দেশের প্রত্যন্ত কোনো গ্রামের এক মেধাবী তরুণী, যার চোখে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, কিন্তু দারিদ্র্যের শিকলে সেই স্বপ্ন বারবার অধরা থাকে। শহরে এসে থাকা-খাওয়ার খরচ আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়বহুল পড়াশোনা—এ দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কত মেধা যে অঙ্কুরেই ঝরে যায়, তার ইয়ত্তা নেই। তবে এ নির্মম বাস্তবতার বিপরীতে ব্যতিক্রম ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) ‘সায়মা হল’। এটি কেবল একটি ইট-পাথরের ভবন নয়, বরং সুবিধাবঞ্চিত নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এক টুকরো নিরাপদ আশ্রয়।
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সায়মা হল। সুবিধাবঞ্চিত নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া এবং শতভাগ বৃত্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেয়া দেশের প্রথম এ আবাসিক হলটি সম্প্রতি এক দশক পূর্ণ করেছে।
২০১৫ সালে ঢাকার বারিধারা জে ব্লকে আইইউবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এ মতিন চৌধুরীর পরিবারের দেয়া নয়তলা ভবনের পাঁচটি তলা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় সায়মা হলের। শুরুতে শিক্ষার্থী ছিলেন মাত্র আটজন। এ মতিন চৌধুরীর পরিবারের স্থাপিত ‘শহীদ খালেক অ্যান্ড মেজর সালেক বীর উত্তম ট্রাস্ট’-এর অর্থায়নে এবং ট্রাস্টি সালমা করিমের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ মহৎ উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। গত ১০ বছরে এ হলের আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পঞ্চাশ জনে। এখানে থাকা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিসহ পড়াশোনার সম্পূর্ণ খরচ ফ্রি। থাকা-খাওয়া এবং আসবাবপত্রের যাবতীয় ব্যয় বহন করে ট্রাস্ট। অন্যদিকে হলের বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ইন্টারনেটসহ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আইইউবি কর্তৃপক্ষ।

গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী ও হলের বর্তমান বাসিন্দা সায়মা বিনতে রাশিদ বলেন, ‘ঢাকার বাইরে থেকে যারা আসে, তাদের জন্য সায়মা হল একটা বিরাট ভরসার নাম। এখানে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয় না। পড়াশোনা এবং নিজেকে গড়ে তোলা—দুটোই করা যায় নিশ্চিন্তে।’
গত এক দশকে সায়মা হলে থেকে প্রায় ৭০ জন নারী শিক্ষার্থী আইইউবিতে তাদের স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তারা প্রত্যেকেই এসেছেন দেশের প্রত্যন্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল থেকে। কিন্তু সুযোগের সঠিক ব্যবহারে আজ তারা স্বাবলম্বী। তাদের অনেকেই দেশ-বিদেশের ব্যাংক, তথ্যপ্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন নামি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইতালি, জার্মানি ও জাপানের মতো দেশে পাড়ি জমিয়েছেন অনেকে।
সায়মা হলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আতিকা হুমায়রার গল্পটি অনুপ্রেরণার। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইইউবির ২৫তম সমাবর্তনে ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের সেরা শিক্ষার্থীর পুরস্কার জিতেছেন তিনি। আতিকা বলেন, ‘সায়মা হল শুধু একটি আবাসিক হল নয়, এটি একটি পরিবার। একটি নিরাপদ আবাস, যেখানে কোনো বাধাবিঘ্ন ছাড়াই প্রস্ফুটিত হওয়া যায়।’
গত ২৯ নভেম্বর আইইউবি ক্যাম্পাসে সায়মা হলের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হয় এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে হলের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে ট্রাস্টি এ মতিন চৌধুরী একটি ঘোষণা দেন। তিনি জানান, নয়তলা ভবনের বাকি তলাগুলোও এখন থেকে সায়মা হলকে দেয়া হবে। ফলে আরো বেশিসংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত মেধাবী নারী শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা সবাই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছ। যেখান থেকে এসেছ সেখানকার মানুষকে ভুলে যেয়ো না। কারণ তাদের প্রতি তোমাদের কর্তব্য আছে।’
ট্রাস্টি সালমা করিমের মতে, এই এক দশক কেবল সময়ের মাইলফলক নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়নের উদযাপন। তিনি বলেন, ‘আমরা উদযাপন করছি ক্ষমতায়ন, যা অনেকের জীবন বদলে দিয়েছে।’
আইইউবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান দিদার এ হোসেইন বলেন, ‘সায়মা হল আইইউবির একটি রত্ন। এর মাধ্যমে আমরা সুবিধাবঞ্চিত নারী শিক্ষার্থীদের জ্বলে উঠতে সাহায্য করার সুযোগ পাচ্ছি, যাতে তারা নিজেদের জন্য সমাজে সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ একটি জীবন গড়ে তুলতে পারে।’
উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘সায়মা হল সেই অদৃশ্য দেয়ালটা ভাঙতে সাহায্য করে, যা সমাজ আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সায়মা হলের কারণে অনেক শিক্ষার্থী থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে, যা না হলে হয়তো তারা এতদূর আসতে পারত না।’










