবং সেই নির্ধারণের প্রতিটি ধাপ কতটা যাচাইযোগ্য? বিইআরসি আইনের আওতায় পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের মূল্য নির্ধারণের জন্য ২০১২ সালে প্রবিধানমালার খসড়া তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের মতামত না পাওয়ায় তা চূড়ান্ত হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও মতামত চাওয়া হয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনটি পৃথক প্রবিধানমালার পরিবর্তে একটি সমন্বিত প্রবিধানমালা তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। তবু সিদ্ধান্ত হয়নি।

সরকারের হাতে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা থাকার পক্ষে অবশ্যই যুক্তি আছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অত্যন্ত অস্থির; বিপিসিকে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে হয়; বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ রয়েছে; আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য দ্রুত পরিবর্তিত হলে রাষ্ট্রীয় সংস্থার লোকসান বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বিপিসির লোকসান ও আমদানি অর্থায়নের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ভর্তুকির সীমা, রাষ্ট্রীয় আর্থিক সক্ষমতা এবং জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার বিষয়গুলো মূল্য নির্ধারণে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু এসব যুক্তি নিয়ন্ত্রক কাঠামো দুর্বল রাখার কারণ হতে পারে না, বরং আর্থিক ঝুঁকি যত বেশি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া তত বেশি স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে এলপিজির অভিজ্ঞতাও বিবেচনাযোগ্য। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর ২০২১ সাল থেকে বিইআরসি এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করছে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক কমিশনের মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে এখন আর দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

একই সঙ্গে বিইআরসির হাতে দায়িত্ব দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন সরলীকরণও কাম্য নয়। কমিশনের নিজস্ব সক্ষমতা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, তথ্য যাচাই, আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষের তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিপিসিকে তার আমদানি ব্যয়, মজুদ, পরিবহন, পরিশোধন, বিতরণ ও অন্যান্য ব্যয়ের তথ্য নির্দিষ্ট কাঠামোয় প্রকাশ করতে হবে। মূল্য নির্ধারণের সূত্রও জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে কমলে দেশীয় বাজারেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাম কমানোর বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় শুধু মূল্য বাড়ানোর পদ্ধতি হবে না; মূল্য কমানোর ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর হতে হবে।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার—ডিজেল ও কেরোসিনের মতো পণ্যের সামাজিক প্রভাব পেট্রল ও অকটেনের মতো নয়। ডিজেলের মূল্য সরাসরি কৃষি, সেচ, পণ্য পরিবহন ও গণপরিবহনের ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সব পণ্যে একই হারে মূল্য সমন্বয় করা হলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব এক নয়। একই সঙ্গে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে পরিবহন, খাদ্য ও অন্যান্য বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর বাজার তদারকি প্রয়োজন।

২০১২ সালে শুরু হওয়া একটি প্রবিধানমালা ১৪ বছর পরও চূড়ান্ত না হওয়া তাই আর গ্রহণযোগ্য প্রশাসনিক বিলম্ব হতে পারে না। সরকারকে দ্রুত একটি সমন্বিত ও কার্যকর প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করতে হবে। জ্বালানি মূল্য কখনই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুবিধা অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়ার বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, জনজীবন ও রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে—তার চেয়েও জরুরি হলো ক্ষমতাটি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে। প্রশাসনিক কর্তৃত্বের কেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণই হওয়া উচিত বাংলাদেশের জ্বালানি মূল্যনীতির পরবর্তী পদক্ষেপ।