নিত্যদিনের হাত দিয়ে খাবার খাওয়া কিংবা প্রিয়জনকে চিঠি লেখা আমাদের জন্য যতটা সহজ, হাত কাঁপা রোগীদের জন্য ঠিক ততটাই কষ্টকর। এ মানুষগুলোর কষ্ট কমাতেই চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছিলেন একটি বিশেষ ডিভাইস, যা হাতের অনিয়ন্ত্রিত কম্পন কমিয়ে ব্যবহারকারীকে দেয় স্থিরতার অনুভূতি। সে মানবিক ধারণাটিই শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়ে যায় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চ তুরস্কে অনুষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা সেজোরিফেস্ট ২০২৫-এর চূড়ান্ত পর্বে।

চুয়েটের মেকাট্রনিকস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মিনহাজুল ইসলাম মেহেদী এবং তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী জাবের আহসান ভূঁইয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী এ দুই তরুণ প্রকৌশলী তাদের প্রযুক্তিগত নকশা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় দ্রুতই দৃষ্টি কাড়ে বিচারক ও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর। তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা (টিকা) এবং তুরস্ক সরকারের অর্থায়নে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী এ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল ‘সীমাবদ্ধতা দূরীকরণে নকশা।’ শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে সহজ করতে ত্রিমাত্রিক নকশা ও মুদ্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেই প্রতিটি দল তাদের সমাধান উপস্থাপন করে।

11

চুয়েটের দল তৈরি করেছিল তাদের উদ্ভাবন ‘স্টেডিগ্রিপ’ নামে প্যাসিভ কম্পন-প্রশমন গ্লাভস, যা একটি ত্রিমাত্রিকভাবে মুদ্রিত গ্লাভস। এটি কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, মোটর বা ব্যাটারি ছাড়াই হাতের অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি কমাতে সক্ষম। গ্লাভটির ভেতরে থাকা পাতার মতো নমনীয় স্প্রিং ও সম্প্রসারণ স্প্রিং হাত কাঁপার বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে কম্পনকে যান্ত্রিকভাবে প্রশমিত করে। ফলে ব্যবহারকারী সহজেই কলম ধরা, গ্লাভস তোলা বা দৈনন্দিন কাজগুলো আরো স্থিরভাবে করতে পারেন।

ত্রিমাত্রিক মুদ্রণের মাধ্যমে তৈরি হওয়ায় এটি সাশ্রয়ী, হালকা, টেকসই এবং ব্যবহারকারীর হাতের মাপ ও কম্পনের মাত্রা অনুযায়ী ব্যক্তিভেদে পরিবর্তন করে তৈরি করা যায়। খোলা, এক্সোস্কেলেটন–অনুপ্রাণিত নকশা হওয়ায় স্পর্শের অনুভূতি নষ্ট হয় না এবং স্বাভাবিক গতিশীলতা বজায় থাকে। গ্লাভটি ব্যবহার করাও অত্যন্ত সহজ। হাতে পরার পর স্ট্র্যাপ ঠিক করলেই এটি কাজ শুরু করে। কোনো বিদ্যুৎ, চার্জিং বা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মঙ্গোলিয়া, ফিলিস্তিন, আলজেরিয়া, ভুটান, কেনিয়া, ভারতসহ মোট আটটি দেশের নির্বাচিত ১০টি দল অংশ নেয় চূড়ান্ত পর্বে। গত ২৪ নভেম্বর শুরু হওয়া প্রদর্শনী ও মূল্যায়নে প্রতিটি দল তাদের নকশার কার্যকারিতা, বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলে ধরে। প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন হয় ২৭ ও ২৮ নভেম্বর, যেখানে বিচারকদের সামনে তাদের ধারণাকে যুক্তি ও প্রয়োগের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়।

এ‌ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করে আলজেরিয়া, আর বাংলাদেশ থেকে অংশ নেয়া চুয়েট দল দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে, তৃতীয় হয় মঙ্গোলিয়া। ফিলিস্তিন দলকে দেয়া হয় সলিডারিটি অ্যাওয়ার্ড।

তরুণ প্রকৌশলী মিনহাজুল ইসলাম মেহেদী বলেন, ‘‌তুরস্কে আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের এটাই প্রথম জয়। ইতিহাসের অংশ হতে এবং দেশের পতাকা তুলে ধরতে পারা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের। এখানে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এবং শেখার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের এ সাফল্য আরো অনেক বাংলাদেশী তরুণদের অনুপ্রাণিত করবে।’

প্রতিনিধিত্বকারী অন্য শিক্ষার্থী জাবের আহছান ভূঁইয়া উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘চুয়েটের তথা দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অংশ নেয়া আমাদের জন্য এক বড় গর্বের বিষয়। তুরস্কের আতিথেয়তা ও পরিবেশ আমাদের মুগ্ধ করেছে। এ প্রতিযোগিতা আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা এবং শেখার সুযোগ তৈরি করেছে।’