দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে একসময় অন্যতম অভিযোগ ছিল ভাড়া বাড়িতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা। এ সমস্যা দূরীকরণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার অন্যতম শর্ত হিসেবে সাত বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে জমি ক্রয়, ক্যাম্পাস নির্মাণসহ নানা জটিলতায় বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই আবেদনের মাধ্যমে এ সময় একাধিকবার বর্ধিত করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

ইউজিসির প্রতিবেদনে ২০১৭ ও ২০২৩ সালের তুলনামূলক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সালে যেখানে দেশে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৯৫টি, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪টিতে। তবে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে স্থায়ী ক্যাম্পাসে ফেরার ক্ষেত্রে। ২০১৭ সালে মাত্র ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনা করত, যা ২০২৩ সালে তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ৪৯টিতে উন্নীত হয়েছে।

শিক্ষার পরিবেশ ও গুণগত মানের অন্যতম নির্দেশক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতেও সামান্য উন্নতি হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রতি ২২ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক (১:২২) থাকলেও ২০২৩ সালে এ অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১:২১-এ। এছাড়া বেড়েছে শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ বা শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণও। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সালে যেখানে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ছিল ৮১ হাজার ১৮২ টাকা, ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৮৪ হাজার ৪০৫ টাকা হয়েছে।

ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সনদপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ তে। সনদপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো— আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি। এছাড়াও অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এবং বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং, আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি সনদপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় ৩৫টি। সেগুলো হলো নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি), আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, বিজিবি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। এছাড়াও গ্রীন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি), ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়, নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কুমিল্লা।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘমেয়াদে মানসম্পন্ন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায়, তবে তার জন্য স্থায়ী ক্যাম্পাস তথা প্রতিষ্ঠানের একটি স্থায়ী ঠিকানা গুরুত্বপূর্ণ। যখন স্থায়ী ক্যাম্পাসের বাধ্যবাধকতা থাকে, তখন কেউ চাইলেই যত্রতত্র একটি প্রতিষ্ঠান খুলে পরিচালনা করতে পারে না। আমরা বিভিন্ন সময়ে সনদ বাণিজ্যের যে অভিযোগ দেখি, সেটি কিন্তু মূলত এমন সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো নামমাত্র কিংবা অনেকটা সাইনবোর্ডসর্বস্ব। স্থায়ী ক্যাম্পাসধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন করার সুযোগ নেই। আবার স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলোরও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সহজ হয়। তাই সার্বিকভাবে স্থায়ী ক্যাম্পাস দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য একটি ইতিবাচক বিষয়।