বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড-এআরটি) স্বাক্ষরিত হয় ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। সেটিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিনদিন আগে। এর আগে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এ ধরনের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা বাতিল করলে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন আইনি ভিত্তিতে ১০ শতাংশ হারে শুল্ক কার্যকর করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত এআরটি চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য শুল্কহার ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর থেকেই এর বিভিন্ন শর্ত নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। উপরন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এ চুক্তি করার ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ চুক্তি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের গোপনীয়তাও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন চুক্তিটির পুনর্মূল্যায়ন বা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে।
৩২ পৃষ্ঠার এ চুক্তিতে ছয়টি ধারা রয়েছে। তবে চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তার উল্লেখ রয়েছে শেষ অংশে। প্রথমে যে বিষয় সবার নজরে আসে তা হলো এ চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে মানতে হবে ১৩১ শর্ত আর যুক্তরাষ্ট্রকে মাত্র ছয়টি। এর মানে এটি পুরোপুরি অন্যায্য চুক্তি যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও বাণিজ্যিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে। প্রাথমিকভাবে এ বাণিজ্যচুক্তিতে কিছু পারস্পরিক সুবিধার কথা বলা হলেও চুক্তির বেশির ভাগ শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও বিনিয়োগগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্ধারিত পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করবে, প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজ এবং শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে সহযোগিতা করবে। এছাড়া চুক্তি মানা হলে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ না করার এবং বিদ্যমান এমএফএন (মোস্ট ফেভার্ড নেশনস) শুল্কহার বহাল রাখার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এসব দিক বাংলাদেশী রফতানিকারকদের জন্য কিছুটা ইতিবাচক হতে পারে। তবে চুক্তির শর্তগুলোর মধ্যে এমন কয়েকটি বিষয় রয়েছে যা বাংলাদেশের স্বার্থকে মাত্রাধিক সীমাবদ্ধ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশী বাজারে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা আছে। এর মানে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা মার্কিন ছকে বাঁধা পড়তে পারে। যেভাবে এ দেশের কৃষি ব্যবস্থা এতকাল ভারতের ছকে বেঁধেছিল। এরপর বলা হয়েছে, শুধু বাণিজ্য ঠেকানোর জন্য নিয়ম করা যাবে না। এ থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশ বাণিজ্য ঠেকানোর নিয়ম করার স্বাধীন নীতি প্রয়োগ করতে পারবে না। এরপর বলা হয়েছে, এমন নিয়ম করা যাবে না যাতে মার্কিন পণ্য অন্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এটি স্পষ্ট দেশীয় সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বৈদেশিক কূটনীতিকে মার্কিন নীতির কাছে বন্ধক দেয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
এছাড়াও চুক্তিতে বলা আছে, বাংলাদেশকে মেধাস্বত্ব সুরক্ষাসংক্রান্ত ২১টি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগ দিতে হবে। এর মাধ্যম ওষুধ, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ব্যয় ও নীতিগত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হবে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কোন চুক্তিতে যোগ দেবে কোন চুক্তিতে যোগ দেবে না, তা মার্কিন নির্দেশে চলবে কেন? একইভাবে চুক্তি বলছে, ডিজিটাল সেবা খাতে মার্কিন কোম্পানির বিরুদ্ধে ‘বৈষম্যমূলক’ কর আরোপ করা যাবে না। এতে করে বাংলাদেশ নিজস্ব ডিজিটাল অর্থনীতি বা দেশীয় প্রযুক্তি খাতকে সুরক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে নীতিগত স্বাধীনতা হারাবে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে এমন বিবেচনায় অন্য বাজার অর্থনীতির দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি করা যাবে না। এ শর্ত মানা হলে মার্কিন নীতিদাসত্বকে বরণ করা হবে। বাংলাদেশের স্বাধীন বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি হবে কল্পনার বাইরে।
চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে যে খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে মার্কিন বিনিয়োগ সহজ করতে হবে এবং তেল-গ্যাস, বীমা ও টেলিযোগাযোগে বিদেশী মালিকানার সীমা শিথিল করতে হবে। ফলে দেশের জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত খাতে মার্কিন বিনিয়োগ নিতে বাধ্য করা হবে। এটি স্পষ্টত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মৌলিক নীতির লঙ্ঘন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বাণিজ্য নীতিতে বলা হয়েছে, এ সংস্থার প্রত্যেক সদস্যকে অবশ্যই বিশ্ববাজারে সমান প্রবেশাধিকার দিতে হবে এবং দেশীয় ও বিদেশী উভয় সরবরাহকারীর সঙ্গে সমান আচরণ করতে হবে। অথচ এ চুক্তি মানা হলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। এ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যেমন পেট্রোবাংলা (বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন) ও বাপেক্স (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড) আরো বেশি অকার্যকর হয়ে পড়বে। এতে করে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও সেবা খাতের ওপর রাষ্ট্রের প্রভাব অতি দুর্বল হবে, মার্কিন প্রভাব মাত্রাধিক হারে বেড়ে যাবে; এমনকি জাতীয় সম্পদের ওপর বিদেশী প্রভাব আরো বেড়ে যাবে। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারিক দিক আরো বেশি মাত্রায় বিদেশী করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সম্ভাবনা সেটিও হুমকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে মার্কিন বীমা কোম্পানির জন্য ৫০ শতাংশ রিইন্স্যুরেন্সের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার শর্ত মানা হলে দেশীয় বীমা শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বাংলাদেশকে ভর্তুকি ও বিদেশী বিনিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে, কিন্তু বাংলাদেশ মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রযুক্তি, সোর্স কোড বা গোপন তথ্য চাইতে পারবে না। এ শর্ত কোনোভাবেই মানা যাবে না। কেননা বিশ্বায়নের এ যুগে তথ্য যেখানে পুঁজি সেখানে তথ্যের অধিকার বাংলাদেশের থাকবে না, আমেরিকার থাকবে। এতে তথ্যপ্রাপ্তির ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে এবং প্রযুক্তির ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে। এটি চরমভাবে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ এমনকি বৈষম্যমূলক। একইভাবে এফডিএ অনুমোদিত চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধ গ্রহণের শর্ত মানা হলে মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ শিল্পের বাজার সম্প্রসারণ হবে, তেমনি বাংলাদেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মূলত এ চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি আরো দুর্বল হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, এ চুক্তিতে বাংলাদেশ কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা পেলেও অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, ডিজিটাল বাণিজ্য, মেধাস্বত্ব, বাজার প্রবেশাধিকার এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা, কৌশলগত খাতের নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন বাণিজ্যনীতি পরিচালনার সুযোগ বাধাপ্রাপ্ত হবে। তবে এসব সম্ভাব্য প্রভাব বাস্তবে আরো প্রকট হতে পারে। কেননা মার্কিন নীতি শুধু লিখিত চুক্তির আলোকে চলে না, অদৃশ্য একটা ‘শক্তি’ এখানে কাজ করবেই। তা হলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ‘শক্তি’।
এখন করণীয় কী? এআরটি বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে হবে নাকি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে যেকোনো পক্ষ লিখিত নোটিসের মাধ্যমে চুক্তি বাতিল করতে পারবে, যা ৬০ দিন পর কার্যকর হবে। একইভাবে উভয় পক্ষ নিজ নিজ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে চুক্তিটিও ৬০ দিন পর কার্যকর হবে। এর মানে চুক্তি বাতিল বা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। পুনর্মূল্যায়ন করতে হলে সরকারিভাবে ধাপে ধাপে আরো কূটনৈতিক বৈঠক করতে হবে। চুক্তিটি এমনভাবে সংশোধন করতে হবে যাতে উভয় দেশের জন্য সমান অধিকার, সমান দায়িত্ব ও পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত হয়। কোনো শর্তই যেন একতরফাভাবে বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি না করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ যাতে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করতে পারে, সেই নীতিগত স্বাধীনতা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি, খনিজ, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ও অবকাঠামোর মতো কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি থাকতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হলেও জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। এসব খাতে বিদেশী মালিকানার সীমা নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখার বিধান যুক্ত করতে হবে।
এছাড়া দেশীয় শিল্প, বিশেষ করে নবীন শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় শুল্ক, ভর্তুকি ও নীতিগত সহায়তা প্রদানের অধিকার দিতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, গবেষণা সহযোগিতা এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা যুক্ত করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ শুধু বাজার হিসেবে নয়, প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম অর্থনীতিতেও পরিণত হতে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে ডিজিটাল সেবা কর আরোপ, দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও স্টার্টআপ শিল্পকে সুরক্ষা এবং তথ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার যেন প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করতে পারে, সেই সুযোগ চুক্তিতে রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত তথ্য ও নিয়ন্ত্রক তদারকির ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মেধাস্বত্বের বিধান এমনভাবে প্রয়োগ করতে হবে যাতে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং দেশীয় ওষুধ শিল্পের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আন্তর্জাতিক নিয়মে যে জনস্বার্থভিত্তিক নমনীয়তা রয়েছে, বাংলাদেশ যেন তা ব্যবহার করতে পারে এবং অতিরিক্ত কঠোর মেধাস্বত্বের শর্তের কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধ বা প্রযুক্তির প্রাপ্যতা বাধাগ্রস্ত না হয়, তা চুক্তির মধ্যে থাকতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ যদি বিনিয়োগ, ভর্তুকি বা বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রদান করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকেও একইভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময় করতে হবে। অর্থাৎ তথ্য আদান-প্রদান একমুখী নয়, বরং পারস্পরিক ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা রাখতে হবে। কোনো বিরোধ দেখা দিলে একতরফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে যৌথ আলোচনা, মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতি দুই বছর অন্তর চুক্তির কার্যকারিতা যৌথভাবে পর্যালোচনার বাধ্যতামূলক বিধান রাখা উচিত।
বাংলাদেশের এলডিসি-উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা ও পর্যাপ্ত রূপান্তরকাল নিশ্চিত করতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্য উন্নত বাজার সুবিধা ও সহজ বাজারপ্রবেশের সুযোগ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশের রফতানি আরো বৈচিত্র্যময় ও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য বা জরুরি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যেন সাময়িকভাবে প্রয়োজনীয় নীতিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, সেই অধিকার চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এর ফলে বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা সহজ হবে। চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংসদীয় পর্যালোচনা এবং ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পপতি, শ্রমিক প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের মতামত অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা রাখা দরকার। এতে চুক্তিটি আরো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
যদি এ চুক্তি উপরোক্ত বিষয়াদির আলোকে সংশোধিত না হয়, তাহলে চুক্তি বাতিল করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বৈদেশিক বাণিজ্যের নতুন গতিপথ ঠিক করবে। বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্যের দিগন্ত এতটা সংকুচিত নয় যে, ভারত বা আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। চীন, রাশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির পথ উম্মুক্ত আছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এ দেশ কোনো বিদেশী শক্তির আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে পারে না। আমরা চাই চুক্তির ন্যায্যতা ও দেশের জনগণের অধিকারের নিশ্চয়তা। সরকার এক্ষেত্রে যথেষ্ট বিজ্ঞতার পরিচয় দেবে এমনটিই কাম্য।
ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়










