কেউ পেশার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়েছেন, কেউ শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয় করেছেন, আবার কেউ পরিবারের ত্যাগের প্রতিদান দিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে। গত শনিবার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) অষ্টম সমাবর্তনে গ্র্যাজুয়েশন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি এবং কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য চার শিক্ষার্থীকে দেয়া হয় স্বর্ণপদক। অদম্য ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম আর প্রিয়জনদের নিঃস্বার্থ সমর্থনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা তিন গ্র্যাজুয়েট বলেছেন তাদের স্বপ্ন জয়ের গল্প।
গোল্ড মেডেলিস্ট হওয়া আমার মূল লক্ষ্য ছিল না
শারমিন রহমান স্বর্ণা
বিবিএ, সিজিপিএ-৪.০০
গোল্ড মেডেলিস্ট হওয়া আমার মূল লক্ষ্য ছিল না। আমার লক্ষ্য ছিল ইউনিভার্সিটির চমৎকার স্কলারশিপ স্কিমটা ধরে রাখা। সেই চেষ্টা থেকেই আজ আমি গোল্ড মেডেলিস্ট ও ভ্যালিডিক্টোরিয়ান। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমার বাবা-মায়ের। আমার একটা ছোট গল্প আছে—এসএসসি ও এইচএসসিতে আমার কোনোটিতেই জিপিএ ৫ ছিল না। মারাত্মক অ্যাজমা ইস্যুর কারণে আমি স্কুল-কলেজের ক্লাসে ঠিকমতো অ্যাটেন্ড করতে পারিনি। সেই গ্যাপটা আমি ইউনিভার্সিটি লাইফে পূরণ করতে চেয়েছিলাম। আমি যখন ভর্তি হই, তখন কভিড চলছিল, ফলে অনলাইনে ক্লাস করার একটা সুবিধা পেয়েছি। আমি সংকল্পবদ্ধ ছিলাম যে কোনো সিরিয়াস কারণ ছাড়া ক্লাসে অনুপস্থিত থাকব না। আমি মনে করি, ক্লাসের পড়াশোনা ক্লাসেই শেষ করলে একটা পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায়। আমি সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের স্টুডেন্ট ছিলাম, স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু নিয়তি আমাকে বিবিএতে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে আমি ইউআইইউতে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছি। আমার রিসার্চে খুব আগ্রহ, তাই ভবিষ্যতে একাডেমিয়াতেই ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনা করছি।
অনেক নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে
মো. তারেক হাসান
এমএসসিএসই, সিজিপিএ-৪.০০
এটি আমার দ্বিতীয় গোল্ড মেডেল। প্রথমবার অনেক বেশি খুশি ছিলাম, এবারো আমি খুবই খুশি। আন্ডার-গ্র্যাজুয়েটে শুরুতে টাইম ম্যানেজমেন্টে একটু অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু মাস্টার্সের জার্নিটা ছিল আরো কঠিন, কারণ আমি ইউআইইউতে লেকচারার হিসেবে ফুলটাইম জব করছি। জবের সঙ্গে আন্ডারগ্র্যাডের মতো সমান পরিশ্রম করা খুব কঠিন ছিল। মাঝে মাঝে হতাশা কাজ করত যে আগে যেভাবে ইনপুট দিতাম, এখন তা পারছি না। যার ফলে অনেক নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে। কিন্তু আমার একটা সঠিক প্ল্যান ছিল এবং সেটার বাস্তবায়ন ঠিকমতো হয়েছে। এ সাফল্যের পুরো ক্রেডিট আমার স্ত্রী এবং আমার বাবা-মায়ের। আমার বাসা ছিল বুয়েট কোয়ার্টারে, সেখান থেকে ইউআইইউ অনেক দূরে। সকাল ৭টার বাস ধরার জন্য আম্মু অনেক ভোরে উঠে নাশতা রেডি করে রাখতেন। আমি যখন প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করতাম, আম্মু রুমের আশপাশে কাউকে আসতে দিতেন না। আন্ডারগ্র্যাডে আমার রাস্তা মসৃণ করে দিয়েছেন বাবা-মা, আর মাস্টার্সে আমার স্ত্রী। ছোটবেলায় স্কাউটিং করতাম, স্বপ্ন ছিল আর্মি অফিসার হওয়ার। কিন্তু চোখের সমস্যার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। এরপর মুভি দেখে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার শখ জাগলেও শেষ পর্যন্ত কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি।
প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা পড়তে বসতাম
ফাহিম আহাদ
এক্সিকিউটিভ এমবিএ, সিজিপিএ-৪.০০
আমি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ এবং বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে পড়াশোনা শেষ করে আর্মিতে কমিশন পাই। ২০১৫ সালে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে মিশনে থাকা অবস্থায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় আমার পায়ের লিগামেন্টে গুরুতর ইনজুরি হয়। যার ফলে আমি মেডিকেল গ্রাউন্ডে মেজর হিসেবে রিটায়ার্ড করি। এরপর করপোরেট লাইফে প্রবেশ করি। চাকরির প্রয়োজনে প্রফেশনাল ডিগ্রির জন্য ইউআইইউতে ইএমবিএ শুরু করি। একজন ফুলটাইম জব হোল্ডার এবং তিন সন্তানের বাবা হিসেবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমাদের দেশে করপোরেট জব কখনই ৬টায় শেষ হয় না। তাই আমি একটা নিয়ম মেনে চলতাম—অফিস থেকে ফিরতে রাত ৯টা বাজুক বা ১০টা, আমি প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা পড়তে বসতাম। এ ধারাবাহিকতাটাই আমাকে গোল্ড মেডেল পেতে সাহায্য করেছে। ইউআইইউর ফ্যাকাল্টিরা অত্যন্ত প্রফেশনাল ও আন্তরিক। তারা ক্লাসে প্রতিটি স্টুডেন্টকে বোঝানোর জন্য সর্বোচ্চ ডেডিকেশন দেখান। আমি ক্যারিয়ারের মাঝপথে আছি, তাই আপাতত বর্তমান কর্মস্থলেই নিজের সেরাটা দিতে চাই।










