বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে আমরা সাধারণত তৈরি পোশাক শিল্প বা প্রবাসী আয়ের কথা বলি। কিন্তু অর্থনীতির পর্দার আড়ালে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ নীরবে অথচ কার্যকরভাবে দেশীয় উৎপাদনের চাকা সচল রেখেছে, তা হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাত। আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস উপলক্ষে এই খাতের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ নিয়ে আলোকপাত করা অত্যন্ত জরুরি।
অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে এসএমই
দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এমএসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৮ শতাংশ। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯০ শতাংশই এমএসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭৮ লাখ এমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। এছাড়া দেশের শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশই এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।
গত এক দশকে এই খাতে ব্যাংকিং অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও যেখানে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ১ থেকে ১ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকার মতো, বর্তমানে তা ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি ব্যাংকের জন্য মোট ঋণ পোর্টফোলিওতে এসএমই খাতের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই খাতের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। বড় শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ, আমদানি-বিকল্প পণ্য উৎপাদন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সম্পদের সুষম বণ্টন ও দারিদ্র্য বিমোচনে এ খাতের ভূমিকা অপরিসীম।
তরুণ উদ্যোক্তা: সম্ভাবনা ও সংকট
বর্তমান সময়ে তরুণেরা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। প্রযুক্তির কল্যাণে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স (ফেসবুক কমার্স) বিপ্লব তরুণদের এসএমই খাতে আসার পথ সহজ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিনা জামানতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে অর্থায়নের সুবিধা চালু করেছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টারের সহায়তায় অনেক তরুণ-তরুণী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন এবং নিজেদের ব্যবসা গড়ে তুলছেন। বিশেষ করে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম উন্নয়ন এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে যে ৪০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, পুঁজি ও অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল উদ্যোগ শুরুতেই ঝরে পড়ছে। বিশেষ করে, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে জামানত প্রথার কঠোরতা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় বাধা। অনেক সৃজনশীল তরুণের উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় ক্যাশফ্লো, স্থাবর সম্পত্তির দলিল বা পর্যাপ্ত কোলাটেরাল না থাকায় তারা প্রায়ই ঋণ থেকে বঞ্চিত হন। তরুণদের এই উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে যথাযথ মেন্টরশিপ ও উদ্ভাবনমুখী মূলধনের জোগান দেওয়া অপরিহার্য। পাশাপাশি, নবগঠিত স্টার্টআপ ফান্ড বিতরণে তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অবস্থান
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এসএমই খাত এখনো অপার সম্ভাবনার জায়গায় রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়ার জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৬১ শতাংশ। উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় আমাদের ২৮ শতাংশ অবদান মাঝামাঝি মনে হলেও, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো এসএমই খাতের মাধ্যমে রপ্তানি আয় ও গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে যে আধিপত্য তৈরি করেছে, আমরা সেখানে কিছুটা পিছিয়ে আছি। এর মূল কারণ নীতিনির্ধারণী সহায়তার সীমাবদ্ধতা ও সাপ্লাই চেইনের দুর্বলতা। বিশ্ববাজারে আমাদের পণ্যের গুণগত মান ও ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতি দূর করতে পারলে গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশ শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
প্রতিবন্ধকতা উত্তরণে করণীয়
আমাদের এসএমই খাতের অগ্রযাত্রার পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো—অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তির অভাব, বিপণন ব্যবস্থায় দুর্বলতা, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি এবং আইনি জটিলতা। এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বহুমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন:
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: ব্যাংকগুলোর জন্য নির্ধারিত এসএমই কোটা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্ষুদ্র ঋণের পাশাপাশি ব্যবসায়িক সম্ভাবনার ভিত্তিতে ‘বিজনেস গ্রোথ লোন’ বা টার্ম লোন জনপ্রিয় করতে হবে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস তৈরি করা, যেখানে উদ্যোক্তারা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে পারবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে।
দক্ষতা উন্নয়ন: কেবল ঋণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়; উদ্যোক্তাদের হিসাবরক্ষণ, বিপণন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিল্প-কারখানার সংযোগ ঘটিয়ে ইনকিউবেশন সেন্টারগুলো আরও সম্প্রসারণ করা জরুরি।
নীতিসহায়তা ও প্রণোদনা: আমদানি করা কাঁচামালের ওপর শুল্ক ছাড় এবং ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন এসএমই’ উদ্যোগের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা থাকা জরুরি।
জেন্ডার সমতা: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিশেষ মেন্টরশিপের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিশেষে, এমএসএমই খাত কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক। আমরা যদি ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে এই খাতকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। এটি কেবল জিডিপি বৃদ্ধির মাধ্যম নয়, বরং সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা তৈরির কারখানা। সরকারের নীতিনির্ধারক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমাদের এসএমই খাত আগামীর বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের পরিচয়কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে—এটাই প্রত্যাশা। এসএমই দিবস হোক নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।
এম এম মাহবুব হাসান: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক










