অপরাজেয় বাংলা, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, ঢাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি প্রতীকী কেন্দ্র। সেই কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে পরিচিত ভাস্কর্যগুলোর একটি ‘অপরাজেয় বাংলা’। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে পরিকল্পিত এবং ১৯৭৯ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে স্থাপিত এ ভাস্কর্যটির শিল্পী সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। কলা ভবনের সামনে ছয় ফুট বেদির ওপর নির্মিত ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট ও ব্যাস ৬ ফুট। এখানে তিনটি চরিত্র, একজন গ্রামবাংলার প্রতিনিধি, একজন শহুরে তরুণ ও একজন নারী, সমবেত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বস্তরের অংশগ্রহণকে প্রতীকায়িত করে।

ঢাবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো প্রখ্যাত ভাস্কর শামীম সিকদারের ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’। এছাড়া ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্যসমষ্টি তার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প যা কোনো একক ভাস্কর্য নয়। এটি শতাধিক ছোট ও মাঝারি ভাস্কর্যের সমাহার। ফুলার রোডে অবস্থিত এ ভাস্কর্যসমষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, বাঙালি সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের নানা মুখ একসঙ্গে উপস্থিত। স্মৃতিকে একক প্রতীকের গণ্ডি থেকে বের করে এনে দৃশ্যমান ইতিহাসপাঠে রূপ দেয়ার এটি এক সাহসী প্রয়াস। একই শিল্পীর নকশায় ভিসি চত্বরে নির্মিত ‘স্মৃতি নিরন্তন’ ভাস্কর্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্মরণে নিবেদিত। ১৪টি দেয়ালে খোদাই করা শহীদদের নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় সংগ্রামের নীরব সাক্ষ্য।

1

সংশপ্তক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

নির্মাণাধীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধনির্মিত ভবনগুলো ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনারা সামরিক ঘাঁটি ও অস্থায়ী ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করেছিল। স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে আসে সেখানকার ভবনগুলোতে নির্যাতন ও হত্যার ভয়াবহ স্মৃতি। এ প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘সংশপ্তক’ ভাস্কর্যটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। ১৯৯০ সালের ২৬ মার্চ উদ্বোধিত, ভাস্কর হামিদুজ্জামান খানের নির্মিত এ ভাস্কর্যে এক মানবাকৃতি চরিত্র এক পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লান্ত, আহত, তবু অদম্য। এটি কোনো যুদ্ধের দৃশ্য নয়। এটি মনোবলের প্রতীক, মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী আত্মপ্রত্যয়ের স্মারক।

Untitled-1

সাবাশ বাংলাদেশ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়নি। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, সরকারের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ মিছিলে সেদিন শহরে ১৪৪ ধারা জারি ছিল। সেই দিনই পাকিস্তানি দখলদার সেনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। তার স্মরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘শিক্ষক দিবস’ পালন করা হয় এবং তার নামে একটি আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়েছে। রাবি একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর রয়েছে। ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত এ ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’ তিনটি প্রদর্শনী কক্ষে বাংলাদেশের প্রারম্ভিক ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা, নির্যাতন, ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের দলিল সংরক্ষণ করে রেখেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে নিতুন কুন্ডুর নির্মিত ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ ভাস্কর্যটি।

2

বিজয় ’৭১, বাকৃবি

মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সদ্য প্রতিষ্ঠিত হলেও সেটি হয়ে ওঠে স্বাধীনতার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এর স্মৃতিবৃত্তে উজ্জ্বল হয়ে আছেন মোহাম্মদ হোসেন (বীর প্রতীক), আবদুর রব, ইফতেখার উদ্দীন মাহমুদ, ফরহাদ-উদ-দৌলা ও নাজিম উদ্দিন খান, যারা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ক্যাম্পাসে স্থাপিত সৈয়দ মোহাম্মদ সোহরাব জাহানের নির্মিত ‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্যটি একটি স্লোগান নয়, একটি যুগের সম্মিলিত উচ্চারণ। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট সময়ে আবদ্ধ নয়। স্মৃতির ধারাবাহিকতায় নতুন প্রজন্মও ইতিহাসকে নতুন ভাষায় ধারণ করে এসব স্মৃতিচিহ্নের মধ্য দিয়ে।

এ ধারাবাহিকতারই অংশ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিজয় ’৭১’ (ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চেতনা ’৭১’ (স্থপতি মোবারক হোসেন নৃপল) এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা চত্বর’ (ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী)। এসব ভাস্কর্য আজও মনে করিয়ে দেয়, কত ত্যাগ, কত তাজা প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা।