দেশের ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। এর পেছনে বড় দায় রয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। সে বিবেচনায় দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কর্মক্ষমতা মূল্যায়নে ‘কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরস’ (কেপিআই) নির্দেশিকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক তা তাৎপর্যপূর্ণ। নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রায় ৩০টি সূচকের ভিত্তিতে এমডি ও সিইওদের পারফরম্যান্স বা কর্মক্ষমতার মূল্যায়ন করা হবে। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সম্পদের গুণগত মান, মুনাফা, সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, গ্রাহকসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়কে পরিমাপযোগ্য সূচকের আওতায় আনার ফলে শীর্ষ নির্বাহীদের দায়িত্ব এবং জবাবদিহি নির্ধারণের একটি কাঠামো তৈরি হবে।
কিন্তু ব্যাংক খাতে সুশাসনের যে বড় ঘাটতি রয়েছে তার পেছনে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং স্বয়ং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্ট। শুরু থেকেই দেশের ব্যাংক খাতের অবস্থা আজকের মতো নাজুক ছিল না। যেকোনো ব্যাংকের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, বড় অংকের ঋণ নির্দিষ্ট কয়েকজন গ্রাহকের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া বা ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচার বা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অদক্ষতা দীর্ঘদিনের চর্চিত বিষয়। এতে সম্মিলিতভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায় রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাপক রাজনৈতিকীকরণের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে অবাধ দুর্নীতি হয়েছে, যার বড় অংশে রয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া পরিচালক বা শীর্ষ কর্মর্তারা। এ পরিস্থিতির পেছনে কর্মদক্ষতার অভাবের চেয়ে বেশি দায় রয়েছে রাজনৈতিক চাপ ও সুশাসনের ঘাটতি। যে কারণে চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
সুতরাং ব্যাংকের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কেবল এমডি ও সিইওর নিয়োগ এবং কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন বা তাদের জবাবদিহির কাঠামোয় আনলেই হবে না। যে পর্ষদ বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ অনুমোদন করেছে, অনিয়ম ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা ব্যবস্থাপনায় অযাচিত প্রভাব বিস্তার করেছে, তাদের সিদ্ধান্তের দায় এড়িয়ে শুধু এমডি ও সিইওকে জবাবদিহির আওতায় আনা হলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আসবে না। উক্ত কাঠামোয় পরিচালনা পর্ষদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতার নিয়মিত মূল্যায়ন থাকাও অপরিহার্য। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব কর্মকর্তাদের কাজের দক্ষতা ও স্বচ্ছতাকেও গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়নের দিকে যাবে সেটিও কাম্য। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পুরো ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিতে ব্যর্থ হয়েছে সেটি বিবেচনায় নিয়ে হলেও সংস্থাটিকে সেদিকে যেতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এ উদ্যোগ নিয়ে কর্মকর্তাদের অনেকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাদের ভাষ্যমতে, অনেক ব্যাংকে ঋণ অনুমোদন, বড় ঋণগ্রহীতা নির্বাচন, কর্মকর্তা নিয়োগ-পদোন্নতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে এমডির স্বাধীনতা সীমিত। বিপরীতে কিছু ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ বা চেয়ারম্যানের প্রভাবই বেশি কার্যকর। ফলে ব্যাংকের সব ব্যর্থতার দায় কেবল এমডির ওপর চাপিয়ে দিলে জবাবদিহির কাঠামো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে। তাদের এ আশঙ্কা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এটাও সত্য ব্যাংক খাতে যে অদক্ষতা ও সুশাসনের অভাব রয়েছে তার দায় শেষ পর্যন্ত এমডি ও সিইওদের পক্ষেও এড়ানো কঠিন। তবে জবাবদিহি কাঠামোর ভারসাম্য বজায় রাখতে অবশ্যই পরিচালনা পর্ষদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাজকেও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
এছাড়া মূল্যায়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ দিক বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। যেমন যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি, ব্যাপক মূলধন ঘাটতি রয়েছে কিংবা দীর্ঘদিনের অনিয়মে ব্যাংকের পরিস্থিতি নাজুক, সেখানে নতুন দায়িত্ব নেয়া একজন এমডির কাছ থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যে সব সূচকে কাঙ্ক্ষিত ফল আশা করা বাস্তবসম্মত হবে না। বরং এমন ব্যাংকের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অবস্থার তুলনায় কতটা উন্নতি হলো, ঝুঁকি কতটা কমল এবং সংস্কার কার্যক্রম কতটা এগোল—এসবও মূল্যায়নের অংশ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য জানিয়েছে, দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে যে অবস্থায় রয়েছে সেখান থেকে আর অবনমন না হওয়া বিবেচনায় নেয়া হবে। বিষয়টি নীতিমালার প্রয়োগে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।
কেপিআই মূল্যায়নের ফল এমডি বা সিইওর পারিশ্রমিক, প্রণোদনা, পুনর্নিয়োগ ও মেয়াদ বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলবে—এটি শীর্ষ নির্বাহীদের দায়িত্বশীল করার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, মূল্যায়ন যেন কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত না হয়। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বাস্তবতা, ব্যাংকের প্রাথমিক অবস্থান, বাজার পরিস্থিতি এবং এমডির নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও স্বাধীন হওয়া।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট মূলত দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, রাজনৈতিক ও স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের তদারকি ঘাটতির সম্মিলিত ফল। তাই কেপিআই কাঠামোকে কেবল এমডি মূল্যায়নের ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সামগ্রিকভাবে পেশাদারত্ব ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এ কাঠামোর প্রয়োগে কঠোরতা ও ন্যায্যতার সমন্বয় করতে পারে, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং নিজেদের তদারকি ব্যবস্থাকেও আরো পেশাদার ও কার্যকর করে, তাহলে উদ্যোগটি ব্যাংক খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এমডি, সিইওর জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন। সে জবাবদিহির সঙ্গে থাকতে হবে পর্যাপ্ত কর্তৃত্ব, স্বাধীনতা এবং পর্ষদ ও নিয়ন্ত্রকের সমান দায়িত্ব। কারণ ব্যাংক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠা কোনো এক ব্যক্তির কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; এটি পুরো ব্যবস্থার জবাবদিহির ওপর নির্ভরশীল।










