বর্তমান বিশ্বে উচ্চশিক্ষার মানদণ্ড আর কেবল শ্রেণীকক্ষকেন্দ্রিক নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ ও রাষ্ট্রকে কী ধরনের নতুন জ্ঞান উপহার দিচ্ছে এবং সেই জ্ঞান রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে কতটা সহায়ক হচ্ছে—সেটি এখন মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গবেষণার সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০০৪ সালে যাত্রা করে ‘ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং’ (ইডব্লিউইউসিআরটি)। দুই দশকের ধারাবাহিক পথচলায় কেন্দ্রটি আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘রিসার্চ হাব’-এ পরিণত হয়েছে।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির গবেষণা কেন্দ্র সিআরটির মূল লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মানসম্পন্ন টেকসই গবেষণার পরিবেশ গড়ে তোলা। এ কেন্দ্র শুধু শিক্ষক ও গবেষকদের সহায়তাই করে না, বরং গবেষণালব্ধ জ্ঞান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। গবেষণার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রমাণ হিসেবে এ কেন্দ্রে মানসম্পন্ন গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। টাকার জন্য এখানে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা ব্যাহত হয়নি।

বর্তমানে সিআরটি বহুমুখী ও আন্তঃবিষয়ক গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই অর্থনীতি নিয়ে একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। এছাড়া চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সমন্বয় করে এর সুফলগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং শেয়ারবাজারের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিয়মিত তথ্যভিত্তিক গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান শাখায় ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে শিক্ষকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে বুয়েট, বিসিএসআইআরের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণাও পরিচালনা করছে এ কেন্দ্র।

গবেষণার কাজে সিআরটির ঝুলিতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এখান থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে দুটি আন্তর্জাতিকমানের পিয়ার-রিভিউড জার্নাল—ইস্ট ওয়েস্ট জার্নাল অব বিজনেস অ্যান্ড সোশ্যাল স্টাডিজ এবং ইস্ট ওয়েস্ট জার্নাল অব হিউম্যানিটিস। জ্ঞান বিনিময়ের লক্ষ্যে এখানে নিয়মিত গবেষণা সেমিনার ও জ্ঞান বিনিময় বিষয়ক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। গবেষণার স্বচ্ছতা ও মৌলিকত্ব নিশ্চিত করতে অত্যাধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি গবেষণাকর্ম যাচাই করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে অবদানের অংশ হিসেবে ইউজিসি ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

গবেষণাকে সহজ, নির্ভুল ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত করতে সিআরটি বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে। প্রতি বছর শিক্ষকদের নতুন গবেষণার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণের রিসার্চ গ্রান্ট দেয়া হয়। এখানে ডাটা বিশ্লেষণ এবং রেফারেন্স ব্যবস্থাপনার জন্য সর্বাধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যায়। বিজ্ঞান গবেষণার জন্য রয়েছে বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি, যা বাইরের গবেষকদের কাছেও সমাদৃত। পাশাপাশি একাডেমিক রাইটিং, ডাটা সায়েন্স, রিসার্চ মেথডোলজি ও রিসার্চ সফটওয়্যারের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হয়। আন্তর্জাতিক জার্নালে মানসম্মত গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তাও প্রদান করা হয়।

সিআরটির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. মো. সোহেল রানা। তিনি বলেন, ‘এখানে একটি কার্যকরী কমিটি নিয়মিতভাবে গবেষণার মান ও অগ্রগতি তদারকি করে থাকে। সিআরটি বর্তমানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্ভাবনী প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে সুন্দরবন এলাকার বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) থেকে নির্গত পানি পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের মতো পরিবেশবান্ধব প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের অংশ হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্রেন–কম্পিউটার ইন্টারফেসচালিত হুইলচেয়ার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে গ্লকোমা শনাক্তকরণের নির্ভুল পদ্ধতি উন্নয়নের কাজ চলছে। এছাড়া সেন্ট মার্টিন দ্বীপে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য টেকনোলজিসমৃদ্ধ স্মার্ট আইওটি ডিভাইসের ব্যবহার এবং উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় গাণিতিক মডেলিংভিত্তিক গবেষণা চলমান রয়েছে, যা জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামস রহমান বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে উচ্চতর শিক্ষার মূল ভিত্তিই হলো গবেষণা। কেবল শ্রেণীকক্ষনির্ভর শিক্ষা দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। তাই সিআরটির মাধ্যমে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এখন এমন এক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি মানুষের এবং রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধানে অংশ নিতে পারেন।’