কখনো বর্ষার উত্তাল জলে ভেসে থাকা কিশোরীর চোখে বিস্ময়, কখনো রাজপথে স্লোগান হাতে বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি, আবার কখনো শহরের যান্ত্রিক গতির মাঝে থমকে থাকা এক জোড়া ক্রাচ। প্রতিটি ছবি যেন একেকটি স্থির হয়ে যাওয়া মুহূর্ত নয়, বরং চলমান জীবনের গভীর গল্প। সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ‘ফ্রেমস অব ফ্রিডম অব বিইউএফটি ন্যাশনাল ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন ২০২৫’-এ উঠে এসেছে এমনই সব অসাধারণ মুহূর্ত।
বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) ফটোগ্রাফি ক্লাবের আয়োজনে এবং জায়ান্ট গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত এ প্রদর্শনীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঠানো ৭ হাজার ৬৬১টি ছবি থেকে বাছাই করা ১৩০টি আলোকচিত্র স্থান পায়। দীর্ঘ ১২ বছর পর আয়োজিত এ প্রদর্শনীটি ছিল আলোকচিত্রপ্রেমীদের জন্য এক মিলনমেলা।

প্রদর্শনীতে ক্যামেরা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী আশরাফুজ্জামান আনন্দ। তার ফ্রেমে ধরা পড়েছে বর্ষার এক ধূসর বিকাল। ছবিতে দেখা যায়, জলাশয়ের বুকে বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে, আর তার মাঝেই এক কিশোরী মাথা ভাসিয়ে সাঁতার কাটছে। সাদা-কালো এ ছবিটি যেন শৈশবের দুরন্তপনা আর প্রকৃতির রুদ্ররূপের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আনন্দ বলেন, ‘কলেজ জীবনের শুরু থেকেই ছবি তুলি। শখের বশে শুরু করলেও এখন এটি আমার মানসিক শান্তির জায়গা। এত বড় পরিসরে নিজের কাজকে দেখতে পারা আমার জন্য গর্বের।’
ক্যামেরা বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন মাহদিন শফিক ওমি। তৃতীয় স্থান অধিকারী এসএম নাহিয়ান রেজার ছবিতে উঠে এসেছে রেল স্টেশনের গল্প। স্টেশনের প্লাটফর্মে ট্রেনের সমান্তরালে ছুটছে এক শিশু, বাতাসে উড়ছে তার এলোমেলো চুল। ছবিটি যেন জীবনের অবিরাম ছুটে চলারই প্রতীক।
হাতের মুঠোফোন যে শক্তিশালী গল্পের মাধ্যম হতে পারে, তা প্রমাণ করেছে মোবাইল বিভাগের ছবিগুলো। এ বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন তানভীর হোসেন। তার ছবিতে চিড়িয়াখানার খাঁচার ওপার থেকে এক জেব্রা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে এপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দিকে। বন্যপ্রাণী আর মানুষের এ নীরব কথোপকথন ফ্রেমবন্দি হয়েছে অসাধারণ দক্ষতায়।
দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী মো. আইজ উদ্দিন আহমেদ তুলে এনেছেন সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি। ছবিতে দেখা যায় এক উত্তাল আকাশ, শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষুব্ধ জনতার ঢল এবং সামনে উঁচিয়ে ধরা প্ল্যাকার্ডে লেখা—‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা দেশটা কারো বাপের না’।

তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন মো. বুলবুল হাসান। লং এক্সপোজারে তোলা এ ছবিতে দেখা যায়, রাতের শহরের রাস্তায় গাড়ির হেডলাইটের আলোর ঝলকানি বা লাইট ট্রেইল, যা সময়ের দ্রুতগতির প্রতীক। অথচ সেই গতির মাঝেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ, হাতে তার ক্রাচ। গতিময় শহরের বুকে এ স্থিরতা যেন এক নীরব সংগ্রামের গল্প বলে।
তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর পর্দা নামে ১২ জানুয়ারি জমকালো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
অনুষ্ঠানে বিইউএফটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ফারুক হাসান, উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব নবী খান, ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো আলমগীর হোসেন, জায়ান্ট গ্রুপের পরিচালক শারমিন হাসান, শিল্পকলা একাডেমির ডিজি কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, বিইউএফটির জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ ইমতিয়াজসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিইউএফটি ফটোগ্রাফি ক্লাবের সভাপতি জান্নাতুল নাঈম বলেন, ‘দীর্ঘ এক যুগের অপেক্ষার পর এ আয়োজন আমাদের জন্য ছিল স্বপ্নের মতো। সারা দেশ থেকে যে সাড়া পেয়েছি, তা অভাবনীয়। আমরা চাই প্রতি বছর এ ন্যাশনাল এক্সিবিশনটি নিয়মিত আয়োজন করতে।’










