প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের অনুসন্ধিৎসা কত দূর যেতে পারে। একটি মৌলিক আবিষ্কার কীভাবে জ্ঞানের সীমানা বদলে দিতে পারে এবং মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রাকে নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে নিতে পারে। ২০২৬ সালের বিজ্ঞানে নোবেলও তার ব্যতিক্রম নয়। এ বছর শারীরতত্ত্ব বা চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার পুরস্কার যেন একই গল্পের তিনটি অধ্যায়। একটিতে আলো দিয়ে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষ নিয়ন্ত্রণ, অন্যটিতে একটি অণুর আয়নার প্রতিবিম্বের মতো দুটি ভিন্ন রূপ ও জীবনের রাসায়নিক রহস্য, আর তৃতীয়টিতে দক্ষিণ মেরুর বরফের নিচে মহাবিশ্বের অদৃশ্য কণার সন্ধান। তিনটি আবিষ্কারের ক্ষেত্র আলাদা হলেও তাদের অন্তর্নিহিত শিক্ষা একই। প্রকৃতির গভীরতম রহস্য বোঝার জন্য কখনো কখনো প্রচলিত পথ ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন জানালা খুলতে হয়। এ প্রবন্ধে আমি ২০২৬ সালের শারীরতত্ত্ব বা চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন এবং পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজয়ীদের অসাধারণ অবদান এবং তাদের আবিষ্কারের বৈপ্লবিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করব।
মাত্র ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ কিলোগ্রাম ওজনের মানুষের মস্তিষ্ক প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরনের জটিল নেটওয়ার্কে বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের অবিশ্বাস্য সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত ও আচরণ গড়ে ওঠে। তবে এ বিপুল জটিলতার মাঝেও স্নায়ুবিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল—মস্তিষ্কের অসংখ্য নিউরনের ভিড়ে যদি একটি নির্দিষ্ট নিউরনকে ইচ্ছামতো চালু বা বন্ধ করার কোনো নিবিড় ও সূক্ষ্ম উপায় খুঁজে পাওয়া যেত! বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিলে কাঙ্ক্ষিত নিউরনের পাশাপাশি আশপাশের অনেক কোষও সক্রিয় হয়ে যায়। ওষুধ ব্যবহার করলেও একই সমস্যা। রাসায়নিক পদার্থ বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত। এটি ছিল পিয়ানোর কেবল একটি সুনির্দিষ্ট সুর বাজাতে গিয়ে পুরো কিবোর্ডে একসঙ্গে থাবা বসানোর মতো সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘদিনের এ সীমাবদ্ধতা ভেঙে ২০২৬ সালের শারীরতত্ত্ব বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরোথ, জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেম্যান ও গেয়র্গ নাগেল। আলোক-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল আবিষ্কার এবং এগুলোকে কাজে লাগিয়ে আলো দিয়ে স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি—অপটোজেনেটিকস—উদ্ভাবনে তাদের অবদানের স্বীকৃতি এ পুরস্কার।
এ গল্পের সূচনা কোনো অত্যাধুনিক নিউরোসায়েন্স ল্যাবরেটরিতে নয়, বরং ক্লামাইডোমোনাস রেইনহার্ডটি নামের এক আণুবীক্ষণিক, এককোষী সবুজ শৈবালে। আলোর দিকে সাঁতরে যাওয়ার জন্য শৈবালটির কোষে রয়েছে আলোসংবেদনশীল বিশেষ প্রোটিন। বিজ্ঞানী পিটার হেগেম্যান ও গেয়র্গ নাগেলের গবেষণায় উন্মোচিত হয় ‘চ্যানেলরোডপসিন’ নামের এমন এক প্রোটিন, যা আলো পেলেই আয়ন চলাচলের পথ করে দেয় এবং কোষে বৈদ্যুতিক স্পন্দন তৈরি করে। অর্থাৎ আলোকে সরাসরি বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করার এক চমৎকার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা লুকিয়ে ছিল এই অতি সাধারণ শৈবালেই।
কার্ল ডাইসেরোথ এ প্রাকৃতিক কৌশলটিকেই নিয়ে এলেন মস্তিষ্কের জটিল জগতে। তিনি ও তার দল নির্দিষ্ট নিউরনে চ্যানেলরোডপসিনের জিন পৌঁছে দিয়ে কোষগুলোকে আলোসংবেদনশীল করে তোলেন। এরপর সূক্ষ্ম অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে আলো ফেললেই নির্বাচিত নিউরন মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঠিক একইভাবে, অন্য ধরনের আলোসংবেদনশীল প্রোটিন ব্যবহার করে নিউরনের সক্রিয়তা থামিয়ে দেয়াও সম্ভব হয়। এভাবেই আলো, জিনপ্রযুক্তি ও স্নায়ুবিজ্ঞানের চমৎকার মেলবন্ধনে জন্ম নেয় ‘অপটোজেনেটিকস’।
অপটোজেনেটিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর নিখুঁত সুনির্দিষ্টতা। বিজ্ঞানীরা এখন সুনির্দিষ্ট নিউরন বা স্নায়ু-সার্কিটকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন—এর ফলে প্রাণীর আচরণ ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়ায় ঠিক কী পরিবর্তন আসছে। এতে ‘কোন নিউরন সক্রিয় হলে কী ঘটে’—কেবল এটুকু জানার বদলে তারা আরো গভীর প্রশ্ন তুলতে পারছেন: ‘এ নির্দিষ্ট নিউরনের সক্রিয়তাই কি ওই আচরণের মূল কারণ?’ অর্থাৎ কেবল পারস্পরিক সম্পর্ক নয়, বরং সরাসরি ‘কার্যকারণ সম্পর্ক’ পরীক্ষার পথ খুলে গেছে। এ কারণেই অপটোজেনেটিকস আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছে।
পারকিনসন্স রোগ, বিষণ্নতা, আসক্তি ও সামাজিক আচরণের মতো জটিল স্নায়বিক প্রক্রিয়া বোঝার গবেষণায় এ প্রযুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরীক্ষাগারে প্রাণীর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট সার্কিট নিয়ন্ত্রণ করে রোগের উপসর্গের পেছনের কারণ নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। মানুষের চিকিৎসাতেও এর প্রয়োগের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দৃষ্টিহীনতার কিছু ক্ষেত্রে অপটোজেনেটিক থেরাপির গবেষণা দ্রুত এগোচ্ছে।
একটি আণুবীক্ষণিক শৈবালের আলোকসংবেদনশীলতার কৌশল কীভাবে মানবমস্তিষ্কের জটিল রহস্য উন্মোচনের হাতিয়ার হয়ে উঠল—এ গল্প বিজ্ঞানের এক মৌলিক সত্যকেই মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতি অনেক সময় এমন নিখুঁত সমাধান তৈরি করে রাখে যা মানুষের কল্পনার অতীত। বিজ্ঞানীদের কাজ হলো প্রকৃতির সেই সমাধানকে চিনে নেয়া, তার মূলনীতি বোঝা এবং তাকে মানবকল্যাণে দায়িত্বশীলভাবে প্রয়োগ করা।
রসায়নের নোবেলও আমাদের প্রকৃতির আরেকটি গভীর রহস্যের সামনে দাঁড় করায়। একটি ডান হাত ও একটি বাঁ হাত দেখতে একই রকম হলেও তারা একে অন্যের দর্পণ-প্রতিবিম্ব। একটিকে ঘুরিয়ে অন্যটির সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যায় না। অণুর জগতেও এমনটি ঘটে। একই পরমাণু দিয়ে তৈরি দুটি অণু পরস্পরের দর্পণ-প্রতিবিম্ব হতে পারে, কিন্তু জীবন্ত দেহে তাদের আচরণ সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। এ বৈশিষ্ট্যের নাম কাইরালিটি।
জীবনের রাসায়নিক জগতে কাইরালিটির রহস্যটি আরো গভীর। প্রোটিন তৈরিতে ব্যবহৃত অ্যামিনো অ্যাসিডগুলোর ক্ষেত্রে জীবজগৎ মূলত একটি নির্দিষ্ট কাইরাল রূপকেই বেছে নিয়েছে। কিন্তু কেন? অণুর দুটি সম্ভাব্য রূপের (বাঁ ‘হাতের’) মধ্যে জীবনের সূচনালগ্নে একটি রূপ কীভাবে অন্যটির ওপর একচ্ছত্র প্রাধান্য পেল—এ প্রশ্ন রসায়নবিদদের বহুদিন ভাবিয়েছে। অসমমিত জৈবসংশ্লেষণে ‘অ-রৈখিক প্রভাব’ (ননলিনিয়ার এফেক্ট) এবং অটোক্যাটালিসিস আবিষ্কারের মাধ্যমে এ জটিল রহস্যের জট খোলার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি বি. কাগান ও জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই।
কাগানের গবেষণা দেখিয়েছে, কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শুরুতে অতি সামান্য একপক্ষীয় ঝোঁক থাকলেও তার ফলাফল সেই ক্ষুদ্র পার্থক্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ ১ শতাংশেরও কম পার্থক্য সব সময় ১ শতাংশের ফল দেয় না। রাসায়নিক প্রক্রিয়ার অ-রৈখিক আচরণ সেটিকে অনেক বড় বৈষম্যে পরিণত করতে পারে। সোয়াইয়ের স্ব-অনুঘটিত বিক্রিয়া এ ধারণাকে আরো চমকপ্রদ করে তোলে। তার বিখ্যাত ‘সোয়াই বিক্রিয়ায় উৎপন্ন কাইরাল পদার্থটি নিজেই অনুঘটকের মতো কাজ করে পরবর্তী বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ফলে শুরুতে অতি সামান্য অসমতা থাকলেও এক স্ব-বর্ধনশীল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা ক্রমে প্রবল রূপ ধারণ করে।
এ আবিষ্কারের গুরুত্ব কেবল রাসায়নিক সংশ্লেষণে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সঙ্গে যুক্ত। আদিম পৃথিবীর রাসায়নিক পরিবেশে যদি কোনো ক্ষুদ্র কাইরাল বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে থাকে, স্ব-অনুঘটন ও অ-রৈখিক প্রক্রিয়া সেটিকে বাড়িয়ে দিতে পারে কিনা—এ প্রশ্ন এখন আরো অর্থবহ হয়ে উঠেছে। এটি জীবনের উৎপত্তির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়, কিন্তু কীভাবে ‘একটি হাত’ অন্য হাতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক প্রক্রিয়া সামনে আনে।
এ আবিষ্কারের ব্যবহারিক গুরুত্বও অপরিসীম। বিশেষ করে ওষুধ শিল্পে, একই রাসায়নিক গঠনের দুটি দর্পণ-প্রতিবিম্ব রূপ (মিরর ইমেজ) মানবদেহে সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ করতে পারে। একটি রূপ হয়তো কাঙ্ক্ষিত জৈবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, অথচ অন্যটি কম কার্যকর কিংবা অপ্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ওষুধের সুনির্দিষ্ট কাইরাল রূপটি নিখুঁতভাবে সংশ্লেষণ করার ক্ষমতা আধুনিক ওষুধ শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাগান ও সোয়াইয়ের কাজ অণু নিয়ন্ত্রণের এ মৌলিক বিজ্ঞানকেই নতুন মাত্রা দিয়েছে।
তবে ‘আয়না রসায়ন’ আমাদের সামনে ভবিষ্যতের আরেকটি কঠিন প্রশ্নও তুলে ধরে—মিরর লাইফ কি একদিন তৈরি করা সম্ভব? সম্পূর্ণ স্ব-প্রতিলিপিকারী মিরর জীব এখনো বাস্তবতা নয়। কিন্তু সিনথেটিক বায়োলজি ও অণুপ্রকৌশলের অগ্রগতিতে এমন জীবের সম্ভাবনা নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে। প্রচলিত জীবনের বিপরীত কাইরাল অণু দিয়ে তৈরি কোনো জীব যদি কখনো স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে বেড়ে উঠতে ও ছড়িয়ে পড়তে পারে, তার সঙ্গে প্রচলিত জীবজগতের সম্পর্ক কেমন হবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তাই মিরর লাইফের গবেষণায় বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের পাশাপাশি বায়োসেফটি ও নৈতিক বিবেচনাও জরুরি।
এবার দৃষ্টি দেয়া যাক পৃথিবীর সুদূর দক্ষিণ প্রান্তে—অ্যান্টার্কটিকার বরফাচ্ছাদিত ভূখণ্ডের গভীরে। সেখানে বিজ্ঞানীরা এমন এক কণার সন্ধানে ব্যাকুল, যা কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের মহাজাগতিক ঘটনাপ্রবাহের বার্তা বহন করে আনে। কণাটির নাম নিউট্রিনো। আধানহীন ও নামমাত্র ভরের এ কণাগুলো পদার্থের সঙ্গে এতই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে যে বিপুল পরিমাণ নিউট্রিনো প্রতিনিয়ত আমাদের দেহ ও পৃথিবী ভেদ করে অলক্ষ্যে চলে যায়। এ অদৃশ্য কণাকে শনাক্ত করতে অ্যান্টার্কটিকার সুবিশাল বরফখণ্ডকেই বিশাল এক ডিটেক্টরে রূপান্তর করার দূরদর্শী পরিকল্পনা করেছিলেন বেলজিয়ান-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ গঠনে তার অগ্রণী ভূমিকা এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
প্রায় এক ঘনকিলোমিটার অ্যান্টার্কটিক বরফের গভীরে স্থাপিত হাজার হাজার আলোক-সংবেদী ডিটেক্টর নিউট্রিনোর অতি বিরল সংঘর্ষের চিহ্ন খুঁজে বেড়ায়। কোনো নিউট্রিনো বরফের পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খেলে সেখান থেকে তৈরি হয় তীব্র গতির চার্জযুক্ত কণা, যা বরফের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় ‘চেরেঙ্কভ আলো’ নামের এক ক্ষীণ নীলাভ আভা তৈরি করে। সেই আলোর সূক্ষ্ম ঝলক বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা নিউট্রিনোর শক্তি ও গতিপথ নির্ধারণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আইসকিউব’ প্রথম মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ শক্তির নিউট্রিনোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেয়। পরবর্তী গবেষণায় সক্রিয় গ্যালাক্সি এনজিসি ১০৬৮ এবং ব্লাজার টিএক্সএস ০৫০৬+০৫৬-কে এই নিউট্রিনোর সুনির্দিষ্ট উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এমনকি ২০২৩ সালে আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ ‘মিল্কিওয়ে’ থেকেও নিউট্রিনো নির্গমনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
এতকাল মহাবিশ্বকে জানার প্রধান মাধ্যম ছিল আলো—দৃশ্যমান আলো, রেডিও তরঙ্গ, এক্স-রে বা গামা রশ্মি। কিন্তু আলো মহাজাগতিক ধূলি ও গ্যাসের মধ্য দিয়ে আসার সময় পরিবর্তিত হতে পারে। নিউট্রিনো অনেক বেশি সরাসরি তথ্য বহন করতে পারে, কারণ পদার্থের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল। ফলে নক্ষত্রের বিস্ফোরণ, সক্রিয় গ্যালাক্সির কেন্দ্র কিংবা অন্যান্য চরম মহাজাগতিক পরিবেশে কী ঘটছে, তার নতুন ধরনের খবর পৃথিবীতে পৌঁছে দিতে পারে এ কণা। এভাবেই নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের একটি নতুন জানালা খুলেছে।
আইসকিউবের সাম্প্রতিক আপগ্রেড এ অনুসন্ধানকে আরো শক্তিশালী করেছে। নতুন ও উন্নত আলোকসংবেদী যন্ত্র বরফের বৈশিষ্ট্য আরো ভালোভাবে পরিমাপ এবং নিউট্রিনোর গতিপথ আরো নির্ভুলভাবে পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। ভবিষ্যতের প্রস্তাবিত আইসকিউব-জেন ২ আরো বৃহৎ আয়তনে নিউট্রিনো শনাক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। অর্থাৎ, আমরা এখন মহাবিশ্বের শুধু আলো দেখা নয়, তার অদৃশ্য কণার ভাষা পড়ার যুগে প্রবেশ করছি।
একজন বিজ্ঞানী হিসেবে যখন ২০২৬ সালের শারীরতত্ত্ব, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলজয়ী আবিষ্কারগুলোর দিকে তাকাই, তখন এক অপূর্ব বৈজ্ঞানিক ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। এ গবেষণাগুলো আমাদের ভেতরের স্নায়ুজগৎ (অপটোজেনেটিকস), জীবনের রাসায়নিক মূলভিত্তি (আণবিক কাইরালিটি) এবং সুদূর মহাবিশ্বের প্রান্তসীমাকে (নিউট্রিনো) যেন একই সূত্রে গেঁথে দিয়েছে। এক আণুবীক্ষণিক শৈবাল থেকে মস্তিষ্কের রহস্যভেদ, অণুর ক্ষুদ্রতম অসমতা থেকে জীবনের ইতিহাস, আর অ্যান্টার্কটিকার বরফ থেকে মহাজাগতিক বার্তা—এ সাফল্যগুলো প্রমাণ করে যে বিজ্ঞানের প্রকৃত শক্তি কেবল প্রযুক্তির উৎকর্ষে নয়, প্রকৃতিকে নতুনভাবে প্রশ্ন করার বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসে। গবেষণাগারের অভিজ্ঞতা থেকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মৌলিক গবেষণার মাধ্যমেই উন্মোচিত হয় নতুন জ্ঞান, যা যেকোনো যুগান্তকারী প্রযুক্তির শক্ত ভিত গড়ে তোলে। তবে মস্তিষ্কে আণবিক হস্তক্ষেপ কিংবা মিরর লাইফের মতো সম্ভাবনাময় অথচ স্পর্শকাতর প্রযুক্তির উদ্ভব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অসীম ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয় সমান নৈতিক দায়বদ্ধতাও। তাই কেবল প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনই শেষ কথা নয়; কৌতূহল, বৈজ্ঞানিক সতর্কতা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে সেই জ্ঞানকে নিরাপদ মানবকল্যাণে রূপান্তর করার প্রজ্ঞাই হবে আমাদের আলোকিত ভবিষ্যতের আসল চাবিকাঠি।
ড. তোফাজ্জল ইসলাম: অধ্যাপক ও ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ; প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়










