এভিয়েশন খাতকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি বা ভূরাজনৈতিক—এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এর পরিপ্রেক্ষিতে ও নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত কোন দিকে এগিয়ে নেয়া উচিত, সে বিষয়ে কথা বলব।
উড়োজাহাজের সবচেয়ে বেশি চাহিদা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে, কিন্তু বেশি এয়ারক্রাফট তৈরি করে পশ্চিমারা। আমরা জনসংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ। জনগণের সেবার জন্য হলেও আমাদের এ খাতে নজর দেয়া উচিত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান রয়েছে। চীনে উড়োজাহাজের চাহিদা ৮ হাজার ২২০টি, যেখানে উত্তর আমেরিকার চাহিদা ৬ হাজার ৪২০টি। এর অর্থ হলো, বাণিজ্য ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বিষয়টি জাতীয় স্বার্থে আমাদের নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
পুরনো উড়োজাহাজগুলো ধীরে ধীরে অবসরে যাবে। ২০৪০ সালের মধ্যে নতুন উড়োজাহাজের প্রয়োজন হবে। একই সময়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আকাশপথে কার্গো পরিবহন দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি যাত্রীর সংখ্যা বছরে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়বে। এ অঞ্চল বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫ শতাংশের আবাসস্থল। আর এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চালক হলো চীন ও ভারত। তবে ভিয়েতনামের মতো দেশও এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০৪০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের অর্থনীতি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভ্রমণে আগ্রহী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংখ্যা ১১০ কোটি থেকে বেড়ে ৩২০ কোটিতে উন্নীত হতে পারে। একই সঙ্গে ভ্রমণের প্রবণতাও প্রায় তিন গুণ বাড়তে পারে। এ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। দক্ষ জনবল তৈরির দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
২০২৫ থেকে ২০৪৫ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় সাত লাখ পাইলট, ৭ লাখ ২৮ হাজার উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী এবং প্রায় ১০ লাখ কেবিন ক্রুর প্রয়োজন হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর ভারতের প্রয়োজন হবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার পাইলট। আর বাংলাদেশের প্রয়োজন হতে পারে বছরে ৭০-১০০ পাইলট। ভারতে প্রতি বছর ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীর প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশের জন্য কতজনের প্রয়োজন, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই। ফলে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের সবচেয়ে বড় সংকট উড়োজাহাজ নয়; দক্ষ জনবলের অভাব মনে করি।
বাংলাদেশের পাইলট প্রশিক্ষণের পরিস্থিতির দিকে লক্ষ করি। এয়ারলাইনসগুলোর নতুন পাইলটের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দেশে পাইলট প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি রয়েছে। সেটি অর্থনৈতিক সংকটে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারছে না। সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পাইলট তৈরির সক্ষমতা নেই। গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমিতে বর্তমানে তিনটি উড়োজাহাজ সচল রয়েছে। এসব উড়োজাহাজের মাধ্যমে বছরে মাত্র দুজন পাইলট প্রশিক্ষণ নিয়ে তৈরি হতে পারেন। পাশাপাশি আরাং ফ্লাইং স্কুলের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে পাইলটের চাহিদা বাড়লেও সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির সক্ষমতা দেশে নেই। এ কারণে দেশের পাইলট প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
অর্থাৎ আমাদের পাইলট প্রশিক্ষণ সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এর সমাধানে সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতির প্রয়োজন। উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী তৈরির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশে সনদপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর তীব্র সংকট রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়াটাও সময়োপযোগী নয়। এছাড়া পর্যাপ্ত একাডেমিক অবকাঠামোর অভাব, জনবল নিয়োগের প্রতিবন্ধকতা, আধুনিকায়ন পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা—সব মিলিয়ে এক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এভিয়েশন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরির পরিবেশ নিশ্চিত করা; এটিও তাদের দায়িত্বেরই অংশ। তবে এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি এ বিষয়ে কাজ করছে। তারা এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ারিং মেইনটেন্যান্সের ওপর বিএসসি কোর্স চালু করেছে। এটা দেশের জন্য ভালো খবর। এছাড়া বাংলাদেশ এয়ারলাইনস অ্যালায়েন্স ট্রেনিং সেন্টারে বিশেষায়িত মডিউলার ও টাইপ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও টেকনিশিয়ান তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করছে। এছাড়া রয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির নিয়ন্ত্রক ও পরিদর্শকদের একটি নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে—প্রতি বছর এভিয়েশন শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্তসংখ্যক উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী তৈরি হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করা।
আমাদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এভিয়েশনকে ঘিরে প্রয়োজনীয় সংস্কৃতি বা ‘এভিয়েশন মাইন্ডসেট’ এখনো তৈরি না হওয়া। একটি তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের জিডিপিতে এভিয়েশন খাতের অবদান খুবই কম। ভিয়েতনাম ও শ্রীলংকা এক্ষেত্রে খুব ভালো করছে। আমাদেরও এদিকে নজর দিতে হবে। আমাদের স্থানীয় এয়ারলাইনসগুলো চাহিদার ২০-৩০ শতাংশ পূরণ করে। বাকি চাহিদা পূরণে করছে বাইরের দেশগুলো। এতে দেশের টাকা চলে যাচ্ছে, অথচ এ অর্থ আমরা নিজেদের দেশে রাখতে পারতাম।
দেশের আকাশপথে যাত্রী পরিবহন বাজারের বর্তমান আকার প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৮ সালের মধ্যে দেশের বিমান পরিবহন খাত ১৬৮ শতাংশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ হতে পারে। এতে অতিরিক্ত ১ কোটি ২১ লাখ থেকে তিন কোটি পর্যন্ত যাত্রী আকাশপথে যাতায়াত করতে পারে। এতে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ খাতের প্রবৃদ্ধির ফলে দেশের জিডিপিতে ২১০-৩২০ কোটি ডলার যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দুই-চার লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের হাতে সময় আছে প্রায় ১২ বছর। তাই এখনই বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে যে পরিমাণ যাত্রী আমাদের বিমানবন্দর ব্যবহার করবেন, তাদের আগমন ও প্রস্থানের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত অবকাঠামো আছে কিনা। এর উত্তর হলো—না। এ চাহিদা পূরণ করা গেলে বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রায় ২ দশমিক ১ থেকে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অবদান রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দুই থেকে চার লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০২৫ সালে মোট যাত্রীসংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৩ সালে ১ কোটি ১৭ লাখ। অর্থাৎ যাত্রীসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাত্রীসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিমানবন্দরের অবকাঠামোও কি একইভাবে উন্নত হয়েছে?
২০২৫ সালে অভ্যন্তরীণ রুটে প্রায় ২৪ লাখ ১০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেছেন। আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিলেন প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ১০ হাজার। ঢাকার দৈনিক গড় হিসাবেও দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ যাত্রী প্রায় সাত থেকে আট হাজার, আর আন্তর্জাতিক যাত্রী প্রায় ৩০ হাজার। মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে এভিয়েশন যে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, এটি তারই প্রতিফলন।
ভবিষ্যতে এভিয়েশনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে এয়ারলাইনসগুলোও তাদের রুট ও বহর সম্প্রসারণ করছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২০৩৭ সালের মধ্যে লিজ নেয়া উড়োজাহাজসহ তাদের বহর সংখ্যা ১৯-২৯টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে এবং ২০৩৫-৪১ সালের মধ্যে বহর সংখ্যা ৪৭টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নিয়েছে এবং লিজিংয়ের মাধ্যমে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এটি অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত। তবে এ ধরনের উদ্যোগ সফল করতে আমাদের সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।
নভোএয়ার তাদের বহরে আরো তিনটি লিজ নেয়া উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এয়ার অ্যাস্ট্রা যুক্ত করবে আরো দুটি। অর্থাৎ বিমান, ইউএস-বাংলা, এয়ার অ্যাস্ট্রা ও নভোএয়ার—এ চার এয়ারলাইনস ২০২৭ সালের মধ্যে মোট প্রায় ৪০টি লিজ নেয়া উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে তাদের সম্মিলিত বহর ৫১টি থেকে বেড়ে ৯১টিতে দাঁড়াবে। কিন্তু এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু উড়োজাহাজ বা অবকাঠামো নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বলতে আমি পরিচালনাগত ও কার্যকর দক্ষতাকে বোঝাচ্ছি। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও দলগত সমন্বয়—তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নেতৃত্বের সংকট এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাবে আমরা এখনো একটি কার্যকর এভিয়েশন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারিনি।
আমি বিষয়টিকে একটি ষড়ভুজ কাঠামোর মতো দেখি। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ—পাইলট, টেকনিশিয়ান, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এবং এভিয়েশন ও নন-এভিয়েশন পেশাজীবী সবাই এর অংশ।
দ্বিতীয়ত, শিল্প খাত—সহজ ভাষায় বললে বোয়িং, এয়ারবাস, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। যারা উড়োজাহাজ তৈরি করে এবং যারা সেগুলো পরিচালনা করে, সবাই এ শিল্পের অংশ।
তৃতীয়ত, অবকাঠামো—বিমানবন্দর, টার্মিনাল, রানওয়ে ইত্যাদি। আমরা যদি ধরে নিই যে ২০৪১ সালের জন্য যে যাত্রীসংখ্যার পূর্বাভাস আমি আপনাদের দিয়েছি, তা সঠিক হবে, তাহলে আমাদের আরেকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রয়োজন হতে পারে। অন্যথায় বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্প একসময় সক্ষমতার সীমায় গিয়ে আটকে পড়বে।
চতুর্থত, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এতদিন আমরা উদ্যোক্তাদের এভিয়েশন শিল্পের অংশ হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি। অথচ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, সেবাদাতা ও বিনিয়োগকারীরাও এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পঞ্চমত, একাডেমিয়া। যেমন এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। আমি এখানে পড়াই বলে বিষয়টি বলতে পেরে আনন্দিত যে সম্ভবত এই প্রথম কোনো একাডেমিশিয়ানকে জাতীয় স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য এভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ট্রেনিং সেন্টারসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানও এ কাঠামোর অংশ।
আর ষষ্ঠত, রয়েছে সেই প্রতিষ্ঠান, যা অপারেটর ও একাডেমিয়ার সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংযোগ তৈরি করে—বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইকাও ও ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতো সংস্থা।
ভৌত অবকাঠামোর দিকে তাকালেও আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। দেশে ১১টি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি বর্তমানে চালু আছে। ছয়টি বিমানবন্দর অচল অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে চারটি দেশের উত্তরাঞ্চলে এবং দুটি কুমিল্লা ও মৌলভীবাজারে।
কোনো অঞ্চলে একটি বিমানবন্দরের উন্নয়ন সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করে। উত্তরাঞ্চলও এর ব্যতিক্রম নয়। আমরা যদি উত্তরাঞ্চলকে জাতীয় উন্নয়নের মূল স্রোতের সঙ্গে আরো ভালোভাবে যুক্ত করতে চাই, তাহলে সেখানে থাকা বিমানবন্দরগুলোর উন্নয়ন ও পুনরায় চালুর বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। অবশ্য এরই মধ্যে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ অচল বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রাথমিক মূল্যায়ন করেছে বলে জেনেছি। এ বিষয়ে তাদের প্রাথমিক উদ্যোগ বগুড়া বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে এগোচ্ছে।
সর্বোপরি এভিয়েশন খাতের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। এ খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বেবিচককে চালকের ভূমিকা নিতে হবে। এটি একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও। তাই বৈশ্বিক এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি জাতীয় এভিয়েশন পরিকল্পনা ও কৌশলগত নির্দেশনা প্রণয়ন করতে হবে।
আইন, বিধি ও প্রবিধান এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে বেবিচক আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপের বাইরে থেকে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে। এছাড়া সিভিল এভিয়েশন-সংক্রান্ত বিধি প্রণয়নের সময় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ করতে হবে। এয়ার অপারেটর, এভিয়েশন ও নন-এভিয়েশন সেবাদাতা, একাডেমিয়া এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নিয়ে প্রতি বছর একটি এভিয়েশন সামিট আয়োজন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে এ খাত সম্পর্কে অংশীজনদের মধ্যে আরো ভালো বোঝাপড়া ও সমন্বয় তৈরি হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বোয়িংয়ের মধ্যে যে উড়োজাহাজ ক্রয়চুক্তি হচ্ছে, সেখানে শুধু উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি থাকলেই হবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সক্ষমতা তৈরির বিষয়টিও যুক্ত করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রয়োজনীয় ক্যাটাগরি অর্জন করে এবং বাংলাদেশী এয়ারলাইনসগুলো যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারে।
আমরা যদি বোয়িংয়ের ১৫ বা ২০টি উড়োজাহাজ কিনি, কিন্তু প্রয়োজনীয় ক্যাটাগরি না থাকার কারণে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালনা করতে না পারি, তাহলে সেই ক্রয়ের পূর্ণ সুফল আমরা পাব না। অতীতে কেনা কিছু বোয়িং উড়োজাহাজও যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। ফলে উড়োজাহাজগুলো তাদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা শেষ করে ফেললেও সম্ভাব্য বাজার চাহিদার একটি অংশ আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। এটি সুযোগ-ব্যয়ের বিবেচনায় একটি ক্ষতিই বটে।
তাই ভবিষ্যতে বোয়িংয়ের যেকোনো উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি যুক্ত করা উচিত। শুধু উড়োজাহাজ কেনা নয়, সেটিকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাও একই সঙ্গে তৈরি করতে হবে।
পাশাপাশি এভিয়েশন ব্যবসাকে আরো বিনিয়োগবান্ধব ও কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন করতে হবে। কর, জ্বালানির মূল্য, সার্চ চার্জ এবং বিভিন্ন ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি ও যৌক্তিক মূল্যায়ন অনুসরণ করতে হবে। বিলম্বিত পেমেন্টের ওপর অতিরিক্ত সারচার্জসহ বিভিন্ন ধরনের চার্জের হার যদি অযৌক্তিকভাবে বেশি হয়, তাহলে তা এয়ারলাইনস ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে বেবিচককে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে লিজিংয়ের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে কেপটাউন কনভেনশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর অর্থ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও নিয়মকানুন বাস্তবসম্মত ও নমনীয় হওয়া প্রয়োজন। অনেক এয়ারলাইনস এ ধরনের সমস্যার কারণে তাদের ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও এ খাতে নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশেষ করে রক্ষণাবেক্ষণ, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল বা এমআরও সুবিধা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত এমআরও সুবিধা না থাকায় বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপারেটরদের উড়োজাহাজ বিদেশে পাঠাতে হয়। এতে অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হয়।
সর্বোপরি, একটি জাতীয় কৌশলগত এভিয়েশন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। সেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বেবিচক, শিল্প খাতের অপারেটর এবং একাডেমিয়া—সব পক্ষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কাঠামো থাকতে হবে।
সবশেষে আইকাও অডিটের বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই। আগামী বছর আমরা আইকাও অডিটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। এ অডিটের চ্যালেঞ্জ অনেক। তাই এখন থেকেই আইকাওর প্রটোকল ও প্রশ্নগুলো একে একে পর্যালোচনা করতে হবে এবং কোন প্রশ্নের কীভাবে উত্তর দেব, কীভাবে প্রয়োজনীয় ঘাটতি পূরণ করব—তা নির্ধারণ করতে হবে।
আমরা যদি এখন থেকেই প্রস্তুতি না নিই, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি করা কঠিন হবে।
আমি আজ এভিয়েশন খাতের একটি কঠিন চিত্র তুলে ধরেছি। বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কারণে এ খাতের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি অবগত। তবে আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য হতাশা তৈরি করা নয়। আমাদের এসব সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। যদি পরিস্থিতি কঠিন হয়, তাহলে সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের এসব সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মানচিত্রে কোনো দেশকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে এভিয়েশন খাতকে সেই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন: সাবেক চেয়ারম্যান, বেবিচক
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকের বক্তব্যে]










