সরকারের ছয় মাস পেরিয়েছে। এ সময়ে সরকারের লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায়। এ ছয় মাসের মধ্যে সরকারের অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা ও উদ্যোগগুলোকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

উত্তরটি একটু দীর্ঘ হবে। দীর্ঘমেয়াদে সরকারের অনেক নতুন পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দের বিষয়গুলো আমাদের আগ্রহের জায়গা ছিল। সরকার একটি বাজেট দিয়েছে যেখানে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষদের স্বস্তি দেয়ার প্রয়াস রয়েছে। অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় দুর্বলতা আছে। এর মধ্যে কর্মসংস্থান তৈরি আর ব্যবসা সহজীকরণের বিষয়টির কথা বলা যায়। তবু এসব জায়গায় গুরুত্ব দেয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এটা ইতিবাচক দিক।

এদিকে স্বল্পমেয়াদে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। মূল্যস্ফীতি তার একটি। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এখানে বড় ধরনের উদ্যোগ আর বড় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট আছেই। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে একটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেছে। এ জটিলতার ভেতরে থেকেই সরকারকে দেখতে হবে কীভাবে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে মোটামুটি ইতিবাচক একটা সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। এখানে দ্রুত কাজ করতে হবে।

ব্যবসা সম্প্রসারণ না হলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। এদিকে কোনো খাতেই আশানুরূপ বিনিয়োগ নেই। বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের কিছু উদ্যোগ আছে। তার পরও এখানে আর কী কী করার আছে?

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলো ইতিবাচক। ব্যবসা সহজীকরণের যে প্রসঙ্গটি আছে, সেটি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। ব্যবসা সহজীকরণ মানে যেকোনো ব্যবসায়িক কাজকে সহজ ও দ্রুত করা। আমরা ছয় মাসের মধ্যে নানা উদ্যোগের আভাস পেয়েছি। সামনের এক বছর কাজ করার জন্য ভালো সময়। এ সময়ে বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। সরকার দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাস পেরিয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অন্য জটিলতা থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা বরাবরই কাজ করে। তারা প্রত্যাশা করে মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। বেসরকারি খাতের বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও তাদের বাণিজ্যিক সুবিধা দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এভাবে অর্থনীতিতে গতি আনতে হয়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে আগে এ খাতের সূচকগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে রাখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগ তখনই আসবে, যখন সবাই দেখবে ব্যবসাবান্ধব একটি পরিবেশ আছে এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাণিজ্যের পরিবেশ নষ্ট হবে না। এখানেও সরকারকে জটিলতার মধ্যে থেকেই বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা আমাদের জন্য একটি জটিলতা ও বড় সংকট। এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। জ্বালানির অভাবে কারখানা বন্ধ হওয়ায় কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে। এসব জটিলতা মোকাবেলায় আমাদের করণীয় কী?

জ্বালানি সংকট দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এ সংকট আরো বড় আকার নিয়েছে। এগুলো দেশের অর্থনীতির গতিতে ধাক্কা দিয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সমাধান খুঁজতে হবে। কারণ আমরা বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে বড় ধরনের কিছু করতে পারব না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের প্রসঙ্গ এলে ক্ষুদ্র একটা দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। এখনো এ খাতে ক্যাপাসিটি লস অনেক। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এ হার ১০ শতাংশ আর গ্যাসে বোধহয় আরেকটু বেশি। যেসব জায়গায় ক্যাপাসিটি লস আছে আর অবৈধ সংযোগ রয়েছে, সেগুলো স্বল্প সময়ে দ্রুত বিচ্ছিন্ন করা দরকার। ক্যাপাসিটি লস অনেক কমিয়ে আনা দরকার। তাহলে মূল খাতগুলোর কিছু জায়গায় সরবরাহ কিছুটা হলেও বাড়ানো যাবে।

দ্বিতীয়, আমাদের গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর সক্ষমতাকে ব্যবহার করা দরকার। এর মধ্যে ভোলার গ্যাস ক্ষেত্র নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে। এখান থেকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা অনেক জরুরি। হয়তো পুরোপুরি সরবরাহ শুরু করতে এক বছর বা আরেকটু বেশি সময় লাগবে। কিন্তু এটিকে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে হবে। দেরি হবে বলে বিলম্বের সুযোগ নেই আমাদের। আবার অনেক সময় ট্যাংরাটিলার গ্যাস ক্ষেত্র চালুর কথা বলা হয়। সামান্য উদ্যোগ নিলে এটি সক্রিয় করা জটিল নয়। অর্থাৎ উদ্যোগ শুরু করতে হবে। পরিকল্পনা সাজালেই হবে না।

বিদ্যুৎ আর গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে এটা সাধারণ মানুষের বড় প্রত্যাশা। রাজনৈতিক সরকার থাকায় এ প্রত্যাশা আরো বেশি। ফলে এটির রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়টাও বিবেচনায় রাখতে হবে। এজন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, আহরণ বা প্রকল্পের নথিপত্র আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় লম্বা বা ভারী করা যাবে না। এগুলো ছোট বা সংক্ষেপ করে সহজ করতে হবে। বিশেষ পন্থায় কাজ শুরু করতে হবে। তবে বিশেষভাবে করতে গিয়ে সরবরাহের অনিশ্চয়তা যেন তৈরি না হয় সেটাও দেখা জরুরি। এজন্য জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সম্প্রতি কিছু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কার্গো ডেলিভারি করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠান কেন বিভিন্ন ডকুমেন্ট দিতে পারছে না এর জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। পরবর্তী সময়ে যাদের সরবরাহের রেকর্ড ভালো তাদেরই দায়িত্ব দিতে হবে। এসব জায়গায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিছুটা কমালেও অসুবিধা কমানো যায়নি। উল্টো অসুবিধা কমাতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। তারপর আমাদের জ্বালানি তেল শোধনাগারের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ দ্রুত করতে হবে। এখানে বড় অংকের ব্যয়ের বিষয় রয়েছে। কিন্তু এগুলো আমাদের অগ্রাধিকার। এলএনজি টার্মিনাল সবসময় সক্রিয় রাখার জন্য তদারকি শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি সংকট নিরসন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন আমাদের দুটো বড় অগ্রাধিকার। তারপর সরকার অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়। এগুলোকে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি আছেই। আবার বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) কিংবা অটোরিকশা যে রয়েছে, এগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহেও রেশনিং পদ্ধতির প্রয়োগ করতে হবে। এগুলো জটিল সময়ে অনেকের কর্মসংস্থান তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু সংকটকালে রেশনিং ব্যবস্থাপনা জ্বালানি অপচয় বা বাড়তি ব্যবহারের সংকট এড়াতে সাহায্য করবে। ছোট জিনিসগুলো কৃচ্ছ্রসাধনের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এখানে যাপিত জীবন বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কার্যক্রম বন্ধ রাখার প্রয়োজন দেখি না। আসলে আমরা কোন জায়গায় কতটুকু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করব তার পরিমিতিবোধ থাকা জরুরি।

সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে কর্মসংস্থানের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সরকার প্রায় পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করতে চায়। এদিকে প্রশাসনের পরিচালন ব্যয় তো আছেই নতুন পে-স্কেল দেয়ার পর বাজেটের বড় অংশই চলে যাবে বেতন-ভাতা পরিশোধে। সরকারকেও ঘাটতি মেটাতে ঋণ নিতে হবে। তখন বেসরকারি খাত ঋণ না পেলে কর্মসংস্থান হবে কীভাবে? সরকারের এ লক্ষ্যমাত্রা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে একটা জিনিস আমি অনেক দিন ধরেই বলছি। সেটা হলো, আমাদের স্থানীয় পর্যায়ে একটা ম্যাপিং দরকার। মানে সব কিছুরই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা চাই। দীর্ঘমেয়াদে জোনভিত্তিক পরিকল্পনা নেয়া যায়। বিভাগগুলোকে আরেকটু ছোট করে আমি বলব যে জোনভিত্তিক—যেমন আপনি ডিভিশন বা ডিভিশনের চেয়ে আর একটু ছোট করে জোন বানানো যায়। বড় কয়েকটি জেলা অথবা কয়েকটা ছোট জেলা এক করে জোন বানানোর চিন্তা করা যায়। এখানে পরামর্শ, জোনগুলোয় কতগুলো ট্রেনিং সেন্টার আছে তা দেখা দরকার। কোন জায়গায় কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বেশি তা দেখেই ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করতে হবে। পরিকল্পনামাফিক কোন জায়গায় কেমন প্রশিক্ষণ দিতে হবে তা হিসাব করা জরুরি। এভাবে দক্ষতা বাড়িয়ে শিল্পসংযুক্তিও নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য কর্মসংস্থান পোল তৈরি করা যেতে পারে। গোটা একটা অবকাঠামো গড়তে হবে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

স্বল্পমেয়াদে শিল্প খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে না। বেসরকারি খাতে কিছু প্রণোদনা বা বিনিয়োগ বাড়ানোকে শিল্পায়ন বলা যায় না। শ্রমঘন জায়গাগুলোয় যেন কর্মসংস্থান তৈরি হয় তা দেখতে হবে। কিছু শ্রমঘন জায়গাকে লক্ষ্য করতে হবে। সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ গড়ে নিতে হবে। এটিকে অর্থনীতির ভাষায় এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্টিসিটি অব গ্রোথ বলা হয়। আমাদের উৎপাদনে এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্টিসিটি অব গ্রোথ হয় খুব কম অথবা ঋণাত্মক। এটি উদ্বেগের বিষয়। অর্থাৎ শিল্পের পরিসর বড় হচ্ছে কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।

কর্মসংস্থানে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে জেন্ডার রেস্ট্রিক্টিভ যে নর্ম আছে, সেগুলোর মধ্যেও পরিবর্তন আনা দরকার। এক্ষেত্রে যা প্রতিবন্ধকতা আছে তা দূর করতে হবে। আঞ্চলিক বিভাজন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিতে বিকেন্দ্রীকরণ আমার পছন্দ। স্থানীয় পর্যায়ে চাকরি তৈরি করতে হবে। প্রথমে সময়োপযোগী কর্মসংস্থান, দ্বিতীয়ত জেন্ডার সংবেদনশীল পরিবেশ নিশ্চিত আর তৃতীয়ত স্থানীয় পর্যায়ে সুযোগ বাড়ানো।

সরকার ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতেও বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে। ধারণা হিসেবে এটি অনেকের কাছেই নতুন। তবে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী তার এক বক্তব্যে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির বিষয়ে কিছুটা ধারণা দেয়ায় বিষয়টি একটু স্পষ্ট হয়েছে। তার পরও অনেকের ধারণা এটি ইউটিউবে ব্লগিংয়ে সীমাবদ্ধ। এ জায়গার সম্ভাবনা কেমন?

আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় আছে। এগুলো ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জায়গা। যেমন গানের আয়োজন, যাত্রাপালা, থিয়েটার, মঞ্চনাটক—এমন অনেক সাংস্কৃতিক আয়োজনের অর্থনীতিকে কাজে লাগানো। আবার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অনেক শিল্পী রয়েছেন তাদের কাজগুলোকে প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এটাও কিন্তু আঞ্চলিক অর্থনীতির অংশ। যেমন যশোরের নকশী কাঁথা বা হস্তগত শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে এসএমই খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়। আন্তর্জাতিক বাজারেও আমরা প্রবেশ করতে পারব। আবার পাটজাত পণ্য, বেতসহ অন্য অনেক পণ্যের ভীষণ চাহিদা। পিন্টারেস্ট বা এমন অনেক জায়গায় গেলেই দেখবেন গৃহস্থালি এসব পণ্যের চাহিদা ব্যাপক।

অর্থাৎ ক্রিয়েটিভ ইকোনমির সম্ভাবনা বেশি কাজে লাগানো যাবে আঞ্চলিক সক্ষমতা ও স্বকীয় শিল্পকে কাজে লাগিয়ে। এখন অনেক ফ্রিল্যান্স উদ্যোগ আছে। ছোট ছোট স্টার্টআপ আছে। তারা নতুন উদ্ভাবনে জোর দিয়ে থাকেন। আধুনিক অনেক উদ্ভাবনকে যদি নিজস্ব উপাদান দিয়ে কাস্টমাইজ করা যায় তাহলেও অনেক কিছু করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র পরিসরের দক্ষতাই অনেক। গ্রামীণ নারীর সক্ষমতা বাড়াতেও উপকারী। এজন্য সরকার মোটাদাগে ২০-৪০টি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এ খাতের বিকাশ করার চেষ্টা করতে পারে। তারপর তারা সিদ্ধান্ত নিক যে আগামীকে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি খাতের বিষয়ে কেমন পরিকল্পনার দিকে যাবেন।

আমাদের এলডিসি উত্তরণ একসময় করতেই হবে। সরকার তা তিন বছর পেছানোর জন্য জাতিসংঘে আবেদন করেছে। এ বছর না হোক, একসময় এ উত্তরণ করতেই হবে। এর আগে অনেকে পণ্য রফতানি বহুমুখীকরণ, শুল্কনীতিতে পরিবর্তন আর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিচ্ছেন। এ তিনটার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল কী হতে পারে?

এলডিসি উত্তরণের প্রসঙ্গ এলে বলতে হয় এখানে আমাদের অনেক কিছুই করার ছিল। আমরা অনেক দিন ধরেই পণ্য রফতানি বহুমুখীকরণের পরামর্শ দিচ্ছি। আগে হয়তো নীতিনির্ধারকরা ভাবতেন, আমরা ধীরে ধীরে পণ্য বহুমুখীকরণের দিকে যাব। এখন সে সুযোগ আর নেই। ফলে সরকারকে এখন দ্রুত এদিকে এগোতে হচ্ছে। এলডিসি উত্তরণের আগের সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে। এলডিসি উত্তরণের প্রসঙ্গ অনেক বড় বিষয়। বিস্তারিত একটি সাক্ষাৎকারে এসব বলা কঠিন। শুধু একটা কথা বলা যায়, এ উত্তরণের ফলে কর্মসংস্থান ও নিয়োগের ওপর বড় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষত নারী শ্রমবাজারের ওপর একটা প্রভাব পড়বে যদি জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করা না যায়। এছাড়া আর্থসামাজিক ও বড় অবকাঠামোগত ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে। ঋণের ক্ষেত্রে আমাদের ব্যাষ্টিক অংশেও চ্যালেঞ্জ আছে। বাণিজ্য, প্রবৃদ্ধি আর কর্মসংস্থান—এ তিনটিকে আমি একইভাবে দেখছি। কারণ বাণিজ্যের ওপর প্রবৃদ্ধি নির্ভরশীল। আবার বাণিজ্য কর্মসংস্থানও গড়ে। আরেকটি হলো কনসেশনাল ফাইন্যান্সিং। এটা যদি বদলে যায়; অবশ্যই বদলে যাবে এবং এখনই তা হচ্ছে। সেখানেও একটা চ্যালেঞ্জ থাকবে। কারণ সামাজিক অবকাঠামোর ওপর একটা চাপ তৈরি হবে। যেমন হয়তো বাচ্চাদের অপুষ্টিজনিত জটিলতা হ্রাসের সামাজিক অর্থায়ন করা হলো। সেটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চলে যাবে। অথচ আমাদের ভবিষ্যতের জন্য শিশুদের অপুষ্টিজনিত সমস্যা কমানোই প্রধান কাজ। এজন্য আমাদের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় এজেন্সিদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এমন যেন না হয় যে আমরা চাপে পড়ি বা এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এর প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ যেকোনো জটিলতা সামলানোর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রসঙ্গটি এসেছে তা হলো রফতানি। রফতানি বহুমুখী দ্রুত করার জন্য আমাদের তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করলে আর চলবে না, বরং সেবা খাতের পরিসর বাড়াতে হবে। সার্ভিস ওরিয়েন্টেড ভাবনা লাগবে। এজন্য স্কিলড ও সেমি স্কিলড একটি খাত করা যেতে পারে। বাইরে চাহিদা আছে, এমন বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে হবে। এলডিসি উত্তরণ বিশাল চ্যালেঞ্জ। একই সময়ে এর আগে আমরা কিছুটা সময় পাব যাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। অগ্রাধিকারের জায়গাগুলো অনেক দিন ধরেই আলোচনা হয়েছে। এখন কাজ শুরু করা দরকার।