দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর এর প্রভাব পড়ে বিভিন্ন খাতে। বিশেষ করে শিল্পপণ্যের উৎপাদনে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। অন্য শিল্পখাতগুলোর মতো দেশের সিরামিক টাইলস উৎপাদন খাতও রয়েছে এর মধ্যে। অন্যদিকে এ বছর নতুন করে সিরামিক পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করে সরকার। ফলে মান, ডিজাইন ও চাহিদা বিবেচনায় গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে দেশে উৎপাদিত টাইলসের দাম। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে দাম বাড়ানোর এ ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় টাইলসের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদেশী টাইলসের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।
মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে ব্যাখ্যাও দিয়েছে বিসিএমইএ। সংগঠনটি বলছে, সড়ক ও নৌ-পরিবহন খরচ, ডিজেলের দাম ও শ্রমিকের মজুরি খরচ বেড়ে গেছে। এ বছর তাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৫ শতাংশ, পরিবহন খরচ বেড়েছে সাড়ে ২৭, নৌযানের ভাড়া বেড়েছে ১৫ শতাংশ। সে কারণে প্রতি স্কয়ার ফুট টাইলসে ৩ থেকে ১৫ টাকা বা গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। যদিও এটিকে দাম বাড়ানো না বলে দামের সমন্বয় বলছেন বিসিএমইএর নেতারা। তারা জানান, আগে থেকেই দেশে তৈরি হওয়া সিরামিক পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা ছিল। চলতি বছরের শুরুতে সরকার উৎপাদন পর্যায়ে আরো ১৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করে। পক্ষান্তরে বিদেশী সিরামিক পণ্য টাইলসের শুল্কহার ১২ থেকে কমিয়ে ১০ ডলার করা হয়।
বিসিএমইএ সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম মোল্লা বলেন, আমরা সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেছি শুল্ক সমন্বয়ের বিষয়ে। আমদানি করা সিরামিক পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি ও দেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস করা প্রয়োজন। বিদেশী টাইলসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এখনো আছে। উৎপাদন খরচ বাড়ায় এরই মধ্যে অধিকাংশ কোম্পানি দাম বাড়িয়েছে। তবে কোনো কোনো কোম্পানি এখনো দাম বাড়ায়নি। এখন সরকার যদি শুল্ক সমন্বয় না করে, তাহলে দেশীয় উৎপাদন হুমকির মুখে পড়বে।
টাইলস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুল বেলাল বলেন, দেশীয় টাইলসের সঙ্গে তাদের কোনো প্রতিযোগিতা নেই। যেহেতু ইউরোপ, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশ থেকে বাংলাদেশে টাইলস আমদানি করা হয়, সেহেতু তাদের প্রতিযোগিতা বিদেশী টাইলসের সঙ্গেই। আন্তর্জাতিক বাজারেও টাইলসের দাম বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে দেশের বাজারে এর প্রভাব কেমন পড়বে, দাম বাড়লে কতটুকু বাড়বে সেটি এখনই বলা সম্ভব না।
বাংলাদেশ সিরামিক অ্যান্ড গ্লাসওয়্যার ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. কবীর উদ্দিন ভুঁইয়া বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সিরামিক পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই দেশের বাজারে সিরামিক (টাইলস ছাড়া) পণ্যের দামও ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। যারা নতুন করে আমদানি করছেন, তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে দাম বাড়িয়েছেন।
টাইলসের পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, ফ্লোর টাইলসের দাম বেড়েছে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত এবং ওয়াল টাইলস ৩ থেকে ৭ টাকা। বড় টাইলস বেড়েছে ৫ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত। ওয়াল টাইলস (১৬ বাই ১৬) ৪ টাকা, ফ্লোর টাইলস (২৪ বাই ২৪) ৬ টাকা, বড় টাইলস (২৪ বাই ৪৮ এবং ৩২ বাই ৩২) বেড়েছে ১০ টাকা পর্যন্ত। কোম্পানি ভেদে এ দামে তারতম্য রয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে ২ থেকে ৫ টাকা বৃদ্ধি পায় টাইলসের দাম। যদিও পরে করোনা মহামারীর সময় টাইলসের দাম কিছুটা কমেছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশে ৩০টি কোম্পানি টাইলস উৎপাদন করছে। বাজারে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। সিরামিক পণ্যের চাহিদার ৮৫ শতাংশই দেশে উৎপাদন হচ্ছে। কেবল দেশে উৎপাদিত টাইলসের বাজারের ১৬ দশমিক ১৬ শতাংশ দখলে রেখেছে আরএকে সিরামিকস। আকিজ সিরামিকস লিমিটেডের দখল ১৬ দশমিক শূন্য ৬, গ্রেট ওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ১২ দশমিক ৪৪, স্টার সিরামিকসের ১০ দশমিক ৮৮, মীর সিরামিক লিমিটেডের ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ ও দেশীয় অন্য ছোট কোম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে ৩৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ। দেশে উৎপাদিত সিরামিক স্যানিটারি ওয়্যারের বাজার ৯০০ কোটি ও তৈজসপত্রের বাজারের আকার প্রায় ৫০০ কোটি টাকার মতো। সে হিসেবে টাইলসসহ দেশের সিরামিক পণ্যে বিনিয়োগ ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি।
টাইলস ছাড়াও আবাসন খাতের অন্য পণ্যসামগ্রীর দাম বেড়েছে। নির্মাণ খাতের ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) তথ্য মতে, রডের দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। শ্রেণীভেদে লৌহজাত পণ্য, পাথর, সিমেন্ট, ইট, স্যানিটারি, ইলেকট্রিক্যালসহ অন্য সামগ্রীর দামও ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। শ্রমিক, সুপারভাইজার ও দক্ষ জনবলের মজুরি বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
অন্যদিকে, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে গত মাসে লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারা দেশে নৌ-পরিবহন ভাড়া বাড়িয়েছে ১৫ শতাংশ। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্য নৌপথে সবচেয়ে বেশি নেয়া হয় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মেঘনা, মুক্তারপুর, কাঁচপুর, আলীগঞ্জ ও নিতাইগঞ্জ এলাকায়। এসব এলাকায় প্রতি টনে ভাড়া বেড়েছে ৪১৫ টাকা। ফলে টনপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ৬২ টাকার বেশি। একই সময়ে বেড়েছে সড়কে পণ্য পরিবহন খরচও, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা ও গাজীপুর পর্যন্ত কাভার্ড ভ্যান ভাড়া আগে ছিল ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে সেটি দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়ে করা হয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা।










