নিরাপদ জীবনযাপনের ওপর সার্বক্ষণিক এক অদৃশ্য হুমকি হয়ে আছে সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতিদিনই দেশ-বিদেশে অসংখ্য মানুষ অকারণে আহত হচ্ছে, কেউ হারাচ্ছে জীবনের গতি, কারো পরিবারে যোগ হচ্ছে নতুন শোকের বোঝা। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কও তার ব্যতিক্রম নয়। এ পথ যেন প্রতিনিয়ত হয়ে উঠছে শোকের ভার বহনকারী এক ভয়াল সড়ক। গত বছর এ সড়কেই বাসের ধাক্কায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু পুরো ক্যাম্পাসকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছিল। সেই বেদনাদায়ক ঘটনার তীব্রতা গভীরভাবে নাড়া দেয় চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী তাসনিম বিনতে আহসান অনন্যাকে। সেই ঘটনা থেকেই তার মনে জন্ম নেয় দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োগযোগ্য একটি বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরির স্বপ্ন।

এ ভাবনা থেকেই তিনি তৈরি করেন উদ্ভাবনী প্রকল্প—‘একটি ছোট যাত্রা—কাপ্তাই রোডের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।’ সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে এ প্রকল্পই পরে তাকে নিয়ে যায় জাতীয় পর্যায়ে, যেখানে হোন্ডা ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘থ্রি জিরো টেকাথন’ প্রতিযোগিতায় ‘দুর্ঘটনাবিহীন’ ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জিতে নেন ৫০ হাজার জাপানিজ ইয়েন।

টেকাথনে পরিবহনকে কেন্দ্র করে তিনটি ক্যাটাগরি রাখা হয়—‘যানজটমুক্ত’, ‘দুর্ঘটনাবিহীন’ ও ‘সুব্যবস্থাপনা’। অনন্যা অংশ নেন দুর্ঘটনাবিহীন ক্যাটাগরিতে যেখানে বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট, ঢাবিসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০টিরও বেশি দল থেকে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। সেখান থেকে তিন ক্যাটাগরিতে মোট ১৮টি দলকে চূড়ান্ত পর্বের জন্য মনোনীত করা হয়। ১ নভেম্বর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে চূড়ান্ত পর্বের প্রতিযোগীদের জন্য ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয় এবং পরদিন একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয় মূল প্রতিযোগিতা। প্রেজেন্টেশনের ভিত্তিতে বিজয়ী ঘোষণার সময় হোন্ডা ফাউন্ডেশনের সভাপতি হিরোতো ইশিদা অনন্যার হাতে সম্মাননা হিসেবে ৫০ হাজার ইয়েনের চেক তুলে দেন।

অনন্যার প্রকল্পের প্রধান ছিল একটি বিশেষ ধরনের স্মার্ট হেলমেট তৈরির প্রস্তাব। এ হেলমেট মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণ, রাইডারকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ এবং দুর্ঘটনা ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরুরি সংকেত পাঠানোর সক্ষমতা রাখবে—এমন এক সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে চিন্তা করা হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তরুণদের দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো ও অধিকাংশ সময় হেলমেট না পরার প্রবণতাকে বিবেচনায় নিয়েই তৈরি হয় এ ধারণা। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য বিশেষ ক্লাব গঠন, দুর্ঘটনায় আহতদের তথ্য তালিকাভুক্ত করে ওয়েবসাইটে সংরক্ষণ এবং কাপ্তাই সড়কে গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও ডিভাইডার স্থাপনের মতো করণীয় বিষয়গুলোও প্রকল্পে যুক্ত করেন তিনি।

অনন্যা বলেন, ‘এ প্রকল্প তৈরির পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে গত বছর মোটরসাইকেল-বাস সংঘর্ষে চুয়েটের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা। এ বিষয়টি আমাকে বেশ নাড়া দেয়। তখন থেকে আমি চিন্তা করি এমন একটি প্রকল্প তৈরি করব, যা তরুণদের সচেতনতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া চুয়েটে আসা-যাওয়ার পথে কাপ্তাই সড়কে (যা বাংলাদেশের বেশকিছু পর্যটন কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক) প্রয়োজনীয় গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিংবা ডিভাইডার, চেকপোস্ট পরিলক্ষিত হয় না। এসব স্থাপন করাও অত্যন্ত জরুরি। আমার প্রকল্পে এসব স্থাপন করার ব্যাপারেও বেশ জোর দিয়েছি।’

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করার অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে পেরে খুব ভালো লাগছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ফাঁকে সময় বের করে প্রতিযোগিতার জন্য স্লাইড রেডি করা, সে অনুযায়ী সময় দেয়া—এসব বেশ পরিশ্রমের ছিল। তবু সবশেষে সফল হতে পেরে ভালো লাগছে। আলহামদুলিল্লাহ।’