ঢাকাসহ বাংলাদেশের কোনো শহরই বিশ্বের বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে আসতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক দিন ধরে আমরা দেখছি, শহরকে বাসযোগ্য করতে সরকারের পক্ষ থেকে হকার উচ্ছেদ ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। সারা দেশ থেকে মানুষ কাজের সন্ধানে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোয় আসছে। কিন্তু এসব মানুষ শহরে এসে স্মার্ট আবাসন তো দূরের কথা, ন্যূনতম মানসম্মত আবাসনও পাচ্ছে না। আপনারা হয়তো দেখেছেন, অনেক রিকশাচালক ঢাকা শহরে মাচার ওপর থাকেন। এটাই বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতা।

স্মার্ট আবাসন ও টেকসই নগরায়ণের কথা বলতে গেলে আবাসন, পরিবহন, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো সামনে আসে। এসব সুবিধা একটি শহরে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সেখানকার মানুষের জীবন স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়। স্মার্ট আবাসন মানে শুধু ভালো থাকার একটি জায়গা নিশ্চিত করা নয়; এর সঙ্গে মানুষের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সব নাগরিক সুবিধা যুক্ত।

সাম্প্রতিক বিশ্ব বসতি দিবসে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আবাসনের মাধ্যমে জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। তিনি কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার কথাও বলেছেন। প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কল্যাণের ধারণার সঙ্গে আবাসনের ধারণার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের আয় এবং শহরের অর্থনীতি ও সমাজে তিনি কতটুকু অবদান রাখছেন, তা বিবেচনায় নিয়ে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শহরগুলোর মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও বলেছেন। এ পরিকল্পনায় কোথায় নগর গড়ে উঠবে, শহরের আয়তন কত হবে এবং কোনদিকে এর সম্প্রসারণ ঘটবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থানিক পরিকল্পনা বা স্পেশাল প্ল্যানিং। সারা দেশের জন্য সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে নগরায়ণকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে হবে। কোন শহরে আয়তন অনুযায়ী কত মানুষ বসবাস করবে, জনঘনত্ব কেমন হবে এবং শহরের আকার ও কাঠামো কী হবে—এসব বিষয়ও পরিকল্পনায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। টেকসই নগরায়ণ ও স্মার্ট আবাসন নিশ্চিত করার সঙ্গে এসব পরিকল্পনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

সরকারের এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য সহায়ক বলে আমরা মনে করি। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিভিন্ন সরকারের আমলেই এমন আশাব্যঞ্জক পরিকল্পনার কথা শোনা গেছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আমরা সারা দেশের জন্য কার্যকর সমন্বিত পরিকল্পনা গড়ে তুলতে পারিনি।

এ পর্যন্ত একাধিক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার জন্য মহাপরিকল্পনা, স্ট্রাকচার প্ল্যান ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন হয়নি। এর অন্যতম কারণ, আমরা যা বলি, তা করি না, বরং বিভিন্নভাবে পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুত হয়েছি। কখনো নিজেরা বিচ্যুত হয়েছি, কখনো মানুষের চাপের মুখে, আবার কখনো ব্যবসায়ী বা বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপে পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী যেখানে যে ধরনের উন্নয়ন হওয়ার কথা, সেখানে তা হয়নি। যেখানে শিল্প এলাকা গড়ে ওঠার কথা, সেখানে শিল্পের জন্য নির্ধারিত প্লট ফাঁকা পড়ে আছে। অন্যদিকে শহরের মাঝখানে আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছে, কৃষিজমি ও জলাভূমি ভরাট করে আবাসন এবং শিল্প-কারখানা নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে।

আবাসন ও শহরকে স্মার্ট করে তুলতে হলে প্রথম শর্তই হলো পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে। নগর কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পিত উপায়ে আবাসন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশও ঘটাতে হবে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো অর্থনীতি ও আবাসনের মধ্যে যে সংযোগ থাকা প্রয়োজন, তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমরা পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সরকারি নীতিনির্ধারণ—দুই ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছি। আগে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দেখা যেত, সরকার শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থাও করত। ফলে শ্রমিকরা কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকতে পারতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শিল্পায়নের বড় অংশ বেসরকারি খাতে চলে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত কারখানা নির্মাণ ও উৎপাদন কার্যক্রমেই মনোযোগ দিয়েছে। শিল্পের বিকাশের সঙ্গে আবাসনের চাহিদার যে সম্পর্ক রয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়নি। অন্যদিকে সরকারও সেই চাহিদা অনুযায়ী আবাসন গড়ে তোলেনি। এর ফলে পোশাক শ্রমিক, অন্যান্য শিল্প শ্রমিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের জন্য নগর এলাকায় পর্যাপ্ত আবাসন গড়ে ওঠেনি।

শহরের ৩০-৪০ শতাংশ মানুষ মানসম্মত আবাসন সুবিধার বাইরে রয়েছে। তাদের অনেকে বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করছেন। এতে নগর এলাকার আবাসন সংকট আরো বেড়েছে। টেকসই নগরায়ণের ক্ষেত্রে এটি আমাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অনানুষ্ঠানিক, সেবামূলক ও শিল্প খাতে কর্মরত মানুষের চাহিদা অনুযায়ী আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অথচ শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাধ্যমে যত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও আবাসনের সক্ষমতার মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় গড়ে তুলতে না পারার কারণেই নগরায়ণে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।

স্মার্ট আবাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবস্থা, ইন্টারনেট অব থিংসসহ (আইওটি) বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি পরিকল্পনার মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আবাসন, শহর ও সামগ্রিক নগর কাঠামো নিয়ে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ছাড়া শুধু প্রযুক্তির প্রয়োগে স্মার্ট আবাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অতীতে আমরা পরিকল্পনার এসব মৌলিক বিষয়কে যথাযথ গুরুত্ব দিইনি।

স্মার্ট আবাসনের ছয়টি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, আবাসন হতে হবে সাশ্রয়ী, অর্থাৎ মানুষের আয় ও আবাসন ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবাসন হতে হবে নিরাপদ। ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ভবন ও বসতি নির্মাণ করতে হবে। তৃতীয়ত, আবাসন হতে হবে পরিবেশবান্ধব। জ্বালানি ও পানির ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সংরক্ষণ করতে হবে সবুজ এলাকা ও জলাধার। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধার পরিকল্পনাও আবাসন পরিকল্পনার সমন্বিত অংশ হতে হবে।

চতুর্থত, আবাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেবার কার্যকর সংযোগ থাকতে হবে। বাসস্থান থেকে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, বাজার ও গণপরিবহনে সহজে যাতায়াতের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, আবাসন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, নিম্ন আয়ের মানুষ ও ভাড়াটিয়াসহ সব জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আবাসননীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ষষ্ঠত, আবাসন হতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর, তবে মানুষকেন্দ্রিক। এজন্য উন্নত প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিআইএস), ডিজিটাল ভূমিতথ্য, স্মার্ট মিটার, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থা, অনলাইন সেবা এবং তথ্য-উপাত্তভিত্তিক পরিকল্পনার ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও এ-সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যক্রমেও প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

প্রযুক্তি কখনো মানুষের প্রয়োজনের বিকল্প হতে পারে না। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং প্রতিবেশীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির গুরুত্বও বজায় রাখতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার এমন কোনো নগর কাঠামো তৈরি করতে পারে না, যা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের স্বাভাবিক পরিসর সংকুচিত করে। একই সঙ্গে আবাসনে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস পাওয়ার মৌলিক অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আবাসন ও নগর পরিকল্পনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আবাসনের চাহিদা বিবেচনা না করে ইচ্ছামতো শিল্পায়ন করা যাবে না। একইভাবে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের পর খেলার মাঠ, পার্ক বা উন্মুক্ত জায়গার অভাবের কথা বলাও গ্রহণযোগ্য নয়। আবার জলাশয় ও জলাধার ধ্বংস করে পরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার পরিকল্পনা নেয়াও টেকসই পদ্ধতি হতে পারে না।

আবাসনকে নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। নগর পরিকল্পনার মৌলিক কাঠামোয় সবুজ এলাকার জন্য ২৫ শতাংশ, জলাশয় ও জলাধারের জন্য ১০-১৫ শতাংশ এবং সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ২০-২৫ শতাংশ জায়গা রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। বাকি ৪০-৫০ শতাংশ জায়গা ভবন ও অন্যান্য নির্মিত অবকাঠামোর জন্য রাখা যেতে পারে। নগর পরিকল্পনায় এ মৌলিক ভারসাম্য বজায় রেখেই আবাসন ও সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে।

পরিকল্পনার প্রতিটি উপাদান—আবাসন, যোগাযোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা টেকসই হতে হবে। টেকসই ব্যবস্থার অর্থ হলো সেখানে সম্পদ ও জ্বালানির ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী ও কার্যকর হতে হবে।

আবাসন বলতে শুধু ভবনকে বোঝায় না; ভবনটিকেও টেকসই হতে হবে। ভবনের ভেতরে স্মার্ট প্রযুক্তি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তবে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের প্রবেশ বন্ধ করে ভবনকে পুরোপুরি জেনারেটর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কিংবা কাচঘেরা কাঠামোনির্ভর করে জ্বালানিসাশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, বরং ভবনের নকশা ও পরিকল্পনায় এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে এবং কৃত্রিম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমে। এজন্য ভবনগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব, আলো-বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত সুযোগ এবং মৌলিক পরিকল্পনা ও নির্মাণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

আবাসন তাই শুধু বাড়ির চটকদার নকশার বিষয় নয়। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব, কর্মস্থলে যেতে কত সময় লাগে, হাঁটার উপযোগী ফুটপাত আছে কিনা, কাছাকাছি গণপরিবহন পাওয়া যায় কিনা, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে কিনা—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে শিশুদের হাঁটা দূরত্বে খেলার জায়গা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে কিনা, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

জরুরি পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারবে কিনা, অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় মানুষ নিরাপদে ভবন থেকে বের হতে পারবে কিনা তা নিশ্চিত করাও জরুরি। বাংলাদেশে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবন থেকে মানুষকে উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরু রাস্তার পাশে বড় বড় ভবন নির্মাণের ফলে অনেক ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে না। পৌঁছতে পারলেও উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত ক্রেন ঘোরানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। অল্প জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে উঁচু ভবন নির্মাণের কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তাই আবাসন ও নগর পরিকল্পনায় এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে হবে এবং পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরতে চাই।

প্রথমত, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। পুরো শহর এলাকার জন্য এমন আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ভবন নির্মাণ করা হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য উন্নয়নযোগ্য জমির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পরিকল্পিতভাবে জমির জোগান বাড়ানো প্রয়োজন।

পাশাপাশি ভাড়াভিত্তিক আবাসন, সামাজিক ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে ভূমি ব্যাংকিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র মানুষের জন্য যদি জমি বরাদ্দ রাখা না যায় তাহলে বাজার থেকে তাদের জন্য জমি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে ভূমি ব্যাংকিং নিশ্চিত করতে হবে এবং দরিদ্র মানুষের চাহিদা অনুযায়ী আবাসন গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আবাসনের সঙ্গে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যে পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সময় শ্রমিকদের আবাসনের বিষয়টিও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একইভাবে শহরের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আবাসনের চাহিদা সমন্বয় করতে হবে।

তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনার মৌলিক বিষয়গুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু মহাপরিকল্পনা, স্ট্রাকচার প্ল্যান বা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান প্রণয়ন করলেই হবে না; সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কৃষিজমি, জলাভূমি, সবুজ এলাকা ও জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে। আবাসন, পরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভবন নির্মাণবিধি এবং পরিকল্পনার নির্ধারিত মানদণ্ড মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, সারা দেশে ভারসাম্যপূর্ণ নগরায়ণ নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ যদি শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা অন্যান্য বড় শহরে আসতে থাকে তাহলে শুধু আবাসনের সরবরাহ বাড়িয়ে এ সংকটের সমাধান করা যাবে না। দেশের অন্যান্য শহরকেও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে।

চট্টগ্রামের বাইরে ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর ও সিলেটের মতো বিভাগীয় শহর রয়েছে। কুমিল্লার মতো বড় শহরও রয়েছে। এসব শহরকে উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে সেগুলো টেকসইভাবে বিকশিত হবে এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের ওপর জনসংখ্যার চাপও কমবে। এর ফলে সারা দেশের জন্য স্থানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ নগরায়ণের যে লক্ষ্য আমরা নির্ধারণ করছি, তা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।

আমরা আশা করি, বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই এ পথে যাত্রা শুরু করে, তাহলে স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ এবং টেকসই বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান: অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[বণিক বার্তা আয়োজিত স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]