পঞ্চাশ পেরিয়ে বাংলাদেশ। এ দীর্ঘ যাত্রায় আর্থ-সামাজিক পরিসরে বাংলাদেশের অর্জন প্রশংসিত হচ্ছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। তার মধ্যে গবেষণা খাত অন্যতম। অর্থনীতির সম্ভাবনার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার ও উন্নয়ন সুফলের ন্যায্য বন্টনে গবেষণালব্ধ ফলাফলভিত্তিক নীতি-পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। কিন্তু দেশের গবেষণা খাতের দুর্বলতায় নীতিনির্ধারণের কাজটি বিজ্ঞতা-দূরদর্শিতার সঙ্গে সম্পাদন করা যাচ্ছে না। থেকে যাচ্ছে নানা ফাঁক-ফোকর। এর অভিক্ষেপ নানাভাবে আজ দৃশ্যমান। একদিকে নীতি-পরিকল্পনাগুলো যেমন অনেকক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ন্যায্যতা, কার্যকারিতা হারাচ্ছে; আবার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীও নীতি দর্শনে থাকছে উপেক্ষিত। একই কারণে চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া নিয়েও উঠছে বিস্তর প্রশ্ন। বর্তমান ধারায় উন্নয়নের সুফল মুষ্টিমেয়র মুঠোবন্দী, বহুমাত্রিক বঞ্চনার শিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এটি বঙ্গবন্ধুর লালিত ও সংবিধানপ্রতিশ্রুত সমতাভিত্তিক বাংলাদেশের বিপরীত প্রবণতা বৈকি। উন্নয়নের যথাযথ প্রভাব নিরূপণ, উন্নয়ন প্রক্রিয়া গণমুখী করার বিষয়টি নির্ভর করছে গবেষণাকেন্দ্রিক নীতিকাঠামো চর্চার ওপর। গবেষণা খাতের উন্নয়ন ছাড়া যা সম্ভব নয়।
ধারাবাহিক অগ্রগতি ও জ্ঞানগত প্রগতির সঙ্গে গবেষণার একটা আন্তঃসংযোগ বিদ্যমান। যার বড় প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ। পশ্চিমা এসব উন্নত দেশের আজকের উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে গবেষণার। তারা উন্নয়নের প্রতিটি ধাপের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গবেষণাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। গবেষণায় বরাদ্দ বাড়িয়েছে প্রয়োজন অনুসারে। বর্তমানে উল্লিখত দেশগুলোয় গবেষণা খাতের বরাদ্দ জিডিপির প্রায় আড়াই থেকে তিন শতাংশ। বিশেষ করে ইসরায়েল, সুইডেন ও অস্ট্রিয়ায় এ বরাদ্দ আরো বেশি। সেসব দেশে তা জিডিপির প্রায় চার থেকে পাঁচ শতাংশের মতো। দেশগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নে বিভিন্ন খাতের জন্য গড়ে তুলেছে বিপুসংখ্যক আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বেসরকারিভাবেও গড়ে তোলা হয়েছে অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। সেখানে কাজ করছে পেশাদার গবেষক দল। গবেষনার মাধ্যমেই তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে টেকসই-কার্যকর নীতি প্রণয়ন করছে। যার সুফল সেখানকার রাষ্ট্র-সমাজের সর্বত্র দৃশ্যমান।
পশ্চিমা উন্নত দেশগুলো দূরস্থান; এশীয় ব্র্যাঘ্র অর্থনীতি যেমন- সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, হংকং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলোও গবেষণায় প্রাধিকার দিয়েছে। জিডিপির শতাংশ হিসাবে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়িয়ে তারা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে। দেশগুলোয় বেসরকারিভাবেও গড়ে তোলা হয়েছে নানা গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নীতি প্রণয়নে যারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই প্রতিবেশী ভারতও। দেশটিতে গবেষণা খাত একটা শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব লাভ করেছে। সরকার তো বটেই, বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তারাও শিক্ষা-স্বাস্থ্য, উন্নয়ন নীতি পর্যালোচনা, বাজার বিশ্লেষণ, শ্রমবাজার নিরীক্ষাসহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে দেশটিতে প্রতিষ্ঠা করেছে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান দেশটির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নীতিপ্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা জোগাচ্ছে। বেসরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গবেষণা বাড়িয়ে সবাই চেষ্টা করছে দেশকে আরো এগিয়ে নেয়ার। এটা শিক্ষাপ্রদ।
বৈশ্বিক প্রবণতার উল্টো স্রোতে বিরাজ করছে বাংলাদেশ। সময়ান্তরে গবেষণায় প্রতিযোগীরা অনেকটা এগোলেও দেশের গবেষণা খাত এখনো পিছিয়ে। এক্ষেত্রে কয়েকটি কারণ দায়ী। শিক্ষায় সংখ্যাগত উল্লম্ফন হলেও দেশে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে বটে, সেগুলো চলছে ঢিমেতালে। তেমন কোনো সিরিয়াস গবেষণা হচ্ছে না। রয়েছে বরাদ্দ স্বল্পতা। তথ্য বলছে, জিডিপির অনুপাত হিসেবে দেশের গবেষণা খাতে বরাদ্দ এখনো শূণ্য দশমিক ৫০ শতাংশের নিচে। আবার যতটুকু বরাদ্দ দেয়া হয়, সেটিও যথাযথভাবে ব্যবহার হয় না। অনেক অর্থ বেহাত হয়ে যায়। বড় মাত্রায় অনিয়ম-দুর্নীতি হয়। আছে নীতি মনোযোগের ঘাটতিও। আমাদের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নতিতে প্রবলভাবে দৃষ্টি দেয়ার একটি প্রবণতা বিরাজমান। তার বিপরীতে গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত অনেকটাই উপেক্ষিত। গবেষণায় পেশাদার গবেষকের সংখ্যা অপ্রতুল। এ খাতে ক্যারিয়ার গঠন এবং ব্যক্তিগত আর্থিক উন্নতি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অনেকেই এ খাতে আসতে চায় না। আবার অনেকেই আগ্রহী হলেও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম থাকায় একটা অংশ এ খাতে ক্যারিয়ার গঠন করতে পারে না। সবমিলিয়ে দেশের গবেষণা খাতের অগ্রগতি স্থবির।
দেশ এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশে পর্দাপণে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটির। সামনে উচ্চ মাধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া, এসডিজি অর্জন ও এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা যেমন বজায় রাখতে হবে, তেমনি নতুন অনেক উদ্ভাবনী উপায়েরও উন্মেষ ঘটাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবনে অব্যাহতভাবে প্রেষণা জোগানো। উদ্ভাবন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না, তার জন্য চাহিদা-চালিত গবেষণা এগিয়ে নিতে হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় ওই পর্যায়ের দেশের জন্য প্রযোজ্য বৈশ্বিক গবেষণা তহবিল আর বাংলাদেশের জন্য লভ্য নয়। কাজেই অভ্যন্তরীণভাবে এ অর্থ সঞ্চালন করতে হবে। গবেষণা প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে এ খাতে জিডিপির অন্তত দেড় শতাংশ বরাদ্দ জোগাতে হবে এবং জাতীয় বাজেটেও এ খাতের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা বাঞ্ছনীয়।
গবেষণা শুধু সরকারের নয়, বেসরকারি খাতেরও ব্যাপার। সময়ের বিবর্তনে বেসরকারি খাত বড় হয়েছে। শিল্পায়নে ঘটেছে উল্লম্ফন। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উদ্ভাবন, বাজার পর্যালোচনা, পণ্য বৈচিত্র্যায়ন, নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ বাড়ায়নি ব্যক্তিখাত। নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে তুলেনি অতিপ্রয়োজনীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ভারতে টাটা, আদানি, আম্বানি, মিত্তাল প্রভৃতি শিল্পগ্রুপ আন্তর্জাতিক মানের বেশ কয়েকটি গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ব্যবসায়িক স্থায়িত্বশীলতা, ব্যবস্থাপনা, প্রতিযোগিতাসক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্যের গুণগত মানোন্নয়ন, মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন নানা বিষয়ে মানসম্মত গবেষণা পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দুঃখজনকভাবে, আমাদের ব্যক্তিখাত গবেষণায় এখনো খুব একটা আগ্রহী নয়। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দৃশ্যপট দ্রুত যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তাতে গবেষণা ছাড়া প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখা কঠিন হবে। এটা বুঝতে হবে আমাদের শিল্পোদোক্তাদের।
অর্থনৈতিক রূপান্তর ও উন্নয়ন অভিযাত্রার নতুন এক ধাপের সন্ধিক্ষণে এখন দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এ ধাপে এগিয়ে যেতে সনাতনী কায়দায় চললে হবে না। বৈশ্বিক পরিবর্তিত দৃশ্যপটের সঙ্গে তাল রেখে চলতে হবে। গবেষণানির্ভর উন্নয়ন নীতি গ্রহণ না করলে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ অভিঘাত মোকাবেলা সহজ হবে না। সেটি রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন সত্য, তেমনি বেসরকারি পর্যায় থেকেও সত্য।
হুমায়ুন কবির: সাংবাদিক










