চলছে ভাষার মাস। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছে এক স্মৃতিসৌধ, ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।’ এ মিনার শুধু ইট ও কংক্রিট নয়, এটি বাঙালির ভাষা, আত্মপরিচয় ও আত্মসমর্পণের এক জীবন্ত অধ্যায়। ১৯৫২ সালের এক বসন্তের দিনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানাতে গিয়ে প্রাণ দেন রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত ও শফিক। তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেই ১৯৬৩ সালে স্থপতি হামিদুর রহমান ও ভাস্কর নভেরা আহমেদ শহীদ মিনারটি প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে (২১ ফেব্রুয়ারি) এ স্মৃতিসৌধে হাজারো মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। শুধু এ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারই একমাত্র নয়। বাংলাদেশজুড়ে বহু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজ নিজ ক্যাম্পাসেই স্থাপন করেছেন শহীদ মিনার, যাতে প্রতিটি প্রজন্ম তাদের ভাষা ও আত্মসম্মানকে স্মরণ করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে আছে একটি শহীদ মিনার, যা আকার ও প্রতীকের দিক থেকে এ ক্যাম্পাসকে প্রভাবিত করে চলেছে। স্থপতি রবিউল হোসেনের নকশায় নির্মিত এবং ফেব্রুয়ারি ২০০৮ সালে উদ্বোধন করা এ শহীদ মিনারটি ৭১ ফুট উঁচু এবং ৫২ ফুট ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রতিটি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে। মিনারের তিনটি ত্রিভুজাকার স্তম্ভ বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতার আন্তঃসংযুক্ত আদর্শের প্রতীক। আর মিনারের কাছে উঠে যাওয়া আটটি ধাপ জাতির ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের গল্প আরেকটি ইতিহাসের অধ্যায়। এটি শুধু স্থাপত্য নয়, এটি ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষ্যও। ১৯৬৪ সালে প্রথম শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছিল তখনকার ছাত্রদের উদ্যোগে, স্বাধীনতা আসার আগে থেকেই ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে সংরক্ষণের একটি উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এ শহীদ মিনারটি পুড়িয়ে দেয়া হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৯ মে শেখ মুজিবুর রহমান এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী মুহম্মদ মনসুর আলীর হাত ধরে এর পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হয়। আজকের দিনেও এ মিনার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
এ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শহীদ মিনারটি ঢালু একটি পাহাড়ের চূড়ায়। চারপাশে ঘেরা সবুজ বনানী এবং প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে এ শহীদ মিনারটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৯২ সালে ছোট-বড় গোল আকৃতির তিনটি স্তম্ভ দ্বারা একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শহীদ মিনার নির্মিত হওয়ার আগে এখানেই জাতীয় দিবসগুলোতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ২০০১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বর্তমান শহীদ মিনারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। শহীদ মিনারটির নকশা ও নির্মাণ করেন স্থপতি মহিউদ্দিন খান।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব প্রান্তে নীরবে অবস্থানরত এর শহীদ মিনারটি নীরবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জানান দিচ্ছে ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের কথা। এর কাছেই মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করে স্থাপিত ভাস্কর্যগুলো ক্যাম্পাসকে জীবন্ত স্মৃতিস্তূপের রূপ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং অন্যান্য জাতীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এখানে সমবেত হন, অতীতের আত্মত্যাগ ও বর্তমানের দায়বদ্ধতার মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ে তোলেন। নির্মাণকালের সঠিক তথ্য বা স্থপতির নাম প্রকাশিত না থাকলেও এ মিনারের উপস্থিতি এ ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক পরিবেশের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও স্মৃতিচারণাকে সমৃদ্ধ করে।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকায় অবস্থিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়’ ভাষা আন্দোলনের এ ঐতিহ্যকে সমকালীন দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে এ ক্যাম্পাসে উদ্বোধন করা হয় শহীদ মিনার, যার মাধ্যমে এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা একুশের চেতনার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। পুরনো ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধের মতো নয়, ইস্ট ওয়েস্টে এ শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক ধাঁচে। কেবল ফুল অর্পণই নয়। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষার্থীরা এখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, ভাষা নিয়ে রচিত কবিতা আবৃত্তি করে এবং ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব নিয়ে সংলাপে অংশগ্রহণ করে।
জাহাঙ্গীরনগর থেকে শুরু করে সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী পর্যন্ত এ শহীদ মিনারগুলো কেবল স্মৃতিস্তম্ভ নয়। তারা সংগ্রামের শিক্ষা এবং বাঙালি জাতীয় জীবনের এক অদৃশ্য অধ্যায়কে স্থাপত্যের মাধ্যমে বহমান রাখে। প্রতিটি শহীদ মিনার যার যার নিজস্ব ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ঐতিহাসিক ব্যথা ও পুনর্গঠনের চিহ্ন নিয়ে, আবার কেউ নতুন প্রজন্মের জন্য আবেগ ও অধ্যয়নের এক সূচনা স্থান হয়ে।










