ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা জনস্বাস্থ্যবিদদের। বছরের প্রথম ছয় মাসে এ রোগে আক্রান্তের যে পরিসংখ্যান, তাতে আরেকটি স্বাস্থ্যগত দুর্যোগ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। কেননা জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—ভরা মৌসুমে এডিস মশার প্রকোপ আরো ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। তাতে ভয়াবহ চাপ তৈরি হবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। তাছাড়া এ বছর ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে অস্বাভাবিক উপসর্গ লক্ষ করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
এডিস মশাবাহিত ভাইরাসে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৬৬১ ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নতুন করে মারা গেছে আরো দুজন। এ নিয়ে চলতি বছর সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট ৬৪ জনের মৃত্যু হলো। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের গতকাল বিকালের বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, আক্রান্তদের মধ্যে ৪৩৩ জন ঢাকার এবং বাকি ২২৮ জন ঢাকার বাইরের। সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ২ হাজার ১২৯ রোগী ভর্তি আছে। এর মধ্যে ঢাকার ৫৩টি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ১ হাজার ৪৯০ ও অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী।
দেশের ইতিহাসে গত বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হলেও মৃত্যু ছিল সর্বোচ্চ। তবে এ রেকর্ড চলতি বছর ভাঙতে চলেছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে রাজধানীর বাইরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সংক্রামক রোগটি ছড়িয়ে পড়ায় ভেঙে যেতে পারে ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ আক্রান্তের রেকর্ডটিও। এরই মধ্যে রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়েছে রোগ ব্যবস্থাপনা। হাসপাতালের বাইরে বাসাবাড়িতে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ১১৬। অথচ গত বছর সর্বোচ্চ মৃত্যুর বছরেও প্রথম ছয় মাসে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৯ ও মৃত্যু হয়েছিল কেবল একজনের। দেশে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্তের বছর ২০১৯ সালেও প্রথম ছয় মাসে রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২০৮।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫৫০ ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়। ফেব্রুয়ারিতে দেড় শতাধিক আক্রান্তের মধ্যে তিনজন এবং মার্চে শতাধিক রোগী শনাক্ত হলেও কারো মৃত্যু হয়নি। এপ্রিলে ১৫০ রোগীর মধ্যে দুজন ও মে মাসে সহস্রাধিক রোগীর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। জুনে রোগী শনাক্ত হয় ৭ হাজার ৯৭৮ জন। এ মাসে ৩৪ রোগীর মৃত্যু হয়। চলতি মাসের গত ছয়দিনে তিন হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের।
রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে এ-যাবৎকালে যে ধরনের উপসর্গ দেখা যেত এ বছর তা মিলছে না। এবার দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক সব উপসর্গ। রোগী নিজেও কিছু বুঝে ওঠার আগে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। স্বাভাবিকভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পাঁচ-সাতদিন সময় লাগত। এখন দু-একদিনের মধ্যেই অবস্থার অবনতি হচ্ছে। একই সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে দেখা দিচ্ছে নানা জটিলতা। যাদের মৃত্যু হচ্ছে তাদের প্রায় সবাই শক সিনড্রোমে মারা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু এবার তার চরিত্র বদলেছে। এখন আগের মতো রোগীর শরীরে উচ্চতাপমাত্রার জ্বর দেখা যাচ্ছে না। শরীরে ব্যথা, কয়েকদিনের জ্বর থাকছে না। প্লাটিলেট কমে গেলেও বোঝা যাচ্ছে না। এখন সাধারণ জ্বর, সর্দি, কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা হচ্ছে। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে স্বল্প সময়ের মধ্যে। রক্তচাপ কমে যাচ্ছে, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রোগী অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, যা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম নামে পরিচিত। এবার ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি হওয়ার অন্যতম কারণও শক সিনড্রোম।’
এ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘সাধারণত এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়ায়, পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে—এমনটি জানা থাকলেও এখন ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। অপরিষ্কার ও নোংরা পানিতেও এডিসের লার্ভা মিলছে। এ মশা রাতে-দিনে সবসময়ই কামড়াচ্ছে। রোগীদের মধ্যে যারা শক সিনড্রোমে যাচ্ছে তাদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি। সামান্য জ্বর, কাশি ভেবে বিষয়টিকে যারা গুরুত্ব দিচ্ছে না, দেখা যাচ্ছে তারাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। ফলে যারা দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার আক্রান্ত হচ্ছে, তারা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মধ্যে পড়ছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক গত তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালে সরকারের হিসাবে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ১৭৯ জনের। যদিও তিন শতাধিক মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গত বছর সরকারের হিসাবে মৃত্যু হয় ১৮১ জনের, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। চলতি বছরে সংক্রমণ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। গত কয়েক বছরে প্রথম ছয় মাসে এত মৃত্যুও দেখা যায়নি। সামনের দিনগুলোয় মৃত্যুহার কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কীটতত্ত্ব, রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নির্মূলে ও রোগী ব্যবস্থাপনায় জনস্বাস্থ্যের চিন্তাভাবনা উপেক্ষিত।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ মূলত রোগী ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার বিভাগ মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। আর কীটতত্ত্ববিদ ও রোগতত্ত্ববিদরা গবেষণা করেন। তবে শুরু থেকেই তাদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি। কোথাও এডিস মশা কিংবা অন্য কোনো মশাবাহিত রোগ মহামারী আকার ধারণ করলে সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হয়। যে বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী রয়েছে তার চারপাশে ৫০০ মিটার ধরে এমনভাবে কার্যক্রম চালাতে হয় যেন একটি এডিস মশাও বেঁচে না থাকে। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগ ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ একে অন্যকে দোষারোপ করেই দায় সারছে। অন্যদিকে নাগরিকরাও মনে করছে তাদের কোনো দায় নেই।
ডেঙ্গু শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগ বলে জানান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গত দুই দশকে দেশে ডেঙ্গু রোগী ও রোগ ব্যবস্থাপনার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা কমিয়ে না আনা গেলে তেমন লাভ হবে না। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লে মৃত্যুও বাড়বে। রোগীরা সাধারণত সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসে। তখন তাদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। নগরায়ণের পরিসর বেড়েছে। উপজেলা ও কোনো কোনো ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্তও নগরায়ণের প্রসার ঘটেছে। তবে সে অনুপাতে এডিস মাশার বংশবৃদ্ধি রোধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দেশে এখন শীতকালেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। কেননা আমাদের দেশে শীতকালের তাপমাত্রা শীতপ্রধান দেশের গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রার প্রায় সমান।’
বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির মতে, বছরে অন্তত ১০ থেকে ৪০ কোটি মানুষের মধ্যে ডেঙ্গুর সংক্রমণ হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে এর সংক্রমণ বেশি হয়। এর মধ্যে আবার নগর ও উপনগরে সংক্রমণ বেশি।
রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরো বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ডেঙ্গু আর মৌসুমি আবহাওয়া বর্ষাকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গত বছর অক্টোবরে গিয়ে এর প্রকোপ বেড়েছিল। এরপর শীতকালেও তা অব্যাহত ছিল। মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় দেখা যায়, শীতকালে পানির সংকট থাকে। এ সময় বহুতল ভবনের গাড়ির পার্কিংয়ে গাড়ি ধোয়ার পানি জমে থাকে। অনেকে পানি জমিয়ে রাখে। ফলে এডিস মশার বংশ বিস্তার থেমে থাকে না। প্রতি মাসেই এখন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাবে।’
অন্তত ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন এ কীটতত্ত্ববিদ। তার মতে, সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা জরুরি। এতে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগসহ নাগরিকরাও যুক্ত থাকবে। কারো ওপর একক দোষ চাপালে ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়বে। প্রত্যেক জেলা সদরে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। ডেঙ্গু রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
ডেঙ্গু রোগ ও রোগীর ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সচেষ্ট রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সারা দেশে সব সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোয়ও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যেসব দপ্তর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’










