অধ্যাপক ওসামা খান। যুক্তরাজ্যে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো উপাচার্য ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রথম বাংলাদেশী। তিনি সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আগামী বছরের মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) সাবেক এ গ্র্যাজুয়েট বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটির ডেপুটি ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ইউনিভার্সিটি অব সারেতে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। অধ্যাপক ওসামা খান কেমব্রিজ, ল্যাঙ্কাস্টার ও সারেতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক ও নির্বাহী পর্যায়ে নেতৃস্থানীয় বিভিন্ন পদে কাজ করছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রধান বা ভাইস চ্যান্সেলর পদে প্রথম কোনো বাংলাদেশী নিয়োগ। শৈশবে আপনার স্বপ্ন কী ছিল। কী হতে চাইতেন?

ছোটবেলায় পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল। যতদূর আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে তখন পাঁচ বছর বয়স। ক্লাসরুমে ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা দেখতে সমস্যা হতো। বাবা-মা বুঝতে পারলেন যে আমার চোখে সমস্যা। ডাক্তার দেখানোর পর দেখা গেল যে আমার দু’চোখেই পাওয়ারে সমস্যা। বাবা আর্মি অফিসার ছিলেন, তিনি ডেকে নিয়ে বুঝিয়ে বললেন, ‘বাবা ওসামা, তোমার পক্ষে আসলে পাইলট হওয়া সম্ভব না।’ এটা নিয়ে মন খারাপ ছিল বেশ। যখন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হই তখন প্রথম দিন ক্লাসে স্যার সবার কাছে নাম, ঠিকানা, বড় হয়ে কী হতে চাই এসব জানতে চাইলেন। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে আমি দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাই। তখন ১২ বছর বয়স। এ সময় থেকেই আমারই স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করব এবং সেটা অর্থনীতি সম্পর্কিত হবে।

পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে পরীক্ষা দিই। সেখানে কেবল দুটি ব্যাচ ভর্তি হয়েছে। আমি থার্ড ব্যাচ। ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেলাম, কিন্তু আমি সেই অভাগা, যে ভাইভাতে বাদ হয়ে যাই। বিবিএতে পড়তে পারলাম না। তখন মনে হলো আমার তো আসলে অর্থনীতি পড়ার কথা। ঢাবির অর্থনীতিতে চান্স পেলাম, ১০ দিনের মতো ক্লাস করেছি। ঢাবির অর্থনীতিতে ভর্তির আগে একটা বিরতি ছিল। এ সময়ে প্রতিবেশী এক আন্টির থেকে জানতে পারি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি) নামে একটি বিশ্বিবদ্যালয় আছে যেখানে এসএসসি, এইচএসসিতে বোর্ড স্ট্যান্ড করা ছাত্রদের ফ্রি পড়ায়। আমি ফুল স্কলারশিপ পেয়ে আইইউবিতে ক্লাস শুরু করে দিই ঢাবির অর্থনীতিতে ক্লাস শুরু করার আগেই। আমার মা সে সময় কান্নাকাটি করেছেন, এটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হলো। অনেকেই বাবাকে বলল শফিক সাহেবের ছেলে একটা উদ্ভট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আমি ছোট ছিলাম। কিন্তু আমি বলেছি আমি ঢাবিতে পড়ব না। কারণ আমার পরিবেশটা তখন পছন্দ হয়নি। আমি ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়েছি। আইইউবির সুশৃঙ্খল পরিবেশের প্রেমে পড়ে যাই। সত্যি কথা বলতে আমার জীবনে এটা একটা বড় সিদ্ধান্ত ছিল।

নিশ্চয়ই দীর্ঘ ও কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার পর আপনাকে উপাচার্য পদের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে কোন প্রক্রিয়ায় উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়? বাংলাদেশের সঙ্গে যদি তুলনা করে বলতেন।

যুক্তরাজ্যে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠোরতম ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। হেডহান্টিং কোম্পানি আছে যাদের কাজই হচ্ছে গ্লোবাল ট্যালেন্ট থেকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পদবিটার সবচেয়ে যোগ্য মানুষ খুঁজে বের করা। গ্লোবালি ওটাকে অ্যাডভার্টাইজ করা হয়। তারা নিজেরাও প্রো-অ্যাকটিভভাবে অনেকের দরজায় নক করে সেটা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা ইউরোপ। ঠিক একইভাবে আমার দরজায়ও কোম্পানি নক করে বলেছে আপনার একটা সম্ভাবনা আছে, আগ্রহী কিনা আবেদন করতে। আবেদনের পর থেকে ফাইনাল ইন্টারভিউর মধ্যে আমার ২৯টা ইন্টারভিউ হয়েছে। এ ইন্টারভিউগুলোর মধ্যে এমনও ইন্টারভিউ আছে, যেখানে আমাকে একজন বিবিসির সাংবাদিকের কাছে ৫ মিনিটের ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে। এটা যেমন একটা টেস্ট ছিল, আরেকটা ছিল আগামী পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে হবে তার ওপর একটা প্রেজেন্টেশন তৈরি করা। ১৯ জন মানুষের সামনে এটি উপস্থাপন করতে হয়েছে। তারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসেননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকেও এসেছেন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিল সদস্য, ওয়েলসের বড় ব্যবসায়ী, ওয়েলসের যে রেগুলেটরি আছে ইউজিসির মতো সেখান থেকেও এসেছেন। তারা আমার ইন্টারভিউ করে প্রেজেন্টেশনের ওপর ৯০ মিনিট নানা প্রশ্ন করেছেন।

প্রেজেন্টেশনের পর ছাত্রদের সঙ্গে আমার সময় কাটাতে হয়েছে। প্রায় ১৫ জন ছাত্র বিভিন্ন বিষয়ে আমাকে ৯০ মিনিট ধরে জেরা করেছে। তারা জানতে চেয়েছে কীভাবে তাদের জীবন গড়া হবে, খাবারের ব্যবস্থা কী রকম হবে, জিমনেশিয়াম থাকবে কী রকম, আন্তর্জাতিক ছাত্র-ছাত্রী যারা আসবে তাদের নিয়ে আমার ভাবনা কী। এমন কোনো প্রশ্ন নেই যেটি শিক্ষার্থীরা করেনি। সেগুলোর উত্তর দিতে হয়েছে।

ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা কাউন্সিল থাকে যেটাকে বোর্ডও বলা হয়, কাউন্সিলও বলা হয়। বোর্ডের যে চেয়ার তিনি একজন নন এক্সিকিউটিভ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনভোগী না। তিনি হয়তোবা একজন বিশাল ব্যবসায়ী বা বড় সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট অথবা এমন একজন মানুষ যার বড় প্রতিষ্ঠান চালানোয় অনেক অভিজ্ঞতা আছে। এ রকম একজনকে এ চেয়ারে নিয়োগ দেয়। তারা হচ্ছেন ভাইস চ্যান্সেলরের বস। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার রিপোর্টিং বস বোর্ড অব গভর্নরসের ডেপুটি চেয়ারম্যান ও ইনডিপেনডেন্ট গভর্নর রিচার্ড। তিনি একাধিকবার আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, জানতে চেয়েছেন আমার শিক্ষানীতি কী হবে, গবেষণা নিয়ে আমার ভাবনা, কীভাবে অর্থায়নের ব্যাপারটা চিন্তা করছি, গ্র্যাজুয়েটদের চাকরি দেয়ার জন্য আমার চিন্তা কী, ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান কী। প্রত্যেক এক্সিকিউটিভ মেম্বার ও ডিনদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলতে হয়েছে। এমনকি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের পর আমার কী কী শিখতে হবে এ বিষয়েও এরই মধ্যে লেখা হয়েছে, যা দায়িত্ব নেয়ার পর শিখতে হবে।

প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্ন্যান্সের মধ্যে লেখা আছে কীভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হবে। এখানে সিনেট, কাউন্সিল সদস্য, শিক্ষক, প্রফেশনাল সার্ভিসের লোকজন, স্টুডেন্ট এবং স্টেকহোল্ডার সবাই থাকেন বিভিন্ন পর্যায়ে। খুব স্বাধীনভাবে নিয়োগটা সম্পন্ন হয়। সরকারের কোনো হাত নেই। আমি এখানে কনজারভেটিভ পার্টি না লেবার পার্টি করি সেটি কেউ দেখবে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা বাংলাদেশে এ গভর্ন্যান্স লিখিতভাবে হয়তোবা নেই বা থেকে থাকলেও অনুসরণ করা হয় না এবং সাংঘাতিকভাবে সরকারি ইনফ্লুয়েন্স থাকে যেটা আমি প্রাইভেট ও পাবলিক দুই সেক্টরে দেখেছি।

দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য কিংবা রেজিস্ট্রার পদে বিদেশী একাডেমিশিয়ানদের নিয়ে আসার দৃষ্টান্ত রয়েছে। আবার এদিকে উন্নত একটি দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

ব্যক্তিগতভাবে উচ্চশিক্ষার গ্লোবাল ট্যালেন্ট মুভমেন্টকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখি। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হচ্ছে সবচেয়ে ট্যালেন্টেড মানুষগুলোকে একসঙ্গে করা। সেটা শিক্ষক হোক, ছাত্র কিংবা উপাচার্য। ট্যালেন্টেড মানুষকে একসঙ্গে করে একটা পরিবেশ দেয়া যে পরিবেশে তারা একজন আরেকজনের কাছ থেকে শিখতে পারে। গ্লোবাল মুভমেন্ট থাকা একটা পজিটিভ জিনিস। সেটাতে বাংলাদেশেও উপকৃত হবে। আবার বাংলাদেশের মানুষ যখন বিদেশের কোনো ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে আমার মতো একাডেমিক হিসেবে কাজ করে তাদেরও এখান থেকে শেখার আছে। কারণ আমি তো বাংলাদেশী। আমার অফিসে ঢোকা মাত্র আপনি বুঝে যাবেন যে আমি বাংলাদেশী এবং আমি মুসলিম। মানে এ আইডেন্টিটিটা আমার জন্য বিশাল গর্বের ব্যাপার। আমি এটা লুকিয়েও রাখি না। আমার বর্তমান রিপোর্টিং বস উপাচার্য সার্বিয়ান, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় বড় হয়েছেন। তার সার্বিয়া কালচার ও অস্ট্রেলিয়ান অভিজ্ঞতার সমন্বয় কোনো ব্রিটিশ একাডেমিকের কাছ থেকে পাব না। এই যে বিভিন্ন মানুষের কালচার, চিন্তাধারা একটা জায়গায় আনা এটাই গ্লোবালাইজেশন এবং মনুষ্যত্বের জন্য একটা বিশাল ব্যাপার। আমি এটাকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখি। এটার অর্থ এই নয় যে দেশে কোনো ট্যালেন্ট পাওয়া যায়নি। দেশ থেকে চলে যাচ্ছে এভাবে চিন্তা করা আমার মতে ঠিক না। বরং আমি বলব এভাবে চিন্তা করাটা খানিকটা সাম্প্রদায়িক।

দেশে প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্যের মূলধারার বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে যেতে কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন?

বাংলাদেশের যে বিষয়টা আমাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে ফেলেছে সেটা হচ্ছে অ্যাসপিরেশন বা স্বপ্ন দেখা। জীবনে বড় কিছু হওয়ার ইচ্ছা। আমাদের দেশে এত মানুষ, শত সমস্যা, দারিদ্র্য, পলিটিক্যাল করাপশন—সবকিছুর মাঝে আমরা কেন জানি স্বপ্ন দেখা ভুলে যাই। আমার কিন্তু মনে হয় না আমার এডুকেশন সিস্টেম আমার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে আমি প্রতিদিন যা করি সেটা আমার ক্যাডেট কলেজের শিক্ষা। যেমন আমি প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৪টায় ঘুম থেকে উঠি। ১২ বছর বয়স থেকে শুরু হয়েছে ক্যাডেট কলেজে, আজ আমার ৫০ বছরে সেই অভ্যাসটা যায়নি। আমার কখনো মনে হয়নি ক্যাডেট কলেজ বা ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষা আমাকে গ্লোবাল প্লাটফর্মে প্রতিযোগিতা করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

আমার সবচেয়ে বড় ডিজঅ্যাডভান্টেজ ছিল স্বপ্ন দেখতে না পারা। আমি যে প্রফেসর বা উপাচার্য হতে পারব, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দেশের হাজার ট্যালেন্টেড মানুষের সঙ্গে এক সারিতে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারব—এ আত্মবিশ্বাস, ইন্সপিরেশন জোগাড় করতে হয়েছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমার অনেক কাজ করতে হয়েছে। আমি আমার মতো মানুষকে এ রকম কিছু করে উঠতে দেখার মতো মানুষ খুঁজে পাইনি। অধ্যাপক অমিত চাকমা বাংলাদেশের প্রথম মানুষ যিনি আন্তর্জাতিক কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন। তিনি কানাডায় হয়েছেন। আমি ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে প্রথম উপাচার্য। পুরো বিশ্বে চিন্তা করলে বাংলাদেশের বাইরে প্রথম উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক অমিত চাকমা।

২০০৯ সাল থেকে আমি তাকে ফলো করে আসছি। কোথায় যাচ্ছেন, কী করেন, কোন কনফারেন্সে গিয়ে কী বলেন—আমি এটা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছি। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে এই বাংলাদেশী যদি পারেন, আমি কেন পারব না। কিন্তু আমার উদাহরণ একটা। যদি ভারতের দিকে তাকান, দেখবেন উদাহরণ শতটা। আমরা যখন আমাদের মতো কোনো মানুষকে বড় স্বপ্ন দেখে বড় জায়গায় পৌঁছতে দেখি—এটা আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন লেখাপড়া করেছি, নোবেলজয়ী দুজন শিক্ষকই ছিলেন আমার শিক্ষক। ব্রিটিশ স্টুডেন্টদের জন্য স্বপ্ন দেখা কোনো ব্যাপার না। আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা স্বপ্ন দেখতে না পারা। এইটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ছোটবেলায় শুনতাম ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখো না। এ ধরনের কথা নিষিদ্ধ করে দেয়া উচিত। আমার কাঁথা ছেঁড়া হোক তাতে কী আসে যায়, আমার স্বপ্ন বড় হতে হবে। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েই লাখ টাকার স্বপ্ন দেখতে হবে।

একজন একাডেমিশিয়ান ও প্রশাসক হিসেবে দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই। বিশেষ করে কারিকুলাম, পাঠদান, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান সংকট কী?

বাংলাদেশের শিক্ষার একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, এখনো রোট লার্নিংকে প্রমোট করা হয়। রোট লার্নিং হচ্ছে মুখস্থ করা আর পরীক্ষা দেয়া। বাংলাদেশের কারিকুলাম স্কিলভিত্তিক নয়। একটা শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি মুখস্থনির্ভর। পরীক্ষা দিয়ে গুণগত মান যাচাই করা হয়, কে কী শিখতে পারল, কী পারল না সেটা দেখা হয় না। আমার মতে, এটা একটা ব্যাকডেটেড কারিকুলাম। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যেখানে ফাইনাল পরীক্ষার বড় ভূমিকা থাকবে না। ধারাবাহিক ফিডব্যাক থাকবে। প্রকল্প বা টিমওয়ার্ক-ভিত্তিক, প্রজেক্ট-ভিত্তিক রিফ্লেক্টিভ অ্যাসাইনমেন্ট থাকবে। যে অ্যাসাইনমেন্টগুলোতে ছাত্রছাত্রীরা একত্র হয়ে একটা সামাজিক বা অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান বা প্রযুক্তির সমস্যার সমাধান করবে। এ সমাধানের মাধ্যমে তাদের যাচাই-বাছাই করা হবে—ভালো ইঞ্জিনিয়ার, ভালো আর্কিটেক্ট না ভালো ডাক্তার। কারিকুলামকে স্কিলভিত্তিক করা উচিত। এমনভাবে যে নৈতিকতা এবং সমাজ সম্পর্কে চিন্তা করার সুযোগ দেয়া। নাগরিক হিসেবে, পরিবার, কমিউনিটি বা দেশ নিয়ে আমার দায়িত্ব কী। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ, ক্রিয়েটিভিটি লিডারশিপ, এনভায়রনমেন্টাল সাসটেনেবিলিটি। শিক্ষার্থী যে সাবজেক্টেরই হোক—এগুলো পড়তেই হবে।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী বলে মনে করেন? আমরা কেন পিছিয়ে?

একটা বড় বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের কারিকুলাম এখনো খুব কনটেন্ট ফোকাস। কারিকুলাম যখন রিভিউ হয় বা কারিকুলামের কোয়ালিটি যখন যাচাই করা হয়—এটা যাচাই করা হয় যে কী পরিমাণ কনটেন্ট ভেতরে আছে। কোয়ান্টিটি অ্যান্ড ভলিউম অব কনটেন্ট ইজ আ মেজর অব কোয়ালিটি। কিন্তু এটা আসলে কোয়ালিটি শিক্ষা নয়। শুধু কনটেন্ট না কীভাবে ক্লাসরুমে পাঠদান হবে, কী ধরনের প্রজেক্ট দেয়া উচিত কিংবা কীভাবে ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কারিকুলামে যুক্ত করা হবে—এগুলোর বিশাল দুর্বলতা আছে। আরেকটি বিষয় হলো সফট স্কিল। আমি মানুষের সঙ্গে ইন্টারেক্ট করতে পারি কিনা, টিমওয়ার্ক করতে পারি কিনা, ভালো সিটিজেন কিনা। শিক্ষার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো ভালো মানুষ হওয়া। বাংলাদেশের কারিকুলামে এ বিষয় নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করা হয় না। এই যে বাংলাদেশে করাপশন নিয়ে আমরা এত কথা বলি। আমরা তো এগুলো নিয়ে কিছু শেখাই না ক্লাসরুমে। মানবিক শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা আমাদের কারিকুলামে থাকতে হবে। একাডেমিয়া ইন্ডাস্ট্রির কোলাবরেশন বাংলাদেশে হচ্ছে না। ক্লাসরুম এখনো ডিরেক্টিভ। কীভাবে এটাকে ইন্টারেক্টিভ এবং প্রবলেম সলভিং পদ্ধতিতে শেখানো যায় যেটা আমাদের পেশা জীবনে কাজে লাগবে—এ বিষয়ে এখনো পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার মান ও গুরুত্ব কেমন দেখতে পান এবং এটি কীভাবে উন্নয়ন করা যায়?

গবেষণার একটা বড় আঙ্গিক হচ্ছে একাডেমিক ফ্রিডম। আমার এখানে শিক্ষকরা রিসার্চ করেন—কোন বাছ বিচার নেই। আমরা কখনো চিন্তা করিনি গবেষণা কেন করছে, কী কাজে দেবে। স্টিফেন হকিং ব্ল্যাকহোল আবিষ্কার করেছেন। তাতে মনুষ্যত্বের কী এসে যায়। যারা ফিজিকস নিয়ে কাজ করেন, পিওর কেমিস্ট্রি বা যারা ফাইন আর্টস নিয়ে কাজ করেন—দেখে মনে হতে পারে এটা দিয়ে কী হবে। এটা দিয়ে মনুষ্যত্বের কী হবে। এ চিন্তা করলে হবে না, সবার স্বাধীনতা থাকতে হবে যে আমি যা নিয়ে জানতে চাই এটা মনুষ্যত্বে জ্ঞানের বিকাশ ঘটাবে। এই কালচার তৈরি করা গবেষণার জন্য একটা বড় বিষয়। আরেকটা বড় বিষয় গবেষণার রিসোর্স, অবকাঠামো এবং বাজেট থাকা। সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ইকুইপড ল্যাব, পিএইচডি স্টুডেন্ট এবং নতুন যারা গবেষণায় আসছে তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি বাংলাদেশে খেয়াল করেছি, দুর্ভাগ্যক্রমে কোনো কোনো ল্যাবে গেলে মনে হবে এটা বোধহয় আশির দশকের ল্যাব। বুয়েটে আমাদের দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা পড়ে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, ১০ বছর আগে বুয়েটের ল্যাবে গিয়ে আমার মন ভেঙে গেছে। খুবই ধুলো পড়ে আছে, ইকুইপমেন্টগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে, এগুলো কেউ কোনোদিন ধরেনি এবং ইকুইপমেন্টগুলো হয়তোবা এত পুরনো যে ওটা শেখারও কোনো মানে হয় না। এত পুরনো জিনিস শেখাবেন যে ওটাতে কোনো স্কিলই ডেভেলপ করবে না। কারিকুলাম ডেভেলপ করার চেয়েও ব্যয়বহুল কাজ হচ্ছে গবেষণা। এটা সরকারি পর্যায়ে অর্থায়ন থাকতে হবে। ব্রিটেনের বাজেটের কত শতাংশ গবেষণায় দেয়া হবে তা ঠিক করা আছে। গবেষণার যে বাজেটটা তৈরি করা হবে সেটা পলিটিক্যাল অ্যাফিলিয়েশন দেখে দেয়া হবে না। বাজেটটা গুণগতভাবে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেয়া হবে। বাংলাদেশে গবেষণার একটা বড় বিষয় হচ্ছে পাবলিশ করার সংখ্যা—কে কতটা পাবলিশ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমার গবেষণা দিয়ে কোনো মানুষের জীবনের উন্নতি হলো কিনা।

বাংলাদেশী তরুণদের জন্য আপনার বার্তা কী...

নিজের জন্মভূমি নিয়ে আমাদের তরুণরা যাতে কখনো হীনম্মন্যতায় অথবা অতিরিক্ত পরিমাণে আত্মতুষ্টিতে না ভোগে। বড় স্বপ্ন দেখতে হবে যাতে বড় কাজ করতে পারি। সেলফ ক্রিটিক হতে হবে। স্টিভ জবস এক কনভোকেশনে ভাষণে বলেছিলেন, ‘ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো’। এমন অডসিটি থাকা উচিত যে আমি বাংলাদেশী হয়ে প্রথম মানুষ হব যে নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর্টিস্ট হব, যার পেইন্টিং বড় বড় গ্যালারিতে থাকবে; এ ধরনের স্বপ্ন দেখা। তৃতীয় বিশ্বের দেশে জন্ম হয়েছে বলে আমার আর কোনো উপায় নেই—এই হীনম্মন্যতায় ভোগা যাবে না। চিন্তা ও স্বপ্ন বড় হতে হবে। দেশের তরুণদের চিন্তা করতে হবে—তাদের প্রতিযোগিতা শুধু লন্ডন, টরন্টোতে, সিডনিতে, টোকিওর সঙ্গে নয় বরং পুরো পৃথিবীর সঙ্গে। জ্ঞান, দক্ষতা, ভাষা, প্রযুক্তি ও চারিত্রিক গুণ দিয়ে প্রতিযোগিতায় নিজের অবস্থান জানান দিতে হবে।