দেশে সারের সংকট নতুন কিছু নয়; দীর্ঘদিনের। এর পরও সংকট দূর না হয়ে বরং ক্রমেই তীব্র হতে দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে ভূরাজনৈতিক কারণ যেমন দায়ী, তেমনি স্থানীয় উৎপাদনে মনোযোগ না দিয়ে আমদানিনির্ভরতারও দায় রয়েছে। দেশে সারের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়, যার বড় একটি অংশ আসে সৌদি আরব থেকে। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে সার আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। আবার দেশে গ্যাস ও কাঁচামালের অভাবে অনেক সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল সার সরবরাহ হচ্ছে। তবে এটিই একমাত্র সংকট যে নয়, তা বণিক বার্তার বহু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বরং এটি একটি মৌলিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যা থেকে অন্যান্য সংকটের উদ্ভব ঘটেছে।

সার আমদানি বা উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কাঠামোগত সংকটের একটি অংশ। কিন্তু এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাজারে ভেজাল সার-কীটনাশক ও এগুলো তৈরির কারখানা পাওয়া যাচ্ছে, সেটি স্পষ্টতই ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের অভিযানে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। কোথাও চুন, সিমেন্ট, সিরামিক মাটি ও বিভিন্ন রাসায়নিক দিয়ে সার তৈরি হচ্ছে, কোথাও আবার ভেজাল পণ্য নামিদামি প্রতিষ্ঠানের মোড়কে বাজারজাত করা হচ্ছে। কেরানীগঞ্জ, সাতক্ষীরা, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নেত্রকোনা, ফেনী ও মানিকগঞ্জে সাম্প্রতিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল সার-কীটনাশক, কাঁচামাল ও সরঞ্জাম জব্দ হয়েছে। শুধু কারখানা বা গুদামে অভিযানেই নয়, বাজার থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষাতেও সাতটি কোম্পানির সারে ভেজাল পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে মানিকগঞ্জ কৃষি বিভাগ। এ পরিস্থিতি কেবল নিয়মিত প্রশাসনিক অভিযানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। এসব কারখানার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা প্রয়োজন। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই তৎপর হতে হবে।

তাছাড়া বর্তমান ভেজাল সারের পরিস্থিতি একটি গুরুতর আশঙ্কার সংকেত দিচ্ছে। সারের সংকট যতদিন থাকবে, ততদিন তা কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে সার উৎপাদন ও বাজারজাতের প্রবণতা বাড়বে বৈ কমবে না। ফলে ভেজাল কারখানা বন্ধ করা এখন কৃষি উপকরণের মান বজায় রাখার পাশাপাশি সারের বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনারও বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সবচেয়ে জরুরি হলো অবৈধ কারখানাগুলো পুরোপুরি বন্ধ করা এবং নতুন চক্র যেন গড়ে না ওঠে সেটি নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। ভেজাল সার উৎপাদনে ইতি টানতে না পারলে তা বাজারে এর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা আরো কঠিন হয়ে উঠবে।

আবার দেশে মজুদকৃত সারের তুলনায় কম সরবরাহ তথা কৃত্রিম সংকট তৈরি করার অভিযোগও রয়েছে। যেমন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির বরাদ্দ-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া সারের চাহিদার বিপরীতে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, যশোর ও মাগুরায় পুরো বরাদ্দই দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে কৃষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রত্যাশিত পরিমাণ ও সরকারি নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। যদিও সরকার দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুদ আছে বলে বারবার দাবি করছে এবং ডিলাররা কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করছেন। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জেলায় এমন চিত্র দেখা গেছে।

এমনকি সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকরা জোট বেঁধে ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে কেজি কেজি সারের বস্তা নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া স্থানীয় ডিলারদের কাছে চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ায় ও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাজারে সারের অতিরিক্ত দামের কারণে কৃষকরা মহাসড়ক অবরোধ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। উপরন্তু বর্তমান বাজারে ভেজাল সার-কীটনাশক পাওয়ার প্রমাণ মিলছে। এতে সামগ্রিকভবে এটিই প্রমাণ হচ্ছে যে দেশে সারের উৎপাদন সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অব্যবস্থাপনা, অসাধু চক্রের সক্রিয়তা। এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে মাঠপর্যায়ে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

সার এমন একটি কৃষি উপকরণ, যা কৃষি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উৎপাদন মৌসুমগুলোয় যথাসময়ে পরিমিত পরিমাণে সার প্রয়োগ করা না হলে প্রত্যাশিত ফসল পাওয়া যায় না। এমনকি সার-কীটনাশক যদি ভেজালযুক্ত হয় তাহলেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। আর কম ফলন হওয়া কেবল কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। এটি পুরো কৃষি খাতের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায়। অনেক ক্ষেত্রে বাজারদর অস্থিতিশীল হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকে বহন করতে হয়।

প্রশ্ন হলো, কৃষিতে প্রতি বছরই কেন সার সরবরাহে এমন সংকট হচ্ছে এবং তা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না? উৎপাদন মৌসুম, জমির পরিমাণ, সম্ভাব্য চাহিদা এবং আমদানি-উৎপাদনের সক্ষমতা সম্পর্কে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পর্যাপ্ত তথ্য থাকার কথা এবং সরকারের পক্ষ থেকে সারের সংকট না থাকার দাবিও করা হচ্ছে তাহলে চাহিদার সময় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে কেন? কাগজের তথ্যের চেয়ে মাঠের কৃষকের ভোগান্তিতে বাস্তবতা বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে। এটি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, আইনের কার্যকর প্রয়োগের অভাবকেই নির্দেশ করছে। একদিকে সরকার এ ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না, সার বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হচ্ছে না, অন্যদিকে ভেজাল সারের কারখানা গড়ে উঠছে, বাজারে ভেজাল সার পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ যেখানে সরকারের পক্ষ থেকে সমন্বিত উদ্যোগে সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণ করা প্রয়োজন ছিল, সেখানে অসাধু চক্রের সম্মিলিত এক অব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে বর্তমানে সারের অপ্রতুল স্থানীয় উৎপাদন অপেক্ষা অব্যবস্থাপনাই যেন কৃষকদের জন্য বড় ভোগান্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার সম্প্রতি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ১১ লাখ টন সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এটা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিবাচক। তবে স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে না পারলে আমদানি বা উৎপাদন বাড়িয়েও সারের সরবরাহ সংকট ও ভেজাল সারের বিপনণ ঠেকানো যাবে না। কৃষকের ভোগান্তিও কমবে না।