আন্দোলনে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেছেন—সাম্প্রতিক এ শিরোনাম দেখে আবু ইসহাকের ‘জোঁক’ গল্পের শেষ দৃশ্যের কথা মনে পড়ে।
চৌধুরীবাড়ির সীমানা পার হয়ে ওসমান দেখে করিম গাজী, নবুখাঁ ও আরো ১০-১২ জন ভাগ-চাষী ওয়াজেদ চৌধুরীর বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। চৌধুরীপুত্রের আকুণ্ঠ মিথ্যার সমানে নেতিয়ে পড়া ওসমান তখনো ভুয়া টিপসই দিয়ে চাষীদের কাছ থেকে উৎপাদিত শস্যের তিন ভাগের দুই ভাগ লুফে নেয়ার প্রতিবাদে শামিল হওয়ার জোর পায় না। ঝিমিয়ে পড়া ওসমানকে দেখে করিম গাজী যখন খেঁকিয়ে উঠে বলে, ‘চল
আমাগো লগে দেখি কী করতে পারি!’ ততক্ষণে
শরীরে জোর ফিরে পায় সে। বছরের পর বছর তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে গা-ঝাড়া দিয়ে ওসমান বলে ওঠে, ‘হ
চল। রক্ত চুইষ্যা খাইছে। অজম করতে দিমু না, যা থাকে কপালে।’
আবু ইসহাকের কালে ওসমান, করিম গাজিরা জন্মেছিলেন জমির বর্গা পাটচাষী হয়ে, প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের এ কালে তারা জন্মেছেন পাটকল শ্রমিক আব্দুস সাত্তার, সোহবার হোসেন নামে। বকেয়া বেতনের দাবিতে আমরণ অনশনে মৃত্যু হয়েছে যাদের।
সম্প্রতি নিয়মিত মজুরি পরিশোধসহ ১১ দফা দাবিতে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত নয় পাটকলের হাজারো শ্রমিক আমরণ অনশনে নামার ঘটনা আমাদের সামনে আবারো ওসমান, করিম গাজিদের অসহায় মুখগুলোকে নিয়ে আসে। অনশন কর্মসূচিতে শামিল হয়ে প্রতিবাদ করতে করতে যারা মারা যান। আব্দুস সাত্তার ও সোহরাব হোসেন দুজনেরই বয়স ৫৫। ক্ষুধার কষ্ট, সন্তানদের ভরন-পোষণ ও অর্থকষ্টে ‘এমনেও মরছি অমনেও মরছি’-দশায় থেকে থেকে এর শেষ দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের মৃত্যুতেও খুব একটা শোর ওঠেনি। বিগত বহুবারের মতো আবারো শ্রমিকদের বুঝিয়ে কাজে ফেরাতে সক্ষম হয়েছি আমরা।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর মোতাবেক ‘অনশন স্থগিত, কাজে যোগ দিয়েছে পাটকল শ্রমিকরা’। বকেয়া মজুরি পরিশোধসহ ১১ দফা দাবি পূরণে গত ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন পাটকল শ্রমিকরা। এর মধ্যে দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা ২৫ নভেম্বর থেকে আন্দোলনে নামেন। এ আন্দোলনের মুখে অর্থ মন্ত্রণালয় সব মিলের বকেয়া মজুরি ও বেতন-ভাতা পরিশোধে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানায়। (১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ বণিক বার্তা)।
শ্রমিকরা কাজে ফিরেছেন, কিন্তু মনের অসন্তোষ মেটেনি। তারা আশ্বাস পেয়েছেন। বহুবারের মতো এবারো আশায় বুক বেঁধে ফিরেছেন। তবে পাট শ্রমিকদের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে আমরা দেখি, ধারাবাহিকভাবে বিগত কয়েক বছরই বিভিন্ন সময় বকেয়া মজুরির দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়েছে তাদের।
এক. চৈত্রের খররোদে পুড়ে হাতে থালা-বাসন নিয়ে ভুখা মিছিল করেছেন খুলনা ও যশোরের সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা। বকেয়া মজুরি পরিশোধ ও পাট খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের দাবিতে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন তারা (এপ্রিল ২০১৬ কালের কণ্ঠ)।
দুই. বকেয়া মজুরি, মহার্ঘ ভাতা, শ্রমিক নেতাদের নামে থাকা মামলা প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবিতে খুলনা অঞ্চলের সাতটি পাটকলের শ্রমিকরা ফের আন্দোলনে নেমেছেন। গত বুধবার থেকে তাদের পাঁচদিনের আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে ধর্মঘট, বিক্ষোভ মিছিল, কর্মকর্তাদের কার্যালয় ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি (জুন ২০১৭ বাংলা ট্রিবিউন)।
তিন. খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকলের ২৬ হাজার ৭১৮ শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের এখন দিন কাটছে অর্ধাহার-অনাহারে। বকেয়া মজুরির দাবিতে গত বৃহস্পতিবার সকালে ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, স্টার, ইস্টার্ন, দৌলতপুর ও যশোরের জেজেআই জুট মিলের শ্রমিকরা উৎপাদন বন্ধ










