বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একমাত্র রক্ষাকবচ জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষার দেয়াল সুন্দরবন। এ বনের প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরী গাছ। এক সময় সুন্দরবনে ৮৫-৯০ ভাগই ছিল সুন্দরী গাছ, যা সাম্প্রতিক সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। আর অন্যতম কারণ হিসেবে নানা ধরনের ছত্রাক ও পরজীবীই দায়ী বলে উঠে এসেছে একদল শিক্ষার্থীদের ফিল্ড পর্যবেক্ষণে। সম্প্রতি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি শনাক্তকরণ, জীববৈচিত্র্যের ওপর জলবায়ুর প্রভাব, পরিবেশ দূষণ পর্যবেক্ষণ ও রোধের উপায় খুঁজে বের করতে সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গায় গবেষণা পরিচালনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) চার শিক্ষার্থী ও দুই শিক্ষক।
নিও-কলম্বাস নামে এ গবেষণা দলে ছিলেন চবির ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রওনক জাহান উমামা, কাজী তৌফিক এলাহী, তানিয়া আফরোজ পায়েল, মাহিদ নাহিয়ান এবং অধ্যাপক ড. অলক পাল ও ড. মো. মাহবুব মোরশেদ। তারা সুন্দরবনের আন্দারমানিক, ডিমের চর, কটকা, কোকিল মনি, হিরণ পয়েন্ট, জামতলা সী বিচ, করমজল, পক্ষির চর, দুবলার চরসহ সুন্দরবনের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গবেষণা পরিচালনা করেন।
ফিল্ড পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় উঠে আসে, আন্দারমানিকের অধিকাংশ উদ্ভিদ ছত্রাকের আক্রমণে জর্জরিত। সুন্দরবনের অন্যান্য জায়গাও এর ব্যতিক্রম নয়। এর মধ্যে প্রধান পরজীবীগুলো হলো মিসেলটো (Mistletoe) নামের হেমিপ্যারাসাইড, Phytophthora, Botryodiplodia-এর মতো ছত্রাক। এসব পরজীবী সাধারণত টপ ডায়িং ডিজিজ, লিফ স্পট বা ব্লাইট ডিজিজ সৃষ্টি করে, যা গাছের গায়ে ঝোপের মতো ছোট দাগ, গাছের অভ্যন্তরীণ রস শোষণ, শিকড়ে পচন, কাণ্ডে ক্ষত, গাছ দুর্বল করে ফেলা, গাছের উচ্চতা হ্রাস করা ইত্যাদি মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করে।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, সুন্দরী গাছের প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি গাছ পরজীবীতে আক্রান্ত। পরজীবীর প্রভাবে গাছের উচ্চতা গড়ে হ্রাস পেয়ে ৪০-৪৫ ফুট থেকে ২৫-৩০ ফুটে পৌঁছেছে। যে কারণে এখন ৩৫ ফুটের ওপরে উচ্চতা দেখা যায় না বললেই চলে। পরজীবীদের আক্রমণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণের মতো সমস্যা।
গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে মাহিদ নাহিয়ান বলেন, ‘আমরা অনুসরণ করেছি ভিজুয়াল ফিল্ড অবজারভেশন। এছাড়া মাটি ও পানির স্যাম্পল সংগ্রহ করেছি সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গা থেকে সেগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য। এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের জন্য পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক কাজী তৌফিক SWOT (Strength, Weakness, Opportunity, Threats) অ্যানালাইসিস, ম্যাট্রিক্স, চেকলিস্ট ইত্যাদি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। আমরা তথ্য ধারণ করেছি নোটবুক, ছবি, ভিডিও ধারণ এবং জিপিএস ডাটা রূপে।’
তানিয়া আফরোজ পায়েল বলেন, ‘বর্ষার মৌসুমে গাছ বেশি পড়ে থাকতে দেখা যায়। কারণ তখন ছত্রাকের আক্রমণ বেড়ে যায় এবং অধিক জোয়ার-ভাটাও গাছ ও গাছের শিকড়কে দুর্বল করে ফেলে। আন্দারমানিকের অধিকাংশ উদ্ভিদের গায়ে পরজীবীর উপস্থিতি, মরা গাছসহ শতাধিক গাছের পরজীবী আক্রান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। সুন্দরী গাছের সংখ্যা আগে ছিল ৯০ শতাংশ, যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ফলে মাছ, কাঁকড়া ও হরিণের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আক্রান্ত গাছের প্রতিবেশী গাছগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাছের বৃদ্ধি ধীরে হচ্ছে। ধীরে ধীরে সুন্দরী গাছের জায়গায় অধিক লবণাক্ততাসহিষ্ণু গাছ যেমন গরান, গেওয়া ও কেওড়ার মতো গাছের আধিপত্য বেড়ে যাচ্ছে। এভাবেই পরজীবীর আক্রমণ চলতে থাকলে একসময় সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছ পড়বে অস্তিত্ব সংকটে।’
লবণাক্ততা কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এ গবেষকরা। তারা বলেন, ‘নদীর মিঠা পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। নদী ভরাট বন্ধ করা, নদী ও খালের পুনঃখনন, ভাটা প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত না করা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবৈধ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। এ পদক্ষেপগুলো পারে মিঠা পানি ও নোনা পানির ভারসাম্য রক্ষা করতে।










