পরিবেশ বিদ্যা ও টেকসই উন্নয়ন বর্তমান বিশ্বের এক অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল ও আলোচিত একাডেমিক ক্ষেত্র। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, প্রাকৃতিক সম্পদের দ্রুত ক্ষয়, নগরায়ণের বিস্তার এবং সামগ্রিক পরিবেশ সংকট, সব মিলিয়ে বর্তমান সময়েই প্রয়োজন এমন উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার, যা কেবল বৈজ্ঞানিক আলোচনা নয়; বরং সমাজ, অর্থনীতি ও উদ্ভাবন, সব ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে সক্ষম হবে।
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) দেশে প্রথমবারের মতো পরিবেশ বিদ্যা এবং টেকসই উন্নয়ন, দুটি ক্ষেত্রকে সমন্বিত করেছে। এনভায়রনমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি (ইএসএস) নামে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে। নতুন বিভাগটি দেশের উচ্চশিক্ষায় পরিবেশকেন্দ্রিক জ্ঞানচর্চার একটি নতুন মডেল।
ইউল্যাবের এ নতুন বিভাগটি পরিবেশবিজ্ঞানকে শুধু ল্যাবরেটরি ও গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। টেকসই ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, পরিবেশ নীতি, জলবায়ু কূটনীতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি, কমিউনিটি উন্নয়ন, করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি, সবুজ অর্থনীতি ও উদ্ভাবনী সমাধান এসব ক্ষেত্রকে সমন্বয় করে একই একাডেমিক পাঠ্যক্রমে নিয়ে এসছে। ফলে একজন শিক্ষার্থী ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি সমাজ, নীতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সব দিক দিয়েই প্রস্তুত হতে পারবেন। যেসব শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে গবেষক, নীতি বিশ্লেষক, পরিবেশকৌশলী, জলবায়ু উদ্ভাবক বা গ্রিন ইকোনমি নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য এনভায়রনমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি একটি মানসম্মত প্লাটফর্ম তৈরি করতে চলেছে।
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স (পরিবেশ বিজ্ঞান) ও এনভায়রনমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি (পরিবেশ বিদ্যা ও টেকসই উন্নয়ন) এ দুই ডিসিপ্লিনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত পরিবেশবিজ্ঞান কঠোরভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক ক্ষেত্র। এখানে ইকোলজি, জলবায়ুবিজ্ঞান, দূষণ বিশ্লেষণ, পানি-বায়ু-মাটি পরীক্ষণ, পরিবেশ মনিটরিং এবং ল্যাবভিত্তিক গবেষণা ও পরিমাপ পদ্ধতির ওপর জোর দেয়া হয়। অন্যদিকে পরিবেশ বিদ্যা ও টেকসই উন্নয়ন আরো বড় পরিসরে কাজ করে। এখানে টেকসই উন্নয়ন নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট, সবুজ অর্থনীতি, করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি এবং জলবায়ু উদ্ভাবনের মতো সমাজকেন্দ্রিক বিষয়গুলোয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। ইউল্যাবের এনভায়রনমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি বিভাগ দুই দৃষ্টিভঙ্গিকে একই আঙ্গিকে মিলিয়ে একটি হাইব্রিড শিক্ষাকাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে বিজ্ঞান, সমাজ, প্রযুক্তি, নীতি ও নেতৃত্ব সবকিছুই সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্বের পরিবর্তিত চাকরির বাজারে এনভায়রনমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি বিভাগে উচ্চশিক্ষা ক্যারিয়ার গড়তে একধাপ এগিয়ে রাখতে পারে। বিশ্বব্যাপী গ্রিন ইকোনমির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু ফাইন্যান্স, টেকসই কৃষি, পরিবেশ নীতি এবং কার্বন ব্যবস্থাপনা এসব খাতে নতুন করে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দশকে টেকসই উন্নয়নসংশ্লিষ্ট চাকরিই হবে সবচেয়ে বিস্তৃত ও দ্রুতবর্ধনশীল ক্ষেত্র। ফলে এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা বৈজ্ঞানিক দক্ষতা, নীতি বোঝাপড়া, উদ্ভাবনী সমস্যা সমাধান এবং টেকসই উন্নয়ন চর্চার মতো বহুমাত্রিক গুণ অর্জন করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারেন অনায়াসেই।
এ বিভাগের পাঠ্যক্রমে চার ধরনের সক্ষমতা তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ও উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি, পরিবেশ আইন ও নীতিবিধান এবং নেতৃত্ব ও দলগত সক্ষমতা। জলবায়ুবিজ্ঞান, জীববৈচিত্র্য, পানি-মাটি-বায়ুর গুণগত বিশ্লেষণ, পরিবেশ মনিটরিং প্রযুক্তি, ফিল্ডওয়ার্ক ও গবেষণাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা শিখবে বাস্তবসম্মত সমাধান নকশা, নগরায়ণ এবং উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, কমিউনিটিভিত্তিক টেকসই প্রকল্প, জলবায়ু অভিযোজন কৌশল এবং পরিবেশ আইন নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার বাস্তব প্রয়োগ। এছাড়া শিক্ষার্থীদের রিপোর্ট রাইটিং, বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এবং নীতি-সংলাপ পরিচালনার দক্ষতাও গড়ে তোলা হবে। পরিবেশ বিদ্যা এবং টেকসই উন্নয়ন বিভাগ শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক পরিবেশ ল্যাব, বাস্তবমুখী শিক্ষা, শিল্প-সংযুক্ত কারিকুলাম, গবেষণা ও উদ্ভাবনকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রোগ্রাম এক্সচেঞ্জের সুযোগ করেছে।
বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইউরোপ, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ, জলবায়ু এবং টেকসই উন্নয়নবিষয়ক স্কলারশিপের সুযোগ এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য আরো উন্মুক্ত।
বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘আমরা পরিবেশ, সমাজ ও অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে পারে এমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই। দীর্ঘদিনের গবেষণা অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা এমন একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেছি, যা সমস্যাকে শুধু বুঝতেই নয়, সমাধানের নকশা ও বাস্তবায়ন করতে পারবে আমাদের শিক্ষার্থীরা।’
ক্যারিয়ার সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও এ বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের পথ অত্যন্ত বিস্তৃত। সরকারি খাতের পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, গবেষণা ও পরিকল্পনা সংস্থা থেকে শুরু করে বেসরকারি খাতের পরিবেশ,–স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিভাগ, কমপ্লায়েন্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গার্মেন্টস ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পরিবেশ ব্যবস্থাপনা সবখানেই দক্ষ পেশাজীবীদের চাহিদা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইউএনডিপি, ইউএনইপি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিভাগটির শিক্ষকরা জানান, ভবিষ্যতের পৃথিবী হবে গ্রিন ইকোনমির, টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংবেদনশীল উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিবেশ বিদ্যা এবং টেকসই উন্নয়ন শুধু একটি বিষয় নয়, বরং একটি জরুরি প্রয়োজন। এ বিভাগ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সামাজিক–অর্থনৈতিক টেকসই সমাধানের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়, যারা দেশের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
ইউল্যাবের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর জুড উইলিয়াম জেনিলো বলেন, ‘বাংলাদেশের জলবায়ু সংকট গভীর, কিন্তু আমাদের তরুণদের সম্ভাবনাও ততটাই শক্তিশালী। এ প্রোগ্রাম তাদের জন্য, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়তে, প্রকৃতি রক্ষা করতে ও ভবিষ্যৎকে আরো সবুজ করে গড়তে চায়।’










