এক সময় নারী ছিল চার দেয়ালের ভেতর বন্দি এক নিঃশব্দ অস্তিত্ব। শিক্ষা ছিল তাদের জন্য বিলাসিতা, মতপ্রকাশ ছিল অপরাধ। সেই ঘন অন্ধকারের বুক চিরে যিনি কলম তুলে নিয়েছিলেন আলোর পক্ষে, তার নাম বেগম রোকেয়া। তিনি শুধু একজন লেখক নন, তিনি একটি আন্দোলন, একটি চেতনা, এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সকালের নাম।
শুধু নারী শিক্ষা নয়, নারী জাগরণ ও মুক্তিতে তার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা। আজকের উপমহাদেশে নারী জাগরণের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ঘটেছে তা বেগম রোকেয়া ছাড়া সম্ভব হতো না। তার অবদানের স্বীকৃতি রাষ্ট্র তাকে দিয়েছে। বহু বছর ধরেই গর্বের সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় ‘রোকেয়া দিবস’, রয়েছে তার নামে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘রোকেয়া পদক’। ৯ ডিসেম্বর ছিল এ মহীয়সীর ১৪৫তম জন্ম ও ৯৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে। চার নারীর হাতে রোকেয়া পদক তুলে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। বেসরকারিভাবেও নানা আয়োজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন স্মরণ করেছে তাকে। এত আয়োজনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সামনে নিয়ে আসে মুদ্রার আরেক পিঠ, সমাজের এক কালো দিক। একদিকে রাষ্ট্রপ্রধান তার বক্তব্যে বলছেন ‘দুর্ভাগ্য ১০০ বছরেও আমরা আরেকজন বেগম রোকেয়া সৃষ্টি করতে পারিনি’। অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আজ মুরতাদ কাফির বেগম রোকেয়ার জন্মদিন’। এটা একটি ঘটনার উল্লেখ মাত্র।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেগম রোকেয়াকে নিয়ে করা প্রতিটি আর্টিকেল ও প্রতিবেদনের কমেন্ট বক্সে তাকালেই দেখা যায় সমাজের এক নীরব অবক্ষয়। বেগম রোকেয়ার নাম উচ্চারণ করলেই কমেন্ট বক্সে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক শ্রেণীর মানুষের কটূক্তি, অশ্লীল মন্তব্য, বিদ্রুপ আর ঘৃণার স্রোত। আজকের এ পরিস্থতির শুরুটা দেখা গিয়েছিল অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বেগম রোকেয়ার ছবিতে ম-বর্গীয় স্ল্যাং লেখার মাধ্যমে। প্রতিবাদও হয়েছিল কিন্তু পরিবর্তন আসেনি বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো—সমাজের শিক্ষিত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরের ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে অবমাননাকর মন্তব্য করা, যা শুধু ব্যক্তিগত রুচির সংকট নয়, বরং সামাজিক মূল্যবোধের এক গভীর অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
প্রশ্ন জাগে, একজন নারীশিক্ষার পথিকৃৎ, সমাজসংস্কারক, একজন আলোকবর্তিকার প্রতি বিদ্বেষ কেন? কেন আজও বেগম রোকেয়ার নামে ভয় এক শ্রেণীর মানুষের চোখে? কেন নারী জাগরণের নাম উচ্চারিত হলেই কেঁপে ওঠে পুরুষতান্ত্রিক মানস?
বেগম রোকেয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি চিন্তা, একটি বিপ্লব। যখন উপমহাদেশে নারী মানেই অন্ধকার ঘরের নীরব বন্দিনী, তখন রোকেয়া কলম হাতে নিয়ে বলেছিলেন—নারী মানুষ, মানুষ হিসেবেই তার অধিকার চাই। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ লিখে তিনি দেখিয়েছিলেন উল্টো পৃথিবী, যেখানে পুরুষরা পর্দার আড়ালে। সেই ব্যঙ্গ-রূপক ছিল পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার মুখে সজোরে ছোড়া বাস্তবতার আয়না। এ আয়নাটাই ভয় লাগায়।
বেগম রোকেয়া পুরুষতান্ত্রিকতার জন্য হুমকি, কারণ পুরুষতন্ত্র টিকে থাকে শক্তির অসম বণ্টনের ওপর। শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সিদ্ধান্ত—সবখানেই যখন পুরুষের একচেটিয়া কর্তৃত্ব, তখন নারীকে প্রশ্ন করতে দেয়া মানেই সেই কাঠামোয় ফাটল ধরানো। বেগম রোকেয়া সেই ফাটল ধরিয়েছিলেন সরাসরি।
তিনি বলেছিলেন—নারী অক্ষম নয়, নারীকে অক্ষম করে রাখা হয়েছে। এ বাক্যই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভিত নাড়িয়ে দেয়। কারণ এখানে দায় গিয়ে পড়ে ব্যবস্থার ওপর, পুরুষশাসনের ওপর। যে সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীকে অধস্তন বানিয়ে এসেছে, সেই সমাজ রোকেয়ার কথায় নিজের নগ্ন মুখ দেখতে পায়। তাই আতঙ্ক।
ডিজিটাল যুগে ঘৃণার প্রকাশ সহজ হয়েছে। ফেসবুকের কমেন্ট বক্স এখন অনেকের কাছে ঘৃণা প্রসবের নিরাপদ স্থান। বেগম রোকেয়ার কোনো খবর, প্রবন্ধ বা উদ্ধৃতি পোস্ট হলেই যে নোংরা মন্তব্য আসে—এর পেছনে আছে কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ।
এক. জ্ঞানভীতি। শিক্ষিত, সচেতন নারী পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভয়। রোকেয়া সেই জ্ঞানচেতনার প্রতীক।
দুই. ক্ষমতা হারানোর আতঙ্ক। নারী যদি সমান হয়, তবে পুরুষের তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্ব কোথায় যাবে।
তিন. বিকৃত ধর্মব্যাখ্যা। কিছু মানুষ ধর্মকে ব্যবহার করে নারীকে নিচে নামাতে, অথচ তারা ভুলে যায়— ধর্মের নামে অন্যায় মানুষ কখনই সহ্য করেনি।
এ ধরনের অপচর্চা রোকেয়াকে আঘাত করে না। এটি সমাজের ভেতরের কুৎসিততাকেই বরং তুলে ধরে। বেগম রোকেয়াকে ঘিরে তথাকথিত ধর্মরক্ষকদের অস্বস্তি আজ নতুন কিছু নয়। যারা ধর্মকে নারী নিপীড়নের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, যারা ধর্মকে ক্ষমতার হাতিয়ার বানায় তাদের কাছে এই নাম আতঙ্কের। যুক্তি, শিক্ষা আর নারীর অধিকার যখন ধর্মের নামে প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখনই শুরু হয় ভয়। সেই ভয় থেকেই জন্ম নেয় বিদ্বেষ, বিকৃত ব্যাখ্যা, নোংরা আক্রমণ।
বেগম রোকেয়া প্রশ্ন করেছিলেন ধর্মের নামে নিপীড়নকে। তিনি দেখিয়েছিলেন—কীভাবে অশিক্ষা নারীদের পুরুষের পায়ের তলায় রেখেছিল। তার লেখায় ফুটে উঠেছে ধর্মের নামে নারীর প্রতি যত অসঙ্গতি। আজ শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও তার লেখায় যে যুক্তি তা কী কোনো ধর্মের নামে আস্ফালন করা কোনো ব্যক্তি খণ্ডন করতে পেরেছে? পারেনি বলেই সেই কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর আজ বেগম রোকেয়ার মতো একজন মহীয়সী নারীকে নিয়ে নোংরা মন্তব্য করে, কাফির, মুরতাদ বলে অখ্যায়িত করে। কারণ নারী শিক্ষিত হলে প্রশ্ন করবে, বুঝবে, প্রতিবাদ করবে।
রোকেয়া কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি কোনো নাম নন। তিনি আজও জীবন্ত একটি চ্যালেঞ্জ—চ্যালেঞ্জ পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, ভণ্ডামির বিরুদ্ধে, অন্ধ সংস্কারের বিরুদ্ধে। এ চ্যালেঞ্জই কিছু মানুষ সহ্য করতে পারে না। তাই তারা কুৎসা ছড়ায়, চরিত্রে কালি মাখায়, অশ্লীল উপমা বানায়। এতে তাদের শক্তি বাড়ে না, বরং দুর্বলতাই প্রকাশ পায়।
এখন প্রশ্ন, এর দায় কার? সহজ উত্তর হিসেবে বলা যায়—ধর্মান্ধ, মৌলবাদী, অশিক্ষিত, পুরুষতান্ত্রিক ও বিকৃত মানসিকতার কিছু মানুষ। তারা নিঃসন্দেহে সরাসরি অপরাধী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ মানুষগুলো কোথা থেকে এল? কে তাদের এমন সাহস দিল যে তারা প্রকাশ্যে ঘৃণা ছড়াতে পারে?
সত্যটা হলো, এ অধঃপতনের দায় কেবল কিছু বিকৃত মানসিকতার মানুষ বা একক কোনো গোষ্ঠীর নয়। দায়ী একটি ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা, বিকৃত ধর্ম ব্যবহার, দায়িত্বহীন ডিজিটাল সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং সর্বোপরি আমাদের সমষ্টিগত নীরবতা। এটি একটি সমষ্টিগত ব্যর্থতা—রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবারের।
পাঠ্যপুস্তকে বেগম রোকেয়ার নাম রাখা হয়েছে, কিন্তু তার দর্শন ধারণ করতে পারিনি। শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করানো হয়েছে জন্মসাল, কিন্তু বোঝানো হয়নি তার লেখার তাৎপর্য। নারী-পুরুষের সমতা শেখানো হয়নি জীবনের পাঠ হিসেবে, শেখানো হয়েছে পরীক্ষার প্রশ্ন হিসেবে। ফলে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রিধারীর সংখ্যা সময়ের সঙ্গে বাড়লেও মননে রয়ে গেছে মধ্যযুগ।
যে সমাজে আজও বেগম রোকেয়াকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা হয়, সে সমাজ আসলে নিজের ভেতরের ভয়, অজ্ঞতা ও সংকীর্ণতার পরিচয় দেয়। রোকেয়াকে গালি দিয়ে কেউ তাকে ছোট করতে পারে না। বরং গালি দেয়াই প্রমাণ করে— রোকেয়ার চিন্তা এখনো প্রাসঙ্গিক, এখনো শক্তিশালী, এখনো পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বিপজ্জনক।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই বেগম রোকেয়ার আদর্শ ধারণ করতে চায়, তবে তা আনুষ্ঠানিক দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নারী বিদ্বেষ, ডিজিটাল ঘৃণা ও বিকৃত ধর্মব্যাখ্যার বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক ও আইনি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বেগম রোকেয়া ছিলেন আলোর মানুষ। আলোকে যারা ভয় পায়, তারা অন্ধকারেই থাকতে চায়। বেগম রোকেয়ার আলো নিভে গেলে অন্ধকারই জিতবে—আর সেই পরাজয় হবে কেবল নারীর নয়, সমগ্র জাতির।
শাকিলা জেরিন: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










