বাংলাদেশের কৃষিতে ইউরিয়া সারের ভূমিকা অপরিহার্য। ফসলের বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে কৃষকের প্রথম পছন্দ ইউরিয়া। তবে প্রচলিত দানাদার ইউরিয়ার একটি রূঢ় বাস্তবতা হলো জমিতে প্রয়োগকৃত সারের প্রায় ৬০ শতাংশই নানাবিধ কারণে নষ্ট হয়ে যায়। এ বিশাল অপচয়ের ফলে একদিকে যেমন কৃষকের পকেট খালি হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এ অপচয়িত সার পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এ সংকটময় পরিস্থিতিতে আশার আলো দেখাচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। তারা প্রথমবারের মতো দেশে উদ্ভাবন করেছেন ‘ন্যানো বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া’। গবেষকদের দাবি, এ নতুন উদ্ভাবন ইউরিয়া সারের অপচয় অন্তত ২৫ শতাংশ কমাবে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি নিশ্চিত করবে।

গবেষণার নেপথ্যে ও গবেষক দল

২০২৩ সাল থেকে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) আর্থিক সহায়তায় এ বৈপ্লবিক গবেষণাটি শুরু হয়। গবেষক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান। দলটিতে আরো যুক্ত আছেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ খোরশেদ আলম, পরমাণু শক্তি কমিশনের সিএসও ড. শেখ মনজুরা হক, বাকৃবির মৃত্তিকা বিভাগের অধ্যাপক ড. তাহসিনা শারমিন হক এবং পিএইচডি ফেলো মো. আমজাদ হোসেনসহ অন্য মেধাবী গবেষকরা।

প্রচলিত ইউরিয়া ও ন্যানো সার

অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান জানান, বর্তমানে বাজারে প্রচলিত দানাদার ইউরিয়ার নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা অত্যন্ত কম। প্রয়োগকৃত সারের একটি বড় অংশ অ্যামোনিয়া গ্যাস হয়ে বাতাসে উড়ে যায় কিংবা পানির সঙ্গে মিশে মাটির নিচে চলে যায়। ফলে গাছ পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে কৃষককে বারবার সার প্রয়োগ করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটি দূষিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অপচয়িত এ নাইট্রোজেন নাইট্রাস অক্সাইড হিসেবে নির্গত হয়, যা কার্বন-ডাই-অক্সাইডের চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস। বৈশ্বিকভাবে এর ফলে বছরে ২৬ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এ সমস্যার মোক্ষম সমাধান হতে পারে বাকৃবির এ উদ্ভাবিত ন্যানো সার।

বায়োচার ও ন্যানো বায়োচার

উদ্ভাবিত এ সারটি সাধারণ ন্যানো ইউরিয়া নয়, বরং এটি বায়োচার কোটেড। বায়োচার হলো কৃষি বর্জ্য (খড়, ডালপালা) অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে উচ্চ তাপে পুড়িয়ে (পাইরোলাইসিস) তৈরি এক ধরনের বিশেষ জৈব কয়লা। এটি স্পঞ্জের মতো ছিদ্রযুক্ত এবং মাটিতে পুষ্টি ধরে রাখতে অত্যন্ত কার্যকর। যখন এ বায়োচারকে ন্যানো আকারে (১-১০০ ন্যানোমিটার) এনে ইউরিয়ার ওপর প্রলেপ দেয়া হয়, তখন এটি ইউরিয়াকে দ্রুত গলতে দেয় না। ফলে সারটি ‘স্লো-রিলিজ’ বা ধীরগতিতে কাজ করে এবং গাছ তার প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে।

উদ্ভাবনের বিস্ময়কর সুফল

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ন্যানো বায়োচারসমৃদ্ধ ইউরিয়া ব্যবহারের বহুমুখী সুবিধা রয়েছে। প্রচলিত সারের তুলনায় কমপক্ষে ২৫ শতাংশ ইউরিয়া কম লাগবে। নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা ৭৫-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অ্যামোনিয়া অপচয় ৮০-৯০ শতাংশ এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ৪০-৫০ শতাংশ কমে যায়। ধানের ফলন ১০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং ফসলের প্রোটিন গুণমান ৮-১২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বায়োচার মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায় এবং উপকারী অণুজীবের কার্যক্রম সক্রিয় করে।

গবেষণাগার থেকে মাঠ পর্যায়

পিএইচডি ফেলো মো. আমজাদ হোসেন জানান, তারা সফলভাবে ল্যাবরেটরিতে হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট-ইউরিয়া এবং ন্যানো বায়োচারসমৃদ্ধ ন্যানো হাইব্রিড উপাদান তৈরি করেছেন। টিইএম (TEM) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সারের কণার আকার ৩০-৩২ ন্যানোমিটার, যা সহজেই উদ্ভিদের কোষে প্রবেশ করতে সক্ষম। কেজিএফের নির্বাহী পরিচালক নাথু রাম সরকার এবং সিনিয়র স্পেশালিস্ট ড. মো. মনোয়ার করিম খান এ প্রযুক্তিকে কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি শুধু উৎপাদন খরচ কমাবে না, বরং জমির স্বাস্থ্য উন্নত করে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুস ছালাম বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন ইউরিয়া ব্যবহৃত হয়। আমরা যদি ইউরিয়ার পরিবর্তে ন্যানো ইউরিয়া জনপ্রিয় করতে পারি, তবে বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। বর্তমানে দেশের ৩০টি কৃষি অঞ্চলে এ সারের মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কোন অঞ্চলের মাটির জন্য এবং কোন ফসলের জন্য ঠিক কী পরিমাণ ন্যানো ইউরিয়া প্রয়োজন, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে। বাকৃবির এ উদ্ভাবন যদি সফলভাবে মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া যায়, তবে বাংলাদেশের কৃষি খাত এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে, যেখানে চাষাবাদ হবে কম খরচে, অধিক ফলনে এবং সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে।