পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি দক্ষ ও আধুনিক প্রজন্ম গড়তে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, আর অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের স্বপ্নগুলোই-বা কী, তা নিয়ে প্রশ্ন এখন সময়ের দাবি। দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল স্বপ্নচারী শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের দৃষ্টিতে আগামীর শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা

শিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব
মুরছালিন মাহমুদ খান
শিক্ষার্থী, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড এবং তারুণ্য সেই জাতির প্রাণশক্তি। তাই একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে আমার প্রধান প্রত্যাশা হলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক করে গড়ে তোলা যাতে তরুণ প্রজন্ম কেবল চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং দায়িত্বশীল ও চিন্তাশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। প্রথমত, শিক্ষার মানোন্নয়ন সবচেয়ে জরুরি। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে মুখস্থনির্ভরতার বদলে বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে ওঠে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিতের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা বৃদ্ধি না করলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করা সরকারের বড় দায়িত্ব। শহর ও গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য, ধনী-গরিবের সুযোগের ফারাক কমাতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক স্কুল-কলেজ স্থাপন, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বৃত্তির ব্যবস্থা জরুরি। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে নিরাপদ পরিবেশ ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্যোক্তা দক্ষতা ও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণে দক্ষ করে তুলতে হবে। এতে করে তারা দেশেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে ও বেকারত্ব কমবে।

গবেষণা ভাতা ও অনুদান ব্যবস্থা চালু করা জরুরি
মোফাজ্জল ইবনে রুকন
শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
আগামীর বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষা ও তারুণ্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। এ শক্তিকে কার্যকর করতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগোপযোগী ও গবেষণাভিত্তিক সংস্কার অপরিহার্য। নির্বাচিত সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা শিক্ষাকে কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। বিশেষ করে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করে তুলতে গবেষণা ভাতা ও অনুদান ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এতে শিক্ষার্থীরা আগেভাগেই গবেষণামুখী মানসিকতা গড়ে তুলতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক মানের কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত হবে। পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল কিউ-১ জার্নাল ও গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ডেটাবেজে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন, যা বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য ব্যয়বহুল ও সীমিত। তারুণ্য আজ তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বেড়ে উঠছে। তাই কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি হলে শিক্ষিত বেকারত্ব কমবে, কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলবে। এছাড়া আধুনিক বিশ্বের চাহিদা বিবেচনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিকস ও অ্যারোনটিকসের মতো ডিপার্টমেন্ট চালু করা এখন সময়ের দাবি। এসব বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ আরো সক্ষম হবে।

গবেষণানির্ভর ও মানবিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে
জান্নাতুল ফেরদৌস
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের শিক্ষার মান ও উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় বসে যখন চারপাশ দেখি, তখন উপলব্ধি হয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল ‘সনদধারী’ তৈরি করছে, ‘জ্ঞানান্বেষী’ নয়। বর্তমানে শিক্ষার প্রধান সংকট হলো এর বাণিজ্যিকীকরণ ও বাজারের সঙ্গে পাঠ্যক্রমের যোজন যোজন দূরত্ব। আমরা এক অদ্ভুত ‘বিসিএস-কেন্দ্রিক’ শিক্ষাকাঠামোয় বন্দি, যেখানে মৌলিক গবেষণা ও সৃজনশীলতার চেয়ে মুখস্থবিদ্যার কদর বেশি। ফলমুখী শিক্ষার অভাব এবং জিপিএ-কেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ফলে উচ্চশিক্ষিত হয়েও অনেক তরুণ বাস্তবমুখী কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়ছেন। আবার শহর ও গ্রামের শিক্ষা বৈষম্য ডিজিটাল বিভাজনকে আরো স্পষ্ট করেছে।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও চিন্তার উৎকর্ষ সাধন হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষার পাঠ্যসূচি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আজও অপাঙ্ক্তেয়। এ বৃত্ত থেকে বের হতে হলে আমলাতান্ত্রিক শিক্ষানীতি বাদ দিয়ে ‘গবেষণানির্ভর’ ও ‘মানবিক’ শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। কেবল প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক চিন্তার বিকাশে ল্যাবরেটরি ও লাইব্রেরি সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই কেবল বাড়বে। শিক্ষা হোক মুক্তি ও প্রজ্ঞার হাতিয়ার, যা কেবল চাকরি নয় বরং জাতীয় সংকটে সমাধান দিতে সক্ষম নেতৃত্ব তৈরি করবে।

দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা হোক
জান্নাতুল নাঈম
শিক্ষার্থী, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে হাওয়া বইছে, সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। নতুন সরকারের কাছে আমার প্রধান দাবি—বিগত স্বৈরাচারী সরকারের চাপিয়ে দেয়া বর্তমান ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম (কারিকুলাম) পুরোপুরি বাতিল করা। এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পরিবর্তে তাদের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে আগের কার্যকর শিক্ষাক্রম ফিরিয়ে আনা এবং নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক মেধা মূল্যায়ন পদ্ধতি পুনর্বহাল করা জরুরি। যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া প্রকৃত মেধাবী ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি অসম্ভব।
একই সঙ্গে একটি রাষ্ট্রকে উন্নত করতে হলে মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পর্যাপ্ত শিক্ষকের চরম সংকট রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা আমাদের জন্য উদ্বেগের। আগামীর সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, অবিলম্বে এ শিক্ষক সংকট নিরসন করে দক্ষ ও সৎ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা হোক। শিক্ষকরাই মানুষ গড়ার কারিগর; তারা যদি আদর্শিক হন, তবেই ছাত্ররা দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার শিক্ষা পাবে। আমরা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যা আমাদের শিক্ষিত করার পাশাপাশি প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি
মুবাশ্বিরা তাসনীম
শিক্ষার্থী, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের প্রধান হাতিয়ার হলো যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা। আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে নির্বাচিত সরকারের কাছে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রধান প্রত্যাশা হলো শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল ও গুণগত সংস্কার। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকাংশেই সনদসর্বস্ব, যা দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কারিকুলামকে তাত্ত্বিক আলোচনার গণ্ডি থেকে বের করে প্রায়োগিক ও কর্মমুখী করা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের বা জিডিপির অন্তত ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। দেশের উচ্চশিক্ষার একটি বিশাল অংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনা করলেও তারা প্রায়ই সরকারি অনুদান, গবেষণা তহবিল এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা এবং উচ্চতর গবেষণায় ইউজিসির মাধ্যমে পর্যাপ্ত ফান্ড নিশ্চিত করা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় লেজুড়বৃত্তি রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে মুক্তবুদ্ধি চর্চা, মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং সেশনজটমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও আধুনিক ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যা আমাদের কেবল দক্ষ পেশাজীবী নয়, বরং দেশপ্রেমিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।










