ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তরের পর সেই পরিত্যক্ত কারখানা ও বিশাল ভবনগুলো এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে ভাস্কর্য, সিরামিক ও সমকালীন শিল্পচর্চার কেন্দ্র হিসেবে। শিল্পীদের মতে, সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে এ এলাকাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সৃজনশীল শিল্প কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
সরজমিনে দেখা যায়, কয়েক বছরের ব্যবধানে হাজারীবাগে গড়ে উঠেছে ক্রিয়েটিভ আর্ট স্টুডিও, স্কাল্পচার স্টুডিও, সিরামিক স্টুডিও ও আর্ট ফাউন্ডেশন। শিল্পীদের ভাষায়, এর প্রধান কারণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠা অবকাঠামো। ভাস্কর্য ও সিরামিকের কাজে ভারী মেশিন, গ্রাইন্ডিং, ধাতু ও রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে আবাসিক এলাকায় কাজ করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু হাজারীবাগে শব্দ বা ধুলাবালির কারণে কোনো সামাজিক বাধা নেই।
হাজারীবাগে ক্রিয়েটিভ আর্ট স্টুডিওর যাত্রা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক তারেক রহমান কমলের হাত ধরে। সে অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করোনাকালে আমরা এমন একটি জায়গা খুঁজছিলাম যেখানে ভারী ও জটিল কাজ করা যাবে। হাজারীবাগ তখন প্রায় পরিত্যক্ত শিল্পাঞ্চল। সাশ্রয়ী ভাড়া আর ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের বড় ফ্লোর আমাদের আকৃষ্ট করে।’
করোনাকালে কয়েকজন শিল্পীর পরীক্ষামূলক স্টুডিও দিয়েই শুরু হয় এ যাত্রা। ‘স্টুডিও ভাস্কর্মী’র শিল্পী রুপম রায় বলেন, ‘আমরা এমন একটি জায়গা চেয়েছিলাম যেখানে ভাস্কর্য ও সিরামিকের যান্ত্রিক কাজ করা যাবে, আবার সৃজনশীল পরিবেশও থাকবে। হাজারীবাগে শব্দ বা ধুলাবালির কাজ নিয়ে কোনো সামাজিক বা প্রশাসনিক বাধা নেই।’
আগে বড় কাজের জন্য শিল্পীরা লালবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ নেওয়াজ ভবনের সীমিত পরিসরের ওপর নির্ভর করতেন। দাগী আর্ট গ্যারেজের শিল্পী রাসেল চৌধুরী বলেন, ‘আগে মগবাজারে স্টুডিও ছিল। কিন্তু বড় স্পেসের ছিল বড্ড সংকট। ২০১৯ সালে বড় ফ্লোরের প্রয়োজনেই আমরা হাজারীবাগে আসি।’
স্টুডিও থ্রির শিল্পী আনিসুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘পেইন্টাররা বাসায় কাজ করতে পারেন, কিন্তু ভাস্করদের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা প্রয়োজন। আবাসিক এলাকায় মেশিন চালানো বা গ্রাইন্ডিং করা সম্ভব নয়। সেই দিক থেকে হাজারীবাগ অনেক নিরাপদ।’
ভাস্কর্যে একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী তেজস হালদার জসের মতে, পরিত্যক্ত শিল্পাঞ্চলকে ‘আর্ট ভিলেজে’ রূপান্তর করা ইউরোপ, চীন ও জাপানে বহু আগেই সফল হয়েছে। তিনি বলেন, ‘হাজারীবাগও বাংলাদেশের প্রধান আর্টিস্টিক হাব হতে পারে। এখান থেকে ডেকোরেটিভ আর্ট ও স্কাল্পচারের বড় বাজার তৈরি করা সম্ভব।’ তার দাবি, বর্তমানে দেশের বড় হোটেলগুলোতে বিদেশী, বিশেষ করে চীনা ডেকোরেটিভ পণ্যের আধিপত্য থাকলেও দেশীয় শিল্পীরা আরো উন্নতমানের কাজ করতে সক্ষম।
সম্ভাবনার পাশাপাশি সংকটও বাড়ছে। পাঁচ বছর আগে প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ছিল ১৫-২৫ টাকা, এখন তা বেড়ে ৪০-৫০ টাকায় পৌঁছেছে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ই-কমার্স কোম্পানির গুদাম গড়ে ওঠায় জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে। রাসেল চৌধুরী বলেন, ‘আমার পরিচিত ১০-১২ জন শিল্পী স্টুডিওর জন্য জায়গা খুঁজেও পাননি।’
শিল্পীদের অভিযোগ, আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি অবকাঠামো, যেমন মেটাল মেল্টিং বা বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত সহায়তা দেশে নেই। একই সঙ্গে শিল্পকর্ম রফতানিতে প্রায় ১৫০ শতাংশ কর, ‘আর্ট’ ও ‘ক্র্যাফট’-এর অস্পষ্ট নীতিমালা এবং রফতানি জটিলতা এ খাতের বিকাশে বড় বাধা হয়ে আছে।
রুপম রায় বলেন, ‘৫ লাখ টাকার একটি আর্ট পিস বিদেশে পাঠাতে সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ট্যাক্স দিতে হয়। তাই অনেকেই শিল্পকর্ম ‘স্যাম্পল’ হিসেবে পাঠান বা বিদেশের প্রদর্শনী শেষে আর্টওয়ার্ক আর দেশে ফেরত আনেন না।’
শিল্পীদের মতে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, যৌক্তিক করনীতি এবং শিল্পীদের জন্য একটি শক্তিশালী প্লাটফর্ম গড়ে তোলা গেলে হাজারীবাগ শুধু শিল্পচর্চার কেন্দ্রই নয়, দেশের সৃজনশীল অর্থনীতিরও নতুন ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। একসময় ট্যানারির জন্য পরিচিত এ শিল্পাঞ্চলই তখন বাংলাদেশের নতুন ‘শিল্প বিপ্লব’-এর প্রতীক হয়ে উঠবে।










