চীনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি ধীর হওয়ায় ব্যয় কমাচ্ছেন দেশটির ক্রেতারা। সেই সঙ্গে বাড়ছে ব্যবহৃত বিলাসপণ্যের চাহিদা। তরুণ ক্রেতাদের অনেকে আবার পশ্চিমা ব্র্যান্ডের বদলে স্থানীয় ও কোরীয় ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকছেন। এতে লুই ভিতোঁ ও হারমেসের মতো আন্তর্জাতিক বিলাসী পণ্য নির্মাতারা চীনের বাজারে চাপে পড়েছে। একসময় বিশ্বের বিলাসপণ্যের বাজারে বড় ভূমিকা ছিল চীনের। বিশ্বজুড়ে বিলাসী পণ্যে মোট ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসত চীনা ক্রেতাদের কাছ থেকে। তবে এখন ক্রেতারা খরচের বিষয়ে বেশ সতর্ক। ফলে বাজার ধরে রাখতে ব্যবসায়িক কৌশল বদলাতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে।
ফরাসি বিলাসী পণ্য নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এলভিএমএইচের ব্র্যান্ড লুই ভিতোঁ গত দুই বছরে চীনের মূল ভূখণ্ডে পাঁচটি বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করেছে। এর মধ্যে সাংহাইয়ের একটি চকোলেটের দোকানও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া ফরাসি ডিপার্টমেন্ট স্টোর গ্যালারি লাফায়েত গত মে মাসে বেইজিংয়ের প্রধান শাখা বন্ধ করে দেয়।
ক্রেতাদের অভ্যাসের এ পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছেন সাংহাইয়ের একটি পুরনো বিলাসপণ্যের দোকানের ক্রেতা ইউয়ান। তিনি বলেন, ‘আগে মানুষ কে বেশি খরচ করেছেন, তা নিয়ে তুলনা করতেন। এখন কে কম দামে ভালো পণ্য কিনতে পারলেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’
আন্তর্জাতিক পরামর্শ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, চীনের মূল ভূখণ্ডে ব্যক্তিগত বিলাসপণ্যের বাজার ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। ২০২৫ সালেও বাজারটি ৩-৫ শতাংশ সংকুচিত হয়।
চাহিদার এ দুর্বলতা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রিতেও প্রভাব ফেলছে। এলভিএমএইচ সম্প্রতি জানিয়েছে, চীনে চাহিদা কমে যাওয়ায় চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তাদের ফ্যাশন ও চামড়াজাত পণ্যের বিক্রি কমেছে। অন্য বড় বিলাসী পণ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও একই ধরনের চাপ পড়তে পারে।
অন্যদিকে ব্যবহৃত বিলাসীপণ্যের বাজার দ্রুত বাড়ছে। বেইন অ্যান্ড কোম্পানির হিসাবে, ২০২৫ সালে এ বাজারের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫-২০ শতাংশ। স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনসাইট অ্যান্ড ইনফো কনসাল্টিংয়ের হিসাব অনুযায়ী, ওই বছর বাজারটির আকার ছিল ৩ হাজার ৮৪০ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ৫৭০ কোটি ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১০ হাজার কোটি ইউয়ান ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বাজারের এ পরিবর্তনের পেছনে তরুণদের পছন্দও গুরুত্বপূর্ণ। ২৪ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্সার ফিবি মা জানান, তার প্রজন্মের কাছে লুই ভিতোঁর পরিচিত নকশা এখন কিছুটা পুরনো মনে হয়। তরুণরা বরং কোরীয় ব্র্যান্ডের ফ্যাশন পণ্যে বেশি আগ্রহী।
ব্যাংক অব আমেরিকার চীনা ভোক্তাবিষয়ক গবেষণা বিভাগের প্রধান চেন লুও বলেন, ‘ক্রেতারা এখন শুধু সামাজিক মর্যাদা দেখানোর জন্য বিলাসী পণ্য কিনছেন না। পণ্যের মান, স্বতন্ত্র নকশা, ব্যক্তিগত পছন্দ ও ব্যবহারের অভিজ্ঞতাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোও বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি চীনের জনপ্রিয় চা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান মলি টির বিরুদ্ধে নকশা নকলের অভিযোগে মামলা করে এলভিএমএইচ। তবে নকশাটির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী চীনা নকশার মিল রয়েছে, এমন দাবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখনো বৈশ্বিক বিলাসপণ্যের বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে আগামী দুই-তিন বছরে দেশটি আগের মতো প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি নাও থাকতে পারে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে বিলাসপণ্যের চাহিদা আবারো বাড়তে পারে। তাই চীনা ক্রেতাদের নতুন পছন্দ ও ব্যয়ের ধরন বুঝে কৌশল সাজানোই এখন পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
খবর জাপান টুডে










